শেষমেশ কোলকাতা বই মেলার একেবারে অন্তিম দিনে এসে প্রকাশ পেলো 'দিঘল পত্র'র উৎসব সংখ্যা। একটা গল্প দিয়েছিলাম তাতে, ‘রূপকথা’ নামে।
বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের ৫০ নং টেবিলে ছিল 'দিঘল পত্র'র বিপণন ঠিকানা। ম্যাগাজিনের
সম্পাদক তথা 'দিঘল পত্র' প্রকাশনার কর্ণধার সুদর্শনদা, সেই শুরুর দিন থেকেই বইমেলায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। এবছর ৪৯ - এ পা দেওয়া কোলকাতা বইমেলা শুরু হয়েছে সেই জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ থেকে, কিন্তু নানা কাজে আগে যাওয়া হয়নি। গেলাম সেই ফেব্রুয়ারির
২ তারিখ সন্ধ্যায়, অর্থাৎ বইমেলার কথিত বিজয়া দশমীর আগের দিনে।
মোটামুটি একটা প্ল্যান করেই গিয়েছিলাম; ছেলে ছিল সাথে, তাই ওর পছন্দের কিছু বই তো নিতেই হত; এছাড়াও আমার ভাবনার খোরাক জোগানোর মত যদি কিছু পাই, তাহলে নেব এরকমটাই ঠিক ছিল। কিন্তু বিধি-নদীর ভাঙা গড়ায় আমরা আর কি, শুধুই মাটির ঢেলা! তবে বিধিকে পুরোপুরি বাম বলবো না এক্ষেত্রে, বরং এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য জুটে গেল এবারে বইমেলায় গিয়ে যে তার জন্যে সেই বিধির কাছেই ঋণ স্বীকার করতে হয়।
ছেলে এরমধ্যে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ভৌতিক গল্প সমগ্র, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'তারানাথ তান্ত্রিক', পাঁচকড়ি দে’র 'রঘু ডাকাত' সহ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের
লেখা গোয়েন্দা গল্পের কমিক্স ভারসান ইত্যাদি নিয়ে ফেলেছে। যাতায়াতের দুদিকে, বিভিন্ন নামী অনামী প্রকাশনা সংস্থার সারি সারি স্টল, নানা বয়সের মানুষের ভিড় কম বেশী লেগেই আছে; মাঝে মাঝে কাবাবের মধ্যে হাড্ডির মত কিছু সুদৃশ্য ফুড স্টল - রসনা তৃপ্তি ছাড়াও খানিক দৃষ্টি সুখও প্রদান করে মন্দ নয়! সুদর্শনদার টেবিলে পৌঁছে দেখলাম, 'দিঘল পত্র' এবারে তাদের বইমেলা সংখ্যা হিসেবে, দেশপ্রান বীরেন্দ্রনাথ
শাসমলের এযাবৎকালের অপ্রকাশিত লেখা ও চিঠি নিয়ে একটা দারুন সংকলন বের করেছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক সময়কালের মধ্যে, মেদিনীপুরের
বুকে গড়ে ওঠা স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতিভূ ছিলেন দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ;
মূলত তাঁর নেতৃত্বেই, ইউনিয়ন বোর্ড বর্জনের মতো ব্রিটিশ সরকার বিরোধী, সফল অসহযোগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, ভবিষ্যতে বাংলা তথা ভারতবর্ষের বুকে গড়ে ওঠা অসহযোগ সংগ্রামের প্রথম ভিত্তিভূমি হিসেবে এই আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এ হেন যুগান্তকারী আন্দোলনের সূচনা পুরুষ, বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের বহু অপ্রকাশিত চিঠি সহ তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ যেগুলি সেসময়ের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় যেমন 'নীহার', 'প্রবাসী', 'মাহিষ্যসমাজ' বা 'দেশপ্রাণ' ইত্যাদিতে প্রকাশিত হয়েছিল, তাদের ঐতিহাসিক মূল্য নিশ্চিতভাবে অপরিসীম। সেগুলিকে একত্রিত করে এক মলাটের নীচে আনা সত্যিই এক দুরূহ কাজ ছিল; তাকে সফলভাবে সম্পন্ন করতে যে দুজন কৃতবিদ্য মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম, 'পুঁথিবিদ' হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক ডক্টর শ্যামল কুমার বেরা'র সঙ্গে বইমেলায় দেখা হওয়াটা ছিল আমার অন্যতম প্রাপ্তি। রাঢ় প্রকাশনের স্টলে বসেছিলেন তিনি। কথায় কথায় বললেন, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে দিল্লি গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের নবনির্মিত প্রত্নকুটির
এ তাঁর সংগৃহীত কিছু দুষ্প্রাপ্য
পুঁথিকে সংরক্ষিত করা হয়েছে বলে জানালেন তিনি। 'লোকায়ত', 'ভাঁড় যাত্রা' প্রভৃতি বহু গবেষণা লব্ধ গ্রন্থের প্রণেতা, ডক্টর বেরা এর আগে তাঁর সংগ্রহে থাকা মোট ৪০০ টি পুঁথির মধ্যে প্রায় দেড়শোর বেশী পুঁথি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের Center for Studies in Social Sciences এর সংগ্রহালয়ে দান করেছেন, ভবিষ্যতের গবেষক তথা উৎসাহী মানুষজন যাতে তা পড়ে দেখতে পারেন। শ্যামল বেরার পাশেই দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন আর এক গবেষক লেখক পূর্ণেন্দু ঘোষ। 'রাখালবন্দনা'
শিরোনামে একক গল্প সংকলন রয়েছে তাঁর, বললেন 'দেশ' এর পাতায় তাঁর গল্প বেরোনোর কথা। বর্তমানে সুন্দরবন তথা নদী অঞ্চলের লোকায়ত নৌকা নিয়ে গবেষণারত পূর্ণেন্দু বাবুর মুকুটে ইতিমধ্যে একটি গবেষণামূলক আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার গৌরব যুক্ত হয়েছে। 'ইতিহাসের আলোকে সুন্দরবন ও পোর্ট ক্যানিং' এর লেখক হিসেবে তিনি বর্তমানে সুন্দরবন গবেষক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।
কিন্তু যে বিখ্যাত ব্যক্তিটির সঙ্গে এখনোও দেখা হতে বাকি, তাঁর সম্পর্কে বলার আগে একটু বলে নেই, এরা প্রত্যেকেই কিন্তু এক একজন সাচ্চা কবিতা প্রেমী; প্রতিনিয়ত নানা খটমট তথ্য নিয়ে চর্চা করলেও কবিতায় এদের আগ্রহ কিন্তু বেশ মজ্জাগত। ডক্টর শ্যামল বেরা রীতিমতো কবিতা লেখেন এবং বেশ কয়েকটি কবিতার বইও রয়েছে তাঁর। এমনকি মেদিনীপুরের মুকুটহীন সম্রাট বলে পরিচিত, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথের মতো ব্যারিস্টার স্বাধীনতা সংগ্রামীও বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন গল্পও। 'দিঘল পত্র'র ২০২৬ বইমেলা সংখ্যায় তা অন্তর্ভুক্ত
হয়েছে।
ইতিমধ্যে চা পানের তেষ্টা পেয়ে যাওয়ায়, আমরা সকলে চায়ের দোকানে দ্বারস্থ হওয়া মনস্থ করলাম। কিছুটা হেঁটে, ৯ নং গেটের দিকে এগিয়ে একটা সুবিধা মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে, আমি তখন পূর্ণেন্দু বাবুকে আমার লেখা একটা গল্পের কথা শোনাচ্ছিলাম। ইতিমধ্যে সেখানে চুপ করে এসে যিনি দাঁড়িয়েছেন তিনি আর কেউ নন, চাপ দাঁড়ি, কপালে এক দুই লতা চুল ঝেঁপে আসা, দ্রাবিড়ীয় ঠোঁট, চোয়াল সর্বস্ব চৌকো মুখাবয়বের তিনি; পরনে পাঞ্জাবি, তার ওপরে সোনালী জহর কোট চাপানো, অবশ্যই চশমার নীচে একজোড়া কৌতুহলী চোখকে এড়ানো যায় না। পূর্ণেন্দু ঘোষ অন্যমনস্ক হতেই পেছন ফিরে দেখলাম তাঁকে, এ সময়ের অন্যতম সেরা কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরা দাঁড়িয়ে আছেন। পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে
এসেছিলেন সুদর্শনদার সঙ্গে দেখা করতে। ঝাড়গ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম বাছুরখোঁয়াড়ে তাঁর জন্ম। প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যেও পড়াশুনা করেছেন এবং রাজ্য সরকারের খাদ্য দপ্তরের উচ্চ আধিকারিকের পদে চাকরি করেছেন। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে, যখন তিনি মাত্র ২৭ বছরের যুবক, তাঁর লেখা গল্প 'বাবার চিঠি' প্রকাশ পায় 'দেশ' এর পাতায়। সেই শুরু সাহিত্য যাত্রার। ২০০৮ এ 'শবরচরিত' উপন্যাসের জন্যে বঙ্কিম পুরষ্কার লাভ এবং ২০১৯ এ 'সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা' উপন্যাসের জন্যে আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার পরেও সে যাত্রা এখনো অব্যাহত। নিজের জন্মভূমি, সেখানকার সংস্কৃতি, ভাষা সমাজ রীতিনীতি এ সবই তাঁর লেখা অসংখ্য গল্প ও উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্র চিত্রণ তথা কাহিনীর আকর উপাদান। কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলেন। এখনও লেখেন। লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে উচ্ছ্বসিত নলিনী বেরা বললেন, বাংলা সাহিত্যে লিটল ম্যাগের গুরুত্ব একেবারে উঁচুতে।
চা এসে গেছে ইতিমধ্যে, কাগজের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে বললেন, তিরিশের দশকে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল যদি না লড়তেন, তাহলে মেদিনীপুর এতদিনে উড়িষ্যার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকতো। এটি ঐতিহাসিক ভাবে সত্য, কারণ যেভাবে তখন মেদিনীপুরের মাটিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তাতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই এক রাস্তা বেঁচে ছিল। যদিও তাতে আন্দোলনের ঝাঁঝ, উল্টে আরোও বেড়ে যায়। সেই আন্দোলনকে সামনের থেকে নেতৃত্ব দেন বীরেন্দ্রনাথ;
যার ফল, ১৯৩২ সালের ১৮ই এপ্রিল, মেদিনীপুরের উড়িষ্যা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় ইংরেজ সরকার।
এদিকে কথায় কথায় বেলা পেরিয়ে গেছে। আটটা বাজে বাজে। বন্ধ হওয়ার মুখে এবারের বইমেলার থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনার
প্যাভিলিয়ন। এবছরই প্রথম রবীন্দ্রনাথের প্রিয় বিজয়ার দেশ, থিম কান্ট্রি হয়েছিল। যাইহোক, লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নেই
১১৯ নং টেবিলে খুঁজে খুঁজে গেলাম, কবি প্রলয় বসুর তৃতীয় কবিতা গ্রন্থ 'আবার ছন্দপথিক' কিনবো বলে, পেলাম না। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ছুটলাম অরিত্র প্রকাশনীতে, কবি অরুণিমা চ্যাটার্জির লেখা কাব্য গ্রন্থ 'সিলুয়েট' সংগ্রহ করলাম। আনন্দ প্রকাশনী থেকে নিলাম মালা মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস 'ঈশাণী নদীর বাঁকে'। এখানেই প্রিয় সাহিত্যিক প্রণয় গোস্বামীর লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস 'মরা নদীর চর' পাওয়ার কথা কিন্তু ফুরিয়ে গেছে। কপাল খারাপ। তবে কিছুটা হলেও সে বিস্বাদ কাটিয়ে মুখে মিষ্টি স্বাদ আনানোর কাজ যিনি করলেন তিনি সুব্রত সাহা। আধ্যাত্মিক ও বিজ্ঞান চেতনার মিলন সূত্র নিয়ে ছোট একটা প্রচারপত্র সকলের হাতে তুলে দিচ্ছেন তিনি, আর সঙ্গে তুলে দিচ্ছেন একটা করে গোকুল পিঠে। বিনামূল্যে। বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। স্টিলের ক্যান থেকে তুলে তুলে দিচ্ছেন।
'ধন্য ধন্য বলি তারে'।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন