প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য পত্রিকা প্রসাদ - এ প্রথম লেখা পাঠানোর কথা ভেবেছিলাম, ফেসবুকে প্রসাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে লেখা পাঠানোর আবেদন জানিয়ে একটি পোস্ট দেখে। সেটি ছিল প্রসাদ, ফেব্রুয়ারী ২০২৬ সংখ্যার জন্যে। বিষয় ছিল ‘একান্নবর্তী পরিবার’। সেই শুরু। প্রথমত ভয় ছিল, লেখা বিবেচিত হবে কি না। কারণ বহু খ্যাতনামা ও প্রথিতযশা লেখকের নাম জড়িয়ে আছে এই পত্রিকার সঙ্গে। শুধু তাই নয়, তাঁদের বহু কালজয়ী লেখা পূর্বে প্রকাশিতও হয়েছে এই পত্রিকায়। যেমন মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ ইত্যাদি । তাই পত্রিকা বেরনো অব্দি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, হয়তোবা লেখক সূচীতে নিজের নামটিকে শেষমেশ চাক্ষুষ করতে পারবো। হ্যাঁ, শেষমেশ আশাহত হতে হয়নি, নির্দিষ্ট দিনে পত্রিকা প্রকাশিত হতে দেখলাম পত্রিকায় আমার লেখা স্থান পেয়েছে। প্রসাদ এর মত বড় পত্রিকায় লেখা প্রকাশের সফর সেই শুরু। ইতিমধ্যে ছোটদের প্রসাদ এ লেখা বেরিয়েছে এবং সর্ব শেষ বৈশাখী প্রসাদ –এর পাতাতেও প্রকাশিত হয়েছে অনুগল্পের ফরম্যাটে লেখা একটি ছোট স্মৃতিকথা। প্রসঙ্গত বলে নিই এযাবৎ বেরনো তিনটি লেখাই স্মৃতিকথা ভিত্তিক এবং সর্বাধিক শব্দসীমা ২০০ শব্দের মধ্যে।
এখানে একে একে তিনটি লেখাই কালানুক্রমিক ভাবে সাজিয়ে দিচ্ছি, প্রসঙ্গত লেখাগুলি
পূর্বে আমার ফেসবুক পেজে শেয়ার করেছিলাম, তাই ফেসবুক লিঙ্ক সহ উক্ত লেখাগুলির কিছু
প্রয়োজনীয় ভূমিকা লেখাগুলির মাথায় সংযুক্ত থাকছে যাতে করে সহজে পাঠক লেখাটির সঙ্গে
সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।
প্রথম প্রকাশিত লেখা, প্রসাদ - ফেব্রুয়ারী সংখ্যায়। শীর্ষক ছিল 'একান্নবর্তী পরিবার'। ২০০ শব্দের মধ্যে লেখা
ছোট্ট এই স্মৃতি-গাঁথাটির শিরোনাম ছিল 'ছড়া দিদা'।
প্রসঙ্গত বলে নিই, ছড়া দিদা কে নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রাথমিক ভাবে আমার লেখাটির কলেবর
একটু বড়ই হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে শেষ করতে হবে, তাই
অনিবার্য ভাবে কিছু অনুষঙ্গ কেটে বাদ দিতে হয়েছে। পাঠকের সুবিধার্থে প্রসাদ – এ
প্রকাশিত লেখাটির সঙ্গে সঙ্গে মূল লেখাটিকেও এখানে দিয়ে দিলাম। মূল লেখাটিতে পাঠক
ছড়া দিদা সম্পর্কে আরও বিশদে জানতে পারবেন শুধু নয় কাঁথির কথ্য ভাষা সম্পর্কেও বাড়তি
ধারনা পাবেন।
ছড়া দিদা, প্রসাদ – এ প্রকাশিতঃ
পাড়ার
এক ঠাকুমা ছিলেন, তিনি
আবার কথায় কথায় ছড়া বানিয়ে দিতে পারতেন। অনেকটা পাঁচালি পড়ার মতন করে সুর কেটে কেটে বলতেন সেগুলো। আমরা তাকে ঝোলা দিদা বলে ডাকতাম। অফুরন্ত ভাণ্ডার তার। আজন্ম বড় হওয়া কাঁথিতে আমাদের লেখাপড়ার ভাষা বাংলা হলেও মুখের ভাষা ছিল বাংলা -উড়িয়া মেশা। একে কাঁথির ‘ঘরোয়া
ভাষা’ বলা
হয়। তা ঝোলা দিদা ছিলেন নিরক্ষর, তাই তার ছড়াগুলো ঘরোয়া ভাষাতেই বলবেন সেটাই
স্বাভাবিক। একটা উদাহরণ দেই, যেমন - চিকনি শাকের ঘেরঘেটা/ ঘৈতা
যাবে কোলকাতা। এখানে ঘেরঘেটা শব্দটা চিকনি শাকের ঘণ্ট অর্থে বলা হয়েছে; আর
ঘৈতা কথাটি স্বামী অর্থে। তা একদিন এক শীতের বিকেলে দিদাকে একা পেয়ে বললাম, দিদা তোমার ছড়াগুলো একদিন আমাকে সব বলবে তো, খাতায়
লিখে রাখবো। শুনে তার ফোকলা দাঁতে যেন হাঁসির ঝিলিক খেলে গেল। তারপরে, ভুতেদের
মত মিহি কণ্ঠা করে, বললেন
কি,”তুই
আমাকে গটে (একটা) লাড়িয়া (নারকেল) দিবু (দিবি’) কি না ক’ (বল)।“ আমি
এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। জানি মাকে বললে, মা বিনা প্রশ্নে আমাকে একটা নারকেল
ভাঁড়ার ঘর থেকে বের করে দেবেন। ব্যাস কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম, গাফিলতি
যে আমার তরফ থেকে ছিল না বলবো না। আজ করবো কাল করবো বলে আর করা হয় নি। দিদা একদিন
ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল সেই
বৃহৎ ছড়ার খাজানাও।
ছড়া দিদা, মূল
লেখাঃ
পাড়ার এক ঠাকুমা ছিলেন, তিনি আবার কথায় কথায় ছড়া বানিয়ে দিতে পারতেন। অনেকটা পাঁচালি পড়ার মতন করে সুর কেটে কেটে বলতেন সেগুলো। আমরা তাকে ঝোলা দিদা বলে ডাকতাম। অফুরন্ত ভাণ্ডার তার। রাত থাকতেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়াটা ছিল তার
বারোমাসের অভ্যাস। কোথায় কোন বুনো গাদায় একটা ঝুনো নারকেল খসে পড়েছে বা পাকা চালতা
কিংবা ভুশুণ্ডা তাল বা লক্ষ্মী সুপারি সবটাই তিনি ভোর হওয়ার আগে কুড়িয়ে তার কোঁচড়ে
ভরে নিয়ে যেতেন। কাঁথির বালি আর নোনা জল হাওয়ায় বড় হওয়া, আমাদের কথ্য ভাষা ছিল বেশ অন্য ঘরানার। উড়িষ্যা
সংলগ্ন হওয়ায়, উপকূলবর্তী
বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলের চলতি ভাষায় শুধু যে প্রচুর উড়িয়া শব্দ মিশে রয়েছে তাই নয়, এর বাগধারাতেও উড়িয়া ভাষার ছাপ পাওয়া যায়। লেখা
পড়া বাংলা ভাষাতে হলেও, আমাদের মুখের ভাষা ছিল তথাকথিত এই ঘরোয়া ভাষাই। তা ঝোলা দিদা ছিলেন নিরক্ষর, তাই তার ছড়াগুলো ঘরোয়া ভাষাতেই বলবেন সেটাই
স্বাভাবিক। একটা উদাহরণ দেই, যেমন -
চিকনি শাকের ঘেরঘেটা/ ঘৈতা যাবে কোলকাতা। এখানে ঘেরঘেটা শব্দটা চিকনি শাকের ঘণ্ট
অর্থে বলা হয়েছে; আর ঘৈতা কথাটি স্বামী অর্থে। তা একদিন এক শীতের বিকেলে দিদাকে একা পেয়ে বললাম, দিদা তোমার ছড়াগুলো একদিন আমাকে সব বলবে তো, খাতায় লিখে রাখবো। শুনে তার ফোকলা দাঁতে যেন
হাঁসির বিদ্যুৎ খেলে গেল। তারপরে, ভুতেদের মত
মিহি কণ্ঠা করে, বললেন কি,”তুই
আমাকে গটে (একটা) লাড়িয়া (নারকেল) দিবু (দিবি’) কি না
ক’ (বল)।“ আমি
এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। জানি মাকে বললে, মা
বিনা প্রশ্নে আমাকে একটা নারকেল ভাঁড়ার ঘর থেকে বের করে দেবেন। ব্যাস কাজ হয়ে
যাবে। কিন্তু বিধি বাম, গাফিলতি যে আমার তরফ থেকে ছিল না বলবো না। আজ
করবো কাল করবো বলে আর করা হয় নি। দিদা একদিন ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন। তার সঙ্গে
সঙ্গে চলে গেল সেই বৃহৎ ছড়ার খাজানাও।
দ্বিতীয় লেখাটি প্রকাশিত হয়
ছোটদের প্রসাদ –এ, শীর্ষক ছিল 'ছেলেবেলার
দুষ্টুমি'। 'সুখ স্মৃতি' পর্যায়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়। শব্দ সীমা ছিল
১০০, অনুগল্পের ধাঁচে লেখা এই স্মৃতিকথাটির শিরোনাম ছিল 'চ্যারিটি শো'।
চ্যারিটি শো, ছোটদের প্রসাদ এ প্রকাশিতঃ
১৫ই আগস্ট। কাঁথিতে ওইদিন, স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা সব শোভাযাত্রা করে, খড়গচণ্ডী মহাশ্মশানে গিয়ে পৌঁছায়। শহীদ বেদীতে মাল্যদান করাই উদ্দেশ্য। ক্লাস সেভেনে পড়ি। এদিকে আকাশের মুখ ভার। শোভাযাত্রা শেষে, কুপন নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে সিনেমা হলে গিয়ে পৌঁছলাম। স্কুলের ছাত্রদের জন্যে সেদিন চ্যারিটি শোয়ের আয়োজন করে হলগুলো। সেবার সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’ দেখাবে, রবীন্দ্রনাথের গল্প। প্রথমে ‘পোস্টমাস্টার’। খোলা মাঠের মধ্যে হল, জীর্ণ টিনের চাল। পর্দায় তখন প্রাক ঝড়ের মুহূর্ত। পোস্টমাস্টার শুয়ে আছেন জ্বরে; বিজলীর আলো ঘনঘন আছড়ে পড়ছে ঘরের মধ্যে। হঠাৎ, পলাশ আমার হাত ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলতে শুরু করলো, চলচল পালাই; সিনেমা হলের চাল গলে, কখন যে বৃষ্টি পড়তে লেগেছে বুঝতে পারিনি।চ্যারিটি শো, মূল
লেখাঃ
১৫ই আগস্ট। সকালবেলায় স্কুল থেকে শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। ক্লাস সেভেনে পড়ি। কাঁথিতে
ওইদিন, স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা, জাতীয় পতাকা হাতে, বন্দেমাতরম ধ্বনি দিতে দিতে
লাইন করে হেঁটে যায় খড়গচণ্ডী মহাশ্মশানের দিকে। স্বাধীনতা সগ্রামীদের শহীদ বেদীতে
মাল্যদান করাই উদ্দেশ্য। এদিকে
আকাশের মুখ ভার। কালো মেঘে ছেয়ে আছে চারিদিক, যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। শোভাযাত্রা শেষে, কুপন
নিয়ে মিষ্টি প্যাকেট সংগ্রহ করেই, দৌড়তে দৌড়তে সিনেমা হলে গিয়ে পৌঁছলাম সকলে। ১৫ই আগস্টের দিনে স্কুলের ছাত্রদের জন্যে চ্যারিটি শোয়ের আয়োজন করতো হলগুলো।
সেবার সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’ দেখানোর কথা, রবীন্দ্রনাথের গল্প। প্রথমে
‘পোস্টমাস্টার’। খোলা মাঠের মধ্যে, টিনের
চালা দেওয়া হল। পাটা ফেলা বেঞ্চেই বসতে হত। পর্দায় তখন ঝোড়ো রাতের আবহ; এদিকে পোস্টমাস্টার
জ্বরে বেহুঁশ হয়ে শুয়ে আছেন, কাজের মেয়ে রতন, নিশ্চল হয়ে পোস্ট মাস্টারের মাথার
কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি নামার প্রাক মুহূর্ত তখন পর্দায় , বিজলীর আলো ঘনঘন আছড়ে
পড়ছে ঘরের মধ্যে।। হঠাৎ, পাশে বসা পলাশ আমার হাত ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো, চল চল
পালিয়ে যাই! মগ্ন হয়ে দেখছিলাম; তাই সিনেমা হলের চাল গলে কখন যে মাথায় গলগল করে
বৃষ্টি পড়তে লেগেছে বুঝতে পারিনি।
তৃতীয় লেখাটি প্রকাশিত হয় বৈশাখী প্রসাদ – এ। বিষয় ছিল বিবাহ; অনেক বড় কলেবর এবং বহু খ্যাতনামা লেখক লেখিকাদের লেখা প্রকাশ পায় বিশেষ এই সংখ্যাটিতে। এর মধ্যে আমার লেখা স্মৃতি গাঁথাটি ১০০ শব্দসীমার, শিরোনাম - মিনাদির বিয়ে!
মিনাদির বিয়ে,
বৈশাখী প্রসাদ – এ প্রকাশিতঃ
মিনাদির বিয়ে
হবে; উঠোনে মেরাপ বাঁধা হচ্ছে। ছাদনাতলা সাজানো হবে ফুলে, ডায়নামোর আলো, চোঙার
গান। চিলেকোঠায় গ্রামাফোন কল বসবে; যেমন বসেছিল সেজ পিসির বিয়েতে। কাজের মেয়ে বলে
যেন কোনো কিছু বাদ না থাকে। মা বাবাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকে আমাদের
সঙ্গে একসাথে বড় হয়েছে মিনাদি। সবাইকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে। পূব দিকের হলদি বাগানে
গোবর জল লেপা হয়েছে। খাওয়া দাওয়া হবে সেখানে। যত বিয়ে এগিয়ে আসছে, মা মিনাদিকে
কোনো কাজে হাত দিতে দিচ্ছে না। এই কটা দিন একটু ঘুরে ঘুরে কাটা, মায়ের কথায়
মিনাদির চোখ ছলছল করে ওঠে। বিয়ের দিন, মিনাদির বিধবা মা, আমার মা’র ওপরেই কন্যা
সম্প্রদানের ভার সঁপে দেন।
পরবর্তীকালে যে
যে লেখাগুলি প্রসাদ কিংবা অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশ পাবে সেই লেখাগুলিকেও একইভাবে
আপনাদের কাছে নিয়ে আসতে পারবো বলে আশা করি। ধন্যবাদ।




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন