সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইভেন্টে ঢাকা রবি!

সকাল ৯টা ২০’র শিয়ালদহ গামী বারুইপুর লোকাল; এমনিতে ২৫শে বৈশাখ, সরকারি ছুটির দিন। ট্রেনে খানিক কম ভিড় হওয়াই দস্তুর, কিন্তু না তেমনটা হয় নি। বরং অন্য কাজের দিনগুলোর থেকেও তা কিঞ্চিৎ বেশী বলেই মনে হলো। তবে যাত্রারত মানুষদের চোখে মুখে যে দৈনন্দিন ক্লেশের ছবি দেখা যায় অন্যদিন গুলোতে আজ সেটি নেই, বদলে উচ্ছ্বাস আর আনন্দের ছাপই বেশী। তার মধ্যে আবার তীব্র গর্জন করে জয় শ্রী রাম ধ্বনি উঠছে থেকে থেকে, যার তুমুল হরষিত কম্পন পুরো কামরাকে আন্দোলিত করে তুলছে। উপস্থিত অনেক সাধারন যাত্রীরাও গলা মেলাচ্ছেন তার সঙ্গে, মনে হচ্ছে সে বিপুল কোলাহল মুখরতায় কেউ যেন আর বাকি নেই একাত্ম হতে। শুধু এক অন্ধ ভিখারি, যিনি রোজ গলায় একটা চৌকো সাউণ্ড বক্স ঝুলিয়ে ট্রেনে ভিক্ষা করেন তিনি আজ ভীষণ রকমের ব্যাতিক্রমী। বিশেষ করে এই বিপুল কল কোরাসের প্রেক্ষিতে একেবারেই উল্টো গামী। কারণ তার বক্স থেকে আজ শুধুই রবীন্দ্রনাথের গান বাজছে– কী আনন্দ কী আনন্দ কী আনন্দ। দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ। ভিড় ঠেলে ঠেলে ধীর পায়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন, ডান হাতে ভিক্ষার বাটিটি শক্ত করে ধরা। অন্যদিন হলে একটা আবহ তৈরি হত। কিন্তু আজ মুড অন্যরকম।
তাই কেউ শুনতে পেল, কেউ পেল না। কিন্তু কারোরই যে তেমন গোচরে এল না তা বেশ বোঝা গেল। আসলে প্রবল সে রাম নাদের মাঝে নেহাতই সে গান এক মূর্ছিত সুর ধারার মতই বারংবার কর্ণ কুহরে প্রবেশ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেল বলে প্রতীত হল। কয়েকজনের চোখে মুখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঞ্চন জেগেও পুনরায় মিলিয়ে গেল।
আসলে লক্ষ আর উপলক্ষের মাঝে যে লক্ষকেই বেশী গুরুত্ব দিতে হয় তা টেগোর লাভার বাঙালি কুল সম্প্রতি ভালোই বুঝে গেছে।
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে বাংলার নতুন সরকার শপথ নিচ্ছে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এটাই বা কম কী। বাসে ট্রেনে করে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়েছেন সেই সুবিশাল রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাক্ষী থাকতে। সেখানে উপলক্ষ হিসেবে ২৫ শে বৈশাখকে বেছে নেওয়াটা কী কম গর্বের? চারিদিকে শ্রী রামের পরাক্রমী ছবি সহ গেরুয়া পতাকা ফেস্টুনে মোড়া পথঘাট, রামের জয়ধ্বনিতে মুখর পরিবেশ, রবীন্দ্রনাথকে তাই মানস চক্ষে দেখা ছাড়া উপায় কী!
বরং চোখ ফেরালে শপথ অনুষ্ঠানে আগত প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের হাসমুখ ছবি এদিক ওদিক বেশ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কোথায় রবীন্দ্রনাথ?
বড় ইভেন্টের আলোয় রবির বিভা কী ফিকে পড়ে গেল! কখনো কখনো দেবতার থেকে দেবতার অনুগামীদের গ্ল্যামার বেশী বেড়ে গেলে বুঝি এমন বিড়ম্বনা হয়।
আর এমন বিহ্বলতা পূর্ণ পরিস্থিতিতে, রবীন্দ্রনাথ কী তাঁর 'অন্তর্যামী' সুলভ হাসিই হাসছেন শুধু! আপনাদের কী অভিমত?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...