সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অন্য আলোয় অরিজিৎ সিং!

আচ্ছা একজন চেন স্মোকার যখন ইম্পর্টেন্ট কোনো আলোচনা ছেড়ে, থেকে থেকে উঠে চলে যান; তখন বোধগম্য হয়, তিনি তার প্রিয় 'ডক স্টেশনে' পৌঁছতে চান! যেভাবে কবি বারবার তাঁর নিভৃতচারণে ফিরে যেতে চান; যেভাবে গায়ক অরিজিৎ সিং ফিরে যেতে চান তাঁর চির ইপ্সিত ব্যাকুল-নিবাস, জিয়াগঞ্জে!

জিয়াগঞ্জ আজ আর শুধু কোনো জনপদের নাম নয়; ভাগীরথীর পাড় ঘেঁষা, মুর্শিদাবাদ জেলার কোনো একটি গঞ্জের নাম নয় শুধু এটি; বরং বিক্ষিপ্ত মনের অবচেতনে বাস করা সেই শান্তির ঠিকানা, যেখানে বারবার মানুষ ফিরে যেতে চান; আমার আমিকে ফিরে পাওয়ার সেই সব স্টেশনের অন্তিম প্রতিভূ আজ জিয়াগঞ্জ।

সম্প্রতি বলিউড ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে, অরিজিৎ এর সর্বশেষ ইনস্টাগ্রাম (২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬) ঘোষণা, জিয়াগঞ্জ কে সেই স্ট্যাটাসই প্রদান করেছে।

একটা কথা আছে, পড়ন্ত বেলায় নয়; সবসময় মধ্যগগনে থেকেই বিদায় নেওয়ার কথা ঘোষণা করতে হয়। যেটা বলে, সন্ন্যাসীর রাজা হওয়া নয়; বরং রাজার সন্ন্যাসী হওয়াটাই বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এবং বেশী হৃদয়স্থায়ী। মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই কিন্তু অরিজিৎ সেটা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন; একদিকে যেমন তিনি বলিউডের নেপথ্য সঙ্গীতের জগতকে তাঁর অনুপম কন্ঠ সম্পদের কাছে কার্যত বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছেন, অন্যদিকে সেই বিশাল স্টারডমকে কিভাবে শুধু একটা পোস্টের মাধ্যমে, অনায়াসে ছেড়েও আসা যায় তাও দেখিয়েছেন অত্যন্ত নজিরবিহীন ভাবে। কিন্তু এসবই তাঁর একান্ত সাজ ছিল। আসলে রাজা কিংবা সন্ন্যাসী কোনোটাই তিনি হননি, সেজেছিলেন মাত্র। ছোটবেলায়, সঙ্গীতে নাড়া বেঁধেছিলেন যে গুরুর কাছে, সেই রাজেন্দ্রপ্রসাদ হাজারি তাঁকে শুরুতেই যে কথাটি বলে দিয়েছিলেন সেটা হোল - আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ো না, দুঃখে ভেঙে পড়ো না। অর্থাৎ মায়ায় পড়ো না। অরিজিৎ সিং এর জীবনে এই তত্ত্ব কিভাবে এক ফলিত দর্শনে রূপান্তরিত হলো তার সন্ধান করতে হলে অরিজিৎ কিভাবে দর্শন শাস্ত্রের ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন সে দিকে নজর দিতে হবে। দর্শন বা আর্টস নিয়ে পড়ার কিন্তু কোনো ভাবনা অরিজিৎ এর ছিল না। এর মূলেও জিয়াগঞ্জের গুরু, সেই রাজেন্দ্র হাজারিই ছিলেন। যথারীতি, জিয়াগঞ্জের রাজা বিজয় সিংহ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পরে অন্য বন্ধুদের মতো সায়েন্স নিয়েই ভর্তি হয়েছিলেন ক্লাস ইলেভেনে। তাতে হলো কি, দৈনিক আট ঘন্টা রেওয়াজের অভ্যাস তাঁর নেমে এসেছিল মাত্র এক দেড় ঘন্টাতে। আর এখানেই মাস্টারমশাইয়ের অনুপ্রবেশ হয়, তিনি পরিষ্কার তাঁকে নির্দেশ দেন বিজ্ঞান ছেড়ে কলা বিভাগে ভর্তি হতে হবে। বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক, শঙ্কর এহসান লয় - ত্রয়ীর তৃতীয় জন, লয় এর সঙ্গে এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অরিজিৎ তাঁর জীবনের এই মোড় ঘোরানো পর্বটির কথা স্মরণ করেছেন। অরিজিৎ এমনিতে খুব একটা ইন্টারভিউ দেন না, যেটা নিয়ে আবার তিনি রসিকতা করে বলেন, "আমার জবের দরকার নেই, তাই আমি ইন্টারভিউ দেই না।"

এ হেন অরিজিৎ, ইন্ডাস্ট্রিতে যাকে তথাকথিত লাজুক, সাদাসিধে বা মফস্বলী এমনকি দেহাতি বলেও দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তিনি কিন্তু এ সব খুব একটা গায়ে মাখেননি। কারণ তাঁর কাছে জিয়াগঞ্জ নামক 'ডক স্টেশন' ছিল। শর্মিষ্ঠা গোস্বামী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় অরিজিৎ তার বহু চর্চিত জিয়াগঞ্জ তৃষ্ণার নেপথ্যে কাজ করা চারটে কারণের কথা বলেছেন, যেগুলো বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। প্রথমত তিনি মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার জগত ছেড়ে জিয়াগঞ্জে আসেন কারণ ওখানে গাছ নেই, দ্বিতীয়ত বলিউডের নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ মার্কা টিকা টিপ্পনি, যাকে তিনি 'মাইন্ড পলুশন' বলে অভিহিত করেছেন তার থেকে মুক্তি পেতে, আবার কখনো হাঁফিয়ে উঠলে বা জীবনিশক্তি ফুরিয়ে গেলে যা তাঁর ভাষায় ব্যটারি রিচার্জ করতেই তিনি বারবার ফিরে আসেন বা আসতে চান তাঁর আপন প্রশান্তির আশ্রয় জিয়াগঞ্জে। কিন্তু এবার, পাকাপাকি ভাবে। জিয়াগঞ্জের শিবতলা ঘাটের কাছেই বাড়ি, সেখানেই বিশ্ব মানের রেকর্ডিং স্টুডিও গড়ে তুলেছেন তিনি, অরিয়ন মিউজিক নামে। সেখান থেকেই শুরু হবে তাঁর নতুন পথচলা। বলিউডকে বাইবাই জানিয়েছেন, কারণ আর পরাধীনতার গ্ল্যামার নয়; বরং সঙ্গীতের নিঃশর্ত সাধন ক্ষেত্রকেই আপন করে নিতে চেয়েছেন তিনি।

কিন্তু সকলেই তো শ্যামা পোকার মতো, বলিউডি মায়ানলের দিকে ধাবিত হয়, সেখানে একমাত্র অরিজিৎ সিং ই ব্যতিক্রম। যিনি অবলীলায় সেই আকর্ষণকে প্রত্যাখ্যান করে দেন। এর পেছনে সলমন খান এবং তাঁর মধ্যে কথিত শীতল যুদ্ধ এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে অরিজিৎ এর এ হেন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তকে সলমনের প্রতি মধুর প্রতিশোধ বলে কেউ কেউ অভিহিত করতে পারেন, কিন্তু আমার মতে এর পেছনে অরিজিৎ সিং এর সেই মায়ায় না পড়া দর্শনের হাত রয়েছে বলেই মনে হয়। যার উদ্ভব হয়েছিল, ছোটবেলায় মায়ের দেওয়া বিবেকানন্দের বই দিয়ে। বড় হয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদী গান শেখার আবহে; সেইসকল গানের বাণী বা তাদের মর্মার্থ যে অরিজিৎ কে আস্তে আস্তে এক সুফি চেতনায় দিক্ষিত করা শুরু করেছিলো, যার পূর্ণতা প্রাপ্তি হয় আরোও কয়েকবছর পরে।

একটি সর্বজনবিদিত সত্য হল, মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোনো অভিনেতা কখনো তাঁর নাট্য কুশলতা জরিপ করতে পারেন না; যেটা পারেন একজন দর্শক। লেখক যতক্ষণ না পাঠকের চোখে তাঁর লেখাকে বিচার করছেন, ততক্ষণ সে লেখায় তিনি কোনো খুঁত খুঁজে পান না, যদি তা কিছু থাকেও। রবীন্দ্রনাথের পান্ডুলিপি বুঝি তাই এত কাটাকুটিতে ভরা; অর্থাৎ নিজের সৃষ্টিকর্মের প্রতি মায়াহীন দৃষ্টিই পারে তাকে কালোত্তীর্ণ করে তুলতে। গায়ক অরিজিৎ সিং যেভাবে তার তারকা সত্তাকে একটি বর্মের মতো ব্যবহার করেন, তাতে তিনি প্রমাণ করে দেন যে তিনি আর তাঁর গায়ক সত্তা এক নয়। কন্ঠশিল্পী হয়েও তাই তিনি অবলীলায় যন্ত্র সঙ্গীত শোনার পরামর্শ দেন।

তাঁর বলিউড ত্যাগের সিদ্ধান্তে যখন সারা পৃথিবী তোলপাড়, নিরন্তর অনুরাগী মহল থেকে ভেসে আসছে হৃদয় ভাঙার করুন কলনাদ, তিনি মহানন্দে, জিয়াগঞ্জে অনুষ্ঠেয় বাউল মেলার সাফল্য কামনা করে ভিডিও বার্তা পোস্ট করছেন ফেসবুকে। খবরে প্রকাশ, অভিনেতা আমির খান পর্যন্ত সম্প্রতি তাঁর জিয়াগঞ্জের বাড়িতে এসে ঘুরে গেছেন, ছাদে উড়িয়ে গিয়েছেন ঘুড়ি; কিন্তু অরিজিৎ কি জিয়াগঞ্জ-ছাড়া হবেন, এটা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

মুর্শিদাবাদের শ্রীপত সিং কলেজে পড়ার সময় বন্ধু পর্ণভের বাড়িতে গিয়ে তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। যার নেপথ্যে ছিল একটি দর্শনের বই। ঠিক করেন, ভবিষ্যতে ভিখারী হবেন। মিউজিক কম্পোজার লয় কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, অরিজিৎ এমনকি তাঁর ভিক্ষা মূল্য কেবল এক টাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান বলে জানিয়েছেন। ভারতবর্ষের ১০০কোটি মানুষও যদি ১ টাকা করে দেন তাহলেই তাঁর ইচ্ছে পূরণ হবে।

তাহলে প্রশ্ন,  বলিউডের প্লেব্যাক মিউজিকের জগতে, অরিজিৎ এর এত বড় স্টেক হোল্ডার হয়ে ওঠাটা কি শুধুই ছলনা ছিল? পর্দায় রণবীর কাপুর থেকে শাহরুখ খান, ইমরান হাসমি থেকে অক্ষয় কুমারের কন্ঠস্বর হয়ে ওঠাটা কি শুধুই এক বিরোধাভাস রচনার বাহানা মাত্র ছিল?

২০০৫ এ ফেম গুরুকুল এর মঞ্চে, ১৮ বছরের তরুণ গায়ক অরিজিৎ কে তাই প্রতিযোগিতার অন্যতম বিচারক জাভেদ আখতার বলেছিলেন, তোমার নির্লিপ্তি দেখে মনে হচ্ছে তুমি নিজেই যেন চাও না যে তুমি জেতো। প্রসঙ্গত ফেম গুরুকুলে তিনি ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।

কিন্তু তারপরে অবস্থার বদল হয়েছে; উদাসীনতা সরিয়ে লক্ষ্যভেদের সংকল্পে একনিষ্ঠ হয়েছেন তিনি; বলিউড এসেছে তাঁর সাফল্যের মুঠিতে, কিন্তু অরিজিৎ থেকেছেন সাধারণের থেকেও সাধারণ হয়ে।

একদিকে যশ খ্যাতি আর প্রবল আর্থিক প্রতিপত্তি আর অন্য দিকে ভিখারি হওয়ার জীবন দর্শন, এই দুইয়ের মাঝে মানুষ অরিজিৎ কিন্তু কোনোরকম বিপরীত টানাপোড়েনের মুখোমুখি হননি।

কারণ, অরিজিৎ তাঁর আপাত প্রতীয়মান বিচিত্র মানসজমিনকে বেদান্ত দর্শনের বিশুদ্ধ জ্ঞান বারি দিয়ে সিঞ্চিত করতে পেরেছিলেন, যার মূল ভিত্তি ছিল আত্মজ্ঞান লাভ বা মানবাত্মা ও পরম ব্রহ্মের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ না পাওয়ার দিব্য উপলব্ধি। অর্থাৎ অহং ব্রহ্ম।

ছোটবেলায় বিবেকানন্দ পড়ে বুঝতে পারেন নি, কলেজে দর্শন নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝতে পারলেন, স্বামীজীর শিব জ্ঞানে জীব সেবার মূল্ তত্ত্বটি আসলে বেদান্তের অদ্বৈতবাদ থেকে আহৃত।

তাই জিয়াগঞ্জে তত্ত্বমসী নামক এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তিনি বলেন, তাঁর ভিখারী হওয়ার ইচ্ছা এবার পূর্ণতা পাবে। ভিক্ষার অর্থ দিয়ে মানুষের জন্যে কাজ করার লক্ষে এটি তাঁর প্রাথমিক ধাপ; তবে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভিক্ষার্জিত অর্থে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত সংস্রব থাকবে না। অর্থাৎ প্রবল রাজকীয়তার আবহেও ভিখারি হয়ে থাকার জীবন দর্শনে তিনি অবিচল; কোনো কিছুই তাঁকে টলিয়ে দিতে পারবে না তাঁর সংকল্প থেকে। বরং এই দুই বৈপরীত্যের মাঝে ভারসাম্যের রাজপথ নির্মাণ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বৈভবের যাবতীয় উপাদানের মাঝেও কিভাবে উদাসীন থাকা যায়।  

গতবছর, ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর জিয়াগঞ্জের বাড়িতে এসেছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ গায়ক ও গীতিকার এড শিরান, অরিজিৎ এর ট্রেডমার্ক মার্কা স্কুটির পেছনে বসে ঘুরেছেন গোটা জিয়াগঞ্জ। অনেকেই জানেন না, অরিজিৎ লন্ডনের রয়েল কলেজ অফ মিউজিকে গিয়েছিলেন সঙ্গীত শিক্ষা নিতে, তবে কোর্স শেষ না করেই ফিরে এসেছেন। রয়েল অ্যালবার্ট হলে হাউসফুল কনসার্ট করেছেন, স্পটিফাই ভিউয়ার রেটিং এ টেলর সুইফ্ট কে হারিয়ে চার্টের শীর্ষে উঠেছেন, কিন্তু দিনের শেষে সেই কুলায় ফেরা পাখির মতো, ফিরে এসেছেন জিয়াগঞ্জের মাটিতে।

যেখানে তাঁর গুরুজী প্রতিষ্ঠিত প্রিয় - মূর্ছনা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় রয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানে তাঁর সুর সাধনার হাতে খড়ি হয়েছিল; রয়েছে 'বাক্যব্যয়' নামক নাট্যগোষ্ঠী গড়ার ইতিহাস, রবীন্দ্র নাট্য প্রযোজনা করার তৃপ্তি; 'হেঁশেল' নামে মাল্টিকুজিন রেস্তোরাঁ গড়ে তোলার গর্ব, হাসপাতাল, মিউজিক স্কুল প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য, খেলার মাঠ, অলিগলি, গঙ্গার ঘাট, স্কুটি,, স্কুলবেলার বন্ধুবান্ধব, পাড়ার কাকিমা, জেঠিমা থেকে শুরু করে কাকু ভাই দাদাদের স্নেহ শ্রদ্ধা ভরা অম্লমধুর স্মৃতি।

কিন্তু যতটা হেলায় তিনি বলিউডের প্লেব্যাক জগত ছেড়ে আসার কথা বলেছেন, তার পেছনে তাঁর জিয়াগঞ্জের প্রতি টান যেমন কাজ করছে ততটাই ভূমিকা রয়েছে গীতার নিষ্কাম কর্ম দর্শনের প্রতি তাঁর একান্ত অনুরাগ। নিজেই ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মোহ মানুষকে কর্ম ফলের প্রত্যাশায় ব্যাকুল করে তোলে। তাতে সাফল্য যেমন তাকে উচ্ছ্বসিত করে, ব্যর্থতা তেমনি তাকে দুঃখের জালে আবদ্ধ করে।

অত এব সে জালে পড়ার আগেই তিনি ফিরে এসেছেন আপন বাসায়, জিয়াগঞ্জে; যেখানে থেকে তিনি তার দীর্ঘ দেড় দশকের সফল যাত্রাপথটাকে অন্তত মোহমুক্ত হয়ে বিচার করতে পারবেন।

আর সবকিছুর পরেও তো রয়ে গেল জিয়াগঞ্জের সেই প্রিয় বাতাস, বলিউডের আকাশ রেখা মুক্ত - সুরের নির্মোহ ডানা ঝাপটানোর জন্যে!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আখ্যায় ভূষিত করেছেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘ...