আজকে শাম তুমারে নাম! কিন্তু শুধু শাম-ই বা কেন, প্রিয়
মানুষের নামে পথ ঘাট, বাজার, লাইব্রেরি থেকে মহাকাশ স্টেশন সবকিছুই যখন হতে পারে
তখন কাফকা বা উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নামে (বিশেষ প্রজাতি) ডালিয়া বা গোলাপের নামকরন হলে আর বেশী কী। ইষ্ট দেবতার
নামে ছেলে মেয়ের নাম দেওয়ার চল তো বহু পুরনো, বহু দিন আগে একটা জায়গায় পড়েছিলাম
বিহারের কোনো এক বাসিন্দা তিনি নাকি এতটাই ভক্ত ছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের যে আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সিং। উদ্যানবিদ
হাজি কলিমোল্লা খান, উত্তর প্রদেশের মানুষ; রকমারি হাইব্রিড আম ফলানোয় একেবারে
দিকপাল। কিন্তু শুধু নতুন নতুন আম বানালেই তো হবে না, তাদের নামও তো দিতে হবে। হাজি
কলিমোল্লা সাহেব এ ক্ষেত্রে কিছু জীবন্ত কিংবদন্তীর নাম বেছে একেবারে তাক লাগিয়ে
দিয়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে দেশের বড় বড় ভি ভি আই পিরাও নামকরণের চক্করে পড়ে আম হয়ে
গিয়েছেন। যেমন শচিন আম, নরেন্দ্র মোদী আম বা সোনিয়া গান্ধী আম ইত্যাদি।
সাধারণত নবজাত শিশু সন্তানদের নামকরণের জন্যে বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন তথা প্রিয়জনদের কাছ থেকে গুচ্ছের নামের আব্দার আসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন নামটি সদ্যোজাত শিশুটির জন্যে বরাদ্দ হবে তা ঠিক করে নেওয়ার অধিকার থাকে কেবল তার বাবা মায়ের হাতেই। একই নিয়ম নতুন কোনো প্রজাতির গাছ ফুল ফল বা পোকা মাকড় যাই হোক না কেন তার নামকরণের ভারও সেই উদ্ভাবনটির সংশ্লিষ্ট আবিষ্কারকের ওপরেই ন্যস্ত থাকে। নামকরণের প্রশ্নে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তথা পরমানু বিজ্ঞানী এ পি জে আব্দুল কালামের নামকেই সর্বাধিক বেশী বার বেছে নিতে দেখা গেছে। সে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে শুরু করে ভারতের বোটানিক্যাল সার্ভে, সব ক্ষেত্রেই কালামের নাম প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নাসা’য় আবিষ্কৃত নতুন আণুবীক্ষণিক জীবের নাম দিতে গিয়ে যেমন এর আবিষ্কারক ডক্টর কস্তুরি ভেঙ্কটেশ্বরণ কালামের নাম যুক্ত করে তার নামকরণ করেছেন সলিব্যাসিলাস কালামি, তেমনি বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গবেষকরা পশ্চিমবঙ্গের জলদাপাড়া জাতীয় পার্ক থেকে উদ্ধার করা একটি গুল্ম জাতীয় ঔষধি গাছের নাম দিয়েছেন Drypetes কালামি।
এই ধারায় যে নবতম সংযোজনটির কথা এবারে বলবো তা অবশ্য খবর কাগজে বেশ ফলাও করেই ছাপা হয়েছে সম্প্রতি। সেটি একটি নতুন প্রজাতির বোলতার নামকরণ সংক্রান্ত খবর; কলকাতার খুব কাছেই রাজারহাট সংলগ্ন একটা জমিতে সম্প্রতি এটি চোখে পড়ে, ঘাসের পাতায় বসা এই বোলতার লার্ভা গুলো গুবরে পোকার মূককীট বা পিউপার মধ্যে থেকে বড় হচ্ছিল। গাত্রবর্ণ চড়া হলদেটে কমলা রঙের হওয়ায় সহজেই এরা দৃষ্টি আকর্ষিত করে। কল্যানী ও কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষক দলের পক্ষ থেকে অন্যতম পতঙ্গবিদ অর্ণব চক্রবর্তী জানিয়েছেন এটি একটি টেট্রাস্টিকাস বংশীয় বোলতা, সারা পৃথিবীতে এই বংশের অধীন প্রায় ৫০০ টি’র মত নথিভুক্ত প্রজাতির বোলতা রয়েছে, যার মধ্যে ভারতে রয়েছে ৮৬ টি। এটি ৮৭ তম। চিহ্নতকরনের পরে, স্বাভাবিক ভাবে সেটির নাম পরিচিতি কী হবে সেটা ঠিক করার পর্ব আসে। সেক্ষেত্রে উদ্ভাবক মণ্ডলীর বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্তকেই মান্যতা দেওয়াটা রীতি। সংবাদে প্রকাশ, অর্ণব চক্রবর্তীরা এই নামকরণের প্রশ্নে সুন্দর একটা চমক দিয়েছেন, যা সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।। কারণ প্রথাগত কোনো বৈজ্ঞানিক বা কোনো প্রখ্যাত পতঙ্গবিদের নাম নয়, বরং এই নতুন প্রজাতির বোলতাটির নাম তাঁরা রেখেছেন প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট তথা কিংবদন্তী কমিক্স লেখক নারায়ণ দেবনাথের নামে। প্রসঙ্গত এর আগে ১৯৮৯ সালে ভারতের মাটিতে অন্য একটি নতুন টেট্রাস্টিকাস প্রজাতির বোলতা খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, যার নামকরণ হয়েছিল বিখ্যাত পতঙ্গবিদ ডক্টর টি সি নরেন্দ্রনের নামে – টেট্রাস্টিকাস টিউনিকাস নরেন্দ্রন। উল্লেখ্য এই টেট্রাস্টিকাস টিউনিকাস নরেন্দ্রন ও রাজারহাটের নব উদ্ভাবিত বোলতা টেট্রাস্টিকাস নারায়ণদেবনাথি দুটো চরিত্রগত ভাবে অনেকটা এক। প্রথমত এরা পরজীবী, এবং ভারতের যে দুটি টেট্রাস্টিকাস প্রজাতির বোলতা যাদেরকে বিশেষ করে পত্র খাদক পোকা বা এক শ্রেনীর গুবরে পোকার মধ্যে দলবদ্ধ ভাবে বাস করতে দেখা যায় তারা এরা। সারা পৃথিবীতে এদের ছাড়া আর একটি এরকম উদাহরণ আছে। প্রসঙ্গত এরা এই পত্র খাদক বা কাসিডিনা জাতীয় পোকার শরীরে যে শুধু বাস করে তাই নয়, তাদেরকে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলে, তাই চাষাবাদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক পোকাদের মারতে এই ধরনের ঘাতক পরজীবী শ্রেনীর টেট্রাস্টিকাস বোলতার বড় ভূমিকা রয়েছে।
উল্লেখ্য, কোলকাতা স্থিত iForNature - নেচার ক্লাব নামে একটি গবেষণাগারে এই নতুন প্রজাতির বোলতাটির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মা গঠনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে বলে জানা গেছে, যেটির প্রসঙ্গক্রমে প্রতিষ্ঠাতা অর্ণব চক্রবর্তী। এতে বিশ্ব পতঙ্গবিদ্যার মানচিত্রে কোলকাতার অবস্থান বেশ উজ্জ্বল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি 'বাঁটুল দি গ্রেট' সহ 'নন্টে ফন্টে’র মত বাংলা কমিক্স সাহিত্যের সর্বকালীন সেরা সৃষ্টির রচয়িতা হিসেবে নারায়ণ দেবনাথের নামটিও যে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান চর্চার স্তরে চিরস্থায়ী স্থান অধিকার করে নিল সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র সাংবাদিককে অর্ণব চক্রবর্তী তাঁর নারায়ণ দেবনাথের প্রতি বিশেষ টানের কথা জানিয়ে বলেছেন, নারায়ণ দেবনাথের মত শিল্পী তথা লেখক যার অমর সৃষ্টি কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঙালীর শৈশবকে বুঁদ করে রেখেছে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এই নামকরণের সিদ্ধান্ত।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন