অনেকটা খেজুর গাছে ঝোলানো কলসির মতো দেখতে, কিন্তু মাটির নয়, সবুজ লতা শুকিয়ে তাকে দড়ির মতো করে পাকিয়ে বানানো চুপড়ি এগুলি। গায়ে আবার চৌকো মতো ফোকড় করা থাকে; যেখান দিয়ে চড়ুই পাখি সহজে ঢুকতে, বেরুতে পারবে। সাধারণত চড়ুই, যাদের বাড়ির চিলেকোঠায়, ঘুলঘুলিতে বা কড়িকাঠের ফাঁকে, অতি সাধারণ খড় খাচি দিয়ে বাসা বানাতে দেখা যায় তাদের জন্যে এই নতুন বাসা নির্মাণের খরচ অবশ্য পড়ছে মাত্র পাঁচ টাকা।
প্রসঙ্গত ডিম পাড়ার সময়, চড়ুইয়ের বাসার খুব প্রয়োজন। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর - এই কয়েকমাস চড়ুইয়ের প্রজননের সময়। এই সময়ে আবার ভরা বৃষ্টি কাল চলে, তাই নীড় বাঁধা চাইই। কিন্তু শুধু বাঁধতে চাইলেই তো হবে না, ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বা উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; এছাড়াও বর্তমানে বাড়ি ঘরের যে স্থান সংকুলান তাতে চড়ুই পাখি বা তার বাসার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব; নিছক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। ফলে চড়ুই সংখ্যা দিনদিন কমছে। তাই চড়ুই রক্ষায় কৃত্রিম এই বাসা নির্মাণের পরিকল্পনা। কিন্তু শুধু নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি মণিপুরের আনিশ আহমেদ, এইসময় মণিপুরের কাকটা গ্রাম বা তার আশেপাশের এলাকায় গেলে তাঁকে রীতিমতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসা ফেরি করতেও দেখা যাবে।
উত্তর পূর্বের রাজ্য মণিপুর দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত লড়াইয়ে অগ্নিগর্ভ। ২০২৩ থেকে এখানকার প্রধান দুই জাতি গোষ্ঠী মেইতি ও কুকিদের মধ্যে চলছে নিরন্তর বিবাদ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক এম. কে. হেনরি কে আনিশ জানিয়েছেন, রীতিমতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে বেরোতে হয়। আনিশ, মেইতি পঙ্গল বা মণিপুরী সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। বিষ্ণুপুর জেলার কাকটায়, যেখানে তার বাড়ি, তা পার্শ্ববর্তী কুকি অধ্যুষিত জেলা চুড়াচাঁদপুরের সীমান্তবর্তী। তাই বিনা নোটিশে যখন তখন শুরু হয়ে যায় দুই পক্ষের গুলির লড়াই। আর সেই অগ্নিপথের মধ্য দিয়েই, চড়ুই পাখির বাসা হাতে ঝুলিয়ে তিনি পোঁছে যান মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।
আনিশের বাবা আবদুল আজিজ আজ নেই, কিন্তু আনিশ তাঁর বাবাকে কথা দিয়েছিলেন। তাই ২০১৯ থেকে তিনি শুরু করেন এই চড়ুই বাঁচাও অভিযান। প্রথম প্রথম গ্রামের মানুষ পাত্তা দেননি; সত্যিই তো, যেখানে সাধারণ জীবন যাপন এত সমস্যা দীর্ণ সেখানে পাখির বাসা স্থাপন বিলাসিতা ছাড়া কি হতে পারে। কিন্তু আনিশ হাল ছাড়েননি। উল্টে তাদেরকে বুঝিয়েছেন, কৃষি ক্ষেত্রে চড়ুই পাখির অবদান কতটা প্রয়োজনীয়। ক্ষতিকারক পোকামাকড় এবং শুককীট খেয়ে অযথা রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার থেকে বাঁচায় এই ছোট ছোট চড়ুই পাখি গুলো, তাতে চাষের খরচ কমে যায় অনেকটা এবং ফলন বাড়ে। এমনকি পরাগমিলনও এতে সহজ হয়।
পথ কুসুমাকীর্ণ না হলেও, শেষমেশ জয় এসেছে আনিশ আহমেদের; এখন মানুষ নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বাসা সংগ্রহ করে। আনিশ তাদের ঘরে কোথায় কিভাবে বাসা গুলিকে বাঁধতে হবে, বুঝিয়ে দেন যত্ন করে। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ বাসা স্থাপন করেছেন তিনি, এছাড়া ৩০০ 'র মতো বাসা বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন। এখন পরিসংখ্যান বলছে, এলাকায় চড়ুইয়ের সংখ্যা বছরে প্রায় ৫০০০ মতো বেড়ে গিয়েছে। প্রসঙ্গত একটি মা চড়ুই বছরে চারটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত বাচ্চা জন্ম দেয়।
কবি তারাপদ রায় লিখেছিলেন, "চতুর চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই বাসা বাঁধে"।
আনিশ আহমেদ, ঘরে ঘরে চড়ুইয়ের বাসা বসিয়ে, সেই চতুরতার ভিত যেন আরোও শক্ত করে দিয়েছেন।
মণিপুরের রাজ্য সরকার, আনিশ আহমেদকে তাঁর এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন। ২০২২ ও ২০২৩ এ পরপর দুবার, রাজ্য বন্যপ্রাণ রক্ষা উদ্যম সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
কিন্তু আনিশ আহমেদের ভূমিকা আরোও বিস্তৃত, যেতে যেতে এইটুকু বলতেই হয়। পরিবেশবান্ধব আনিশ ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫ টি প্রজাতির বন্যপ্রাণীকে রাজ্য বন দফতরের হাতে তুলে দিয়েছেন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। এছাড়াও মণিপুরের মাটিকে আরোও সবুজ করে তুলতে তিনি ইতিমধ্যে প্রায় দু লক্ষ চারাগাছ লাগিয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। এবং আরোও ৫০,০০০ গাছ বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন।
মণিপুরের একা কুম্ভ আনিশ, পরিবেশ রক্ষার যুদ্ধে অন্তত পক্ষ বিপক্ষ সকলকে এক করতে পেরেছেন।
ছবি ও তথ্য সূত্রঃ ২০/০২/২০২৬ তারিখে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত খবর।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন