সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাংলা ভাষার 'ব র ড ড়' দশা প্রাপ্তি!!

বইমেলা তখন ময়দান থেকে সেন্ট্রাল পার্কে উঠে আসেনি, এক সন্ধ্যায় গেছি, দেখি এক আলোচনা মঞ্চে তখন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বক্তব্য রাখছেন। বাংলা ভাষার বানান বিভ্রান্তি নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন, ১৯৯১ এ তাঁর সম্পাদনায় বাংলা বানান বিধি নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য বইও বেরিয়েছে ‘বাংলাঃ কি লিখবেন কেন লিখবেন’ নামে। তা যে কারণে বক্তৃতাটি আমার স্মৃতিতে আজও অটুট সেটি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং সরস পর্যবেক্ষণের কারণে। কী বলেছিলেন তিনি?  বলেছিলেন, “একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা পত্রিকা গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন বানান লিখছেন এটি বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে একটি সাধারন বিড়ম্বনা, কিন্তু অসুবিধা হয় যখন একই ব্যক্তি একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন বানান লিখছেন।" 

২১ শে ফেব্রুয়ারি তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের দিনে প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার গুরুত্ব যথেষ্টশুধু বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে নয়, মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণদানের ইতিহাসও বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতে নেই। তাই বাংলা ভাষার একটি সর্বজন গ্রাহ্য বানান বিধি থাকা অবশ্য প্রয়োজন, অন্তত এই নিয়ে কারোর কোনো দ্বিমত নেই কিন্তু সমস্য হচ্ছে, কার্যক্ষেত্রে সেটা মেনে চলা নিয়ে ন্যুনতম নিষ্ঠার অভাব আবার প্রথম ক্ষেত্রে সহমত পোষণ করার সঙ্গে স্ববিরোধীতার সম্পর্ক তৈরি করে।
বাংলার বানান সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুজন স্টেক হোল্ডার হল বাংলাদেশ এবং কাঁটাতারের এপারে থাকা পশ্চিমবঙ্গ। যদিও এই ব্যাপারে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে প্রচুর। সে ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ এবং বহুধা ব্যাপ্ত
সবটা এখানে বলা সম্ভব নয়। আজকে আলোচনার মূল প্রেক্ষিত থাকবে যে বিষয়টির ওপরে সেটি হল বর্তমান সময়ের নিরিখে বাংলা বানানের যে - ব র ড ড় অবস্থা চলছে সেটির ওপরেই প্রধানত আলোক ফেলা সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’ এর কথা মনে পড়ছে নিশ্চয়ই, এটা খানিকটা সেরকমই। ওখানে ছিল রুমাল, হয়ে গিয়েছিল বিড়াল, আর এখানে রুমালের ড়ুমাল হওয়ার কাহিনী।  কিভাবে সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। তার আগে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যেতে পারে এযাবৎ দুই বঙ্গ মিলিয়ে যতগুলি বানান বিধি প্রণয়নের চেষ্টা হয়েছে তাদের কথা এবং তাদের সিদ্ধান্ত গুলির কোনো অবদান বর্তমান এই অবস্থা সৃষ্টির পেছনে রয়েছে কিনা সেটা খুঁজে বের করা।  
আসলে বাংলার প্রধানতম শব্দ স্রোত হচ্ছে তৎসম শব্দের। সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত এই শব্দ গুলোর বানান রীতি মোটামুটি সংস্কৃতানুগ বা অপরিবর্তিত রাখার ব্যাপারে এপার অপার দুই দিকের যতগুলি প্রামান্য বানানবিধি প্রণয়ন কমিটি তৈরি হয়েছে প্রত্যেকেরই এক মত। সে ১৯৩৫ সালে, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত বানানবিধি প্রণয়ন সমিতি হোক কি  ১৯৯২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকা স্থিত বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানানবিধি প্রণয়ন কমিটি বা ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমীর বানান অভিধান সমিতি –কারোর কিন্তু এই নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। মনে রাখতে হবে, ১৯৩৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কমিটি গঠনের মূল প্রেরণা ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কমিটির সদস্যরা ছিলেন, রাজশেখর বসু (সভাপতি), সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় , চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য   (সম্পাদক), প্রমথনাথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারদের মতন কৃতবিদ্য সাহিত্যিক তথা ভাষাবিদেরা। অন্যদিকে বাংলা একাডেমীতে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, জামিল চৌধুরী , মোহম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ সর্বজন মান্য ভাষা বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বগণ
৯৭ এর পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে গঠিত বাংলা বানান অভিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যদের মধ্যেও ছিলেন এক ঝাঁক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক, পণ্ডিত ব্যক্তিরা; যাদের মধ্যে কবি নীরন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, অধ্যাপক পবিত্র সরকার প্রমুখ অন্যতম।     
প্রসঙ্গত এর মধ্যে,  ১৯৭৯ তে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় - আরও একটি ভাষা সংস্কার সমিতি গঠন করে। যার সভাপতি ছিলেন অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। সেবার অবশ্য অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই নব-বানান নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ স্থগিত হয়ে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশেও ৯২ এর আগে ১৯৪৯ এবং ১৯৬৭ সালে পরপর দুবার (পাকিস্থান অন্তর্ভুক্ত থাকাকালীন) যথাক্রমে  মৌলানা মহম্মদ আকরম খাঁ এবং ড। মোহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে সংগঠিত হয় বাংলা বানান সংস্কারের প্রচেষ্টা। যদিও ১৯৬৮ সালে কমিটির সুপারিশ মেনে বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঐ, ঔ, ঙ, ঞ, ণ, বা ঈ – কার বা ঊ – কার বর্জন সহ আরও কিছু নিয়ম প্রণয়নের বিরুদ্ধে কড়া মত প্রকাশ করেন মুহাম্মদ এনামুল হক, মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও মুনীর চৌধুরী প্রমুখ ভাষাবিদ।  ফলে তা কার্যকরী হয় না। শেষে যেটা দাঁড়াল, সেটা - তৎসম শব্দ নিয়ে সকলের এক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।  সমস্যা থেকে গেল অ–তৎসম শব্দ নিয়ে।  যার মধ্যে তদ্ভব, দেশী, বিদেশী ও মিশ্র শব্দ রয়েছে।  
এই সব শব্দের ক্ষেত্রে ণত্ববিধি ও ষত্ববিধির কড়াকড়ি শিথিল করার পরামর্শ দেওয়া হয়।  অর্থাৎ এইসব শব্দে  ণ এর বদলে  ন এর ব্যবহার সিদ্ধ হবে বলে স্থির করা হয়; যেমন – ইরান, অঘ্রান, কোরান, গুনতি, ঝরনা ইত্যাদি।  তেমনি স, শ, ও ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়মের বেড়াজাল আলগা করে দেওয়ার প্রস্তাব কার্যকরী হয়। এতে বাংলা শব্দ ভাণ্ডার থেকে, অনেক শব্দের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু সেটি অন্য প্রশ্ন। অ-তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে ঈ – কার বা ঊ –কার ব্যবহার অ-দরকারি বলেও মত প্রকাশ করা হয়, কেবলমাত্র ই –কার ও উ – কার দিয়েই এই সব শব্দ লিখতে পারা যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। আনুষ্ঠানিক ভাবে ওপারের বাংলা একাডেমী আর এপারের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমীর মধ্যে বানান নিয়ে মতের প্রভেদ নেই বলে ঘোষণা করলেও বিধি প্রণয়নকারীদের মধ্যে কিছু দ্বিমত থাকার কথা স্বীকার করতেই হয়, কিন্তু সেটি উল্লেখযোগ্য নয়। আসল সমস্যাটি কিন্তু তৈরি হয় ব্যবহারিক পরিসরে।  অর্থাৎ নানা মুনির নানা মতের মত সাধারন বাংলা ব্যহহারকারীদের মধ্যে তেমন কোনো সমন্বয় দেখা যায় না।  ওপরতলার বানানবিধি সংক্রান্ত পরিমার্জিত নিয়ম সঠিকভাবে পৌঁছায় না, যার ফলে বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি সুদূরপরাহত থেকে যায়।
এই নিয়ে একটা মজার আবার বেশ সিরিয়াস গল্প আছে; আমি একবার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ক্যাম্পাসের মধ্যে একটি পানীয় জলের ট্যাঙ্কের গায়ে ‘পরিশ্রুত’ পানীয় জল - লেখা দেখে চমকে গিয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য শব্দটি ‘পরিশ্রুত’ নয় পরিস্রুত হবে। পাশেই বিবেকানন্দ লোকশিক্ষা নিকেতনের অফিস রয়েছে; ‘লোকশিক্ষা’ নামে একটি সাময়িকীও বের হয় ওখান থেকে, সঙ্গে সঙ্গে - সেখানে গেলাম। একজন মহারাজ বসে ছিলেন। মহারাজ, একটা কথা বলবো বলে - শুরু করতে, মহারাজ ঘাড় না তুলেই বললেন, বল। বললাম। শুনেই দৃশ্যত জিভ কেটে ফেললেন, মহারাজ
আমাকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি লেখার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট মহারাজকে ধরলেন ফোনে। বললেন, অবিলম্বে বানান সংশোধন করতে, না হলে ভুল বার্তা যাবে শুধু নয় পাবলিক প্লেসে ওরকম ভুল বানান অনেকেই তাকে ঠিক বলে ধরে নিতে পারে।
প্রসঙ্গত আমি শিয়ালদহ স্টেশনের মধ্যেও ‘পরিশ্রুত’ পানীয় জল – লেখা দেখেছি। সবথেকে যেটি আপত্তিজনক সেটা হল, এই পরিস্রুত শব্দটি কিন্তু একটি বিশুদ্ধ তৎসম শব্দ। আসলে বাংলা বানানবিধির কথিত সমতা রক্ষার প্রশ্নটি প্রথম ওঠে উনিশ শতকে, একথা ঠিক তখন বঙ্কিম বিদ্যাসগরের হাত ধরে যে বাংলা গদ্য সাহিত্যের উন্মেষ হচ্ছিল, তাতে সাধু লিখন শৈলী ও ব্যুৎপত্তিগত বিশুদ্ধ তৎসম শব্দের ভিড়ে তথাকথিত চলিত কথ্য শব্দের কোনো জায়গাই ছিল না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেই মৌখিক অশিষ্ট শব্দ গুলিই যে খবর কাগজ বা বই এর পাতায় ক্রমশ নিজেদেরকে ফুটিয়ে তুলতে চাইছিল সেটি অনুভব করতে পেরেছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। ১৮৫৫ সালে তিনি তাদের কথা ভেবেই বাংলা বর্ণমালায় ব্যাপক রদবদল আনলেন। প্রণয়ন করলেন বর্ণপরিচয়। এর মাত্র ২২ বছর আগে, ১৮৩৩ সালে রাজা রামমোহন রায় তাঁর ‘গৌড়ীয় ব্যকরণ’ গ্রন্থে বাংলা বর্ণমালার যে বর্ণ বিন্যাসের কথা জানিয়েছিলেন, তাতে ১৬ টি স্বরবর্ণ ও ৩৪ টি ব্যঞ্জনবর্ণ (মোট ৫০ টি ) থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন
উল্লেখযোগ্য ভাবে এই বর্ণমালায় কিন্তু কোনো ড়, ঢ় বা য় ছিল না। প্রসঙ্গত রামমোহন রায় এটিকে গৌড়ীয় ভাষার বর্ণমালা বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এর পরে বিদ্যাসাগরের হাতে যেটা ঘটলো সেটা ভীষণ চমকপ্রদ পূর্বের এই বর্ণমালার সঙ্গে তুলনা করলে, বিদ্যাসাগর তাঁর প্রনীত বর্ণমালায় অনেক পরিমার্জন আনলেন যা আগামীদিনে যুগান্তকারী সাব্যস্ত হলকারণ সেই প্রথম বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে ড়, ঢ় ও য় - কে অন্তর্ভুক্ত হতে দেখা গেল। স্বরবর্ণ থেকে অনুস্বার - ং ও বিসর্গ কে সরিয়ে, তাদের ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে সংযুক্ত করা হল। ফলে স্বরবর্ণের সংখ্যা (১২) কমল এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা ৩৪ থেকে বেড়ে ৪০ হল। প্রসঙ্গত এর পরে আর কোনো সংস্কার বাংলা বর্ণমালায় হয় নি। অনেকবার প্রস্তাব এসেছে ঠিকই কিন্তু তা কার্যকরী হয় নি।
বিদ্যাসাগর যে কেবল বর্ণমালায় সংস্কার করলেন তাই নয়, তিনি নতুন যুক্ত হওয়া বর্ণ গুলির ব্যবহারিক রূপটিকেও লিখিত ভাবে সর্বসমক্ষে তুলে ধরলেন। বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ, অষ্টম পাঠে তাই অকুণ্ঠ চিত্তে তিনি লিখলেন - জল পড়িতেছে, পাতা নড়িতেছে। পূর্বের মত জল পতিত হইতেছে বা পাতা আন্দোলিত হইতেছে বলে লিখতে হল না তাঁকে। যে ষণ্ড কে ষাঁড় বলে লেখার জো ছিলে না, ড় যুক্ত হওয়ার পরে তা  অবলীলায় লেখা হতে থাকলো। যে অট্টালিকাকে বাড়ি বলে লেখা সম্ভব হচ্ছিল না তাও সম্ভব হল অতি সহজে। পূর্বে বৃহৎ বা বিরাট বোঝাতে বড় শব্দটি যতই মানুষের মুখে মুখে ফিরুক না কেন, লেখার ক্ষেত্রে বড্ড লেখা ছাড়া কোনো গতি ছিল না। কিন্তু এর পরে জড়তা কেটে গেল। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, জড়তার জায়গায় আর জাড্য কথাটিকেও লিখতে হল না। বিদ্যাসাগর এখানেই কিন্তু থেমে থাকলেন না, যদিও তাঁর এই অবিচ্ছিন্ন প্রয়াসের প্রমান পাওয়া গেল,  ১৮৯১ এ তাঁর মৃত্যুর পরে।  উদ্ধার হওয়া একটি বাঁধানো খাতার মধ্যে দেখা গেল, প্রায় ৭০০০ টির ও বেশি অ-তৎসম শব্দের একটি সংকলন লিখে রেখে গিয়েছেন তিনি
যেটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে
বাড়ি, গাড়ি, শাশুড়ির মত ড় যুক্ত শব্দ গুলি রয়েছে।  প্রসঙ্গত  ১৯০৮ সালে  সেটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়। কিন্তু আজকের প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয় যেটি সেই বাংলা বানানের - ব র ড ড় দশা প্রাপ্তির প্রসঙ্গে আসলে দেখা যাবে সেটি বেশিদিনের পুরানো নয়। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভালো, বাংলা ভাষায় বানান লেখার চল পুরোমাত্রায় ধ্বনিভিত্তিক না হলেও বর্তমান সময়ে তার প্রকোপ কিছু অতিমাত্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে।  এই প্রসঙ্গে কিছু উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি বোধগম্য হবে ভালো।  মৌখিক কিছু কথোপকথন তুলে ধরলে বোঝা যাবে, কিভাবে তার লিখিত রূপ বাংলা বানানের ক্ষেত্রে ঘোর বিভ্রান্তির অবতারণা ঘটিয়েছে; যাকে আমি বাংলা বানানের - ব র ড ড় দশা বলে অভিহিত করছি।  ধরা যাক দুটি সমবয়স্ক ছেলে মেয়ের মধ্যে কথা চলছে ফোনে। “কী ড়ে (রে) আজ সাড়াদিন (সারাদিন) কী ঘড়েই (ঘরেই) থাকবি নাকি? বাইড়ে (বাইরে) বেড়োবিনা (বেরোবি না) ?”
“চল না পার্কে যাই, কিছুক্ষণ ঘুড়ে (ঘুরে) আসি।।”  “শোন না, তুই কিন্তু তোড় (তোর) ওই তুঁতে রঙেড় (রঙের) শাড়িটা পড়ে (পরে) আসবি। আমড়া (আমরা) খানিক ঝিলের ধাড়ে (ধারে) বসবো।“ “ড়াখলাম, (রাখলাম) আসিস কিন্তু!” (শুদ্ধ বানান গুলি বন্ধনীর মধ্যে লেখা আছে)
উপরের সংলাপটি ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, যথেচ্ছ  ড় –উচ্চারণ এবং উচ্চারিত শব্দের ধ্বনির অনুরূপ বানান লিখতে গিয়েই যত গোল। দেখা যাচ্ছে, ড় যোগ শব্দটির মত হুবহু একটি অন্য মানের শব্দ, বাংলা শব্দকোষে রয়েছে। যেমন – তোর উচ্চারন হচ্ছে – ‘তোড়’ বলে; যে শব্দটি আবার স্রোতের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেমন – জলের তোড়। ‘পরে’ কথাটি পরিধান করে অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তাকে বলা বা লেখা হচ্ছে ‘পড়ে’ বলে।  পড়ে শব্দটি আবার পতিত হওয়া অর্থবোধক, যেমন বৃষ্টি পড়ে, আম পড়ে ইত্যাদি। একই ভাবে ‘আমরা’ হয়ে যাচ্ছে ‘আমড়া’, যেটি একটি টক ফলের নাম। ভাবুন।
নরেন্দ্রপুরে বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিতে লেখা হয়, ‘ঘড় ভাড়া দেওয়া হবে’। কৃষ্ণনগর স্টেশন চত্বরে যাত্রী সচেতনতা মুলক প্রচার হিসেবে নিঃসংকোচে লেখা হয় – অযথা নোংড়া ফেলে স্টেশন চত্বর অপরিষ্কার করবেন না। সমস্যাটি হচ্ছে বর্তমানে, সমাজ মাধ্যমে যে ভাবে আন-এডিটেড এই সব ভুল বানান লিখিত রূপে চলে আসছে সবার সামনে, যে ধীরে ধীরে তা শুধু গা সওয়া হয়ে উঠছে তাই নয়, ক্রমশ সেটাই ঠিক বানান হিসেবে প্রতিপন্ন হয়ে উঠছে সকলের কাছে। একথা ঠিক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভুল,  ছাপার অক্ষরে আসে নি, কিন্তু পাড়ার মিষ্টি দোকানের সাইনবোর্ডে যদি লেখা থাকে ভজহড়ি মিষ্টান্ন ভাণ্ডাড়, তবে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলা বানানের এই - ব র ড ড় দশা থেকে মুক্তির পথ বাতলাতে নিশ্চিত ভাবে ভাববেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমী, যথেষ্ট সিরিয়াস ভাবেই ভাববেন বলে বিশ্বাস।      
        
        
তথ্য ঋণঃ বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম – খলিল মাহমুদ
বাংলা বানান প্রমিতকরণের ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানানবিধি, ২০২০      
সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গি, সম্পাদনা ভবেশ দাশ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...