সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মগের মুলুকে চড়ক!

আট থেকে আশি, সক্কলে সন্ন্যাসী। চড়ক মেলাকে উপলক্ষ করে এমন গণহারে সন্ন্যাস নেওয়ার চল ভূ-ভারতে আর কোনো জনপদে আছে কিনা বলা মুশকিল। শুরু হয় চৈত্রের পয়লা থেকে, নীল ষষ্ঠীর আগের দিনে এসে গ্রামের আর কেউ বাকি থাকেন না সন্ন্যাসী হতে। ছেলে মেয়ে জোয়ান বুড়ো সক্কলে যে যেমন পারেনকেউ হেঁটে, সাইকেলে, কেউ বা বাইকে কিংবা টোটোতে বা ভ্যানে করে এসে উপস্থিত হন স্থানীয় শিব মন্দিরে। সবার কাছে থাকে এক একটা করে নতুন গামছা। ছেলেরা কোমরে গাঁট মেরে পরে, মেয়েরা কাঁধে ভাঁজ করে না হয় চাদরের মত জড়িয়ে রাখে। মন্দিরের ভেতরে, উঠোন জুড়ে চড়াচড়ি করে মানুষজন দাঁড়িয়ে থাকে। ভিড় সামলে যার যার হাতে নয় ধাগার যজ্ঞপোবীত তুলে দিতে রীতিমত হিমসিম খেয়ে যান পুরোহিত; কারণ তারও আগে থাকে মন্ত্র পড়ার পালা। যার যার গোত্র ত্যাগ করে শিব গোত্রে প্রবেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় সন্ন্যাস নেওয়ার পর্ব। পরের দিন নীল পুজো, তাই আর সন্ন্যাস নেওয়া যাবে না; ফলে আগের দিন যাকে বলে একেবারে হাট বসে যায় নবোদ্গত সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের, দিনটিকে এলাকায় হাট সন্ন্যাসী বলা হয়। তিনদিন ধরে চলা চড়ক মেলার এটাই শুরুর দিন। এলাকায় পুরো উৎসবের মেজাজ থাকে দিন গুলোতে; আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে যারাই কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন সবাই এই তিনদিন ঘরে ফিরে আসেন এবং সন্ন্যাস নেন

শীর্ণ বিদ্যাধরী নদীর দুপাশ ধরে পাহাড়ের মত উঁচু উঁচু বিশাল ডালাপালার সব শিরীষ গাছ, সেগুলি এখন ফুলে ফুলে ভর্তি। রেশমি ফিলামেন্ট সদৃশ পায়রা ঝুঁটির মত গোলাপি বা ফিকে সবুজ অজস্র পুষ্প দল ফুটে থাকে পাতার ফাঁকে ফাঁকে, চৈতালি বাতাসে কখনো বা তা খসে পড়ে ভূমিতলের ঘাসে কিংবা ঘেঁটু গাছের মাথায়। বিদ্যাধরীর পাশ দিয়ে সমান্তরাল ভাবে কালো পিচ ঢালা রাজ্য সড়ক চলে গেছে সোনারপুরের খেয়াদহের দিকে, তাতে অটো কিংবা ছোট বড় লরি চলার শব্দে মাঝে মাঝেই মনোযোগ আকৃষ্ট হয় সেই দিকে। রাস্তার পাশে চায়ের দোকান, মনোহারি শপ কিংবা লটারির টিকিট বিক্রির স্টলপ্রত্যেকটি দোকানদারের গলাতেই এখন সন্ন্যাস নেওয়ার কাঁচা সুতা ঝুলতে দেখা যাবে, সাইকেল করে যিনি বস্তায় ঘাস নিয়ে যাচ্ছেন, কিংবা বাইকে বাজার করতে তাঁরও খালি পা, কোমরে গামছা আঁটা


ফুল ধরেছে শিরীষ গাছে!  

ষোড়শ শতব্দীর শেষ লগ্নে এখানে পর্তুগীজ সহ মগ জলদস্যুরা আস্তানা গেড়েছিল বলে জানা যায়। তখন বিদ্যাধরীর বিস্তৃতি ছিল বিশাল, জোয়ার ভাটা হত। ১৬৬৫ সালে ফ্রাঙ্কেস বারনিয়ার নামে এক ফরাসি পর্যটক এই অঞ্চলে পর্তুগীজদের অবস্থানের কথা স্বীকার করেছেন। (Local People and the Global Tiger: An Environmental History of the Sundarbans by Ranjan Chakrabarty )

বিদ্যাধরীর তীরবর্তি এই অঞ্চলে তখন মৃতদেহ দাহ করা হত, শ্মশান ছিল, সেই থেকে এই জায়গার নাম তাড়দাহ যা ক্রমে তাড়দহ নামে পরিচিত হয়েছে বলে স্থানীয় বিশ্বাস। বর্তমানে এটি পূর্ব ক্যানিং এর একটি অতি প্রাচীন জনপদ


মাঝি পাড়ার শিবের মন্দিরে ভক্তদের ভিড়। 

ট্রেনে চম্পাহাটি স্টেশনে থেকে অটোয় করে তাড়দহে আসা যায়। অটো স্টপ থেকে উত্তর দিকে পিচ রাস্তা ধরে কয়েকপা এগুলেই দুটো পরপর বড় খেলার মাঠ পড়ে; পুরু ঘাসে ঢাকা, ওদের মাঝখানে লম্বা একটা ঝিল রয়েছে, ঝিলের উত্তর পাড়ে বুড়ো শিরীষের ছায়ায় 'সে গোল পাকায় এলাকার সন্ন্যাসী ছেলে ছোকরারা। কোনোটায় চলে তাস খেলা, কোনোটায় বা নিখাদ আড্ডা, কোথাও আবার নাল বাজিয়ে গান চলে অবিরাম; লোকগান থেকে জীবনমুখী, মানবেন্দ্র থেকে শ্যামল মিত্রসুরাদ্রিত সমবেত সোল্লাসে, রৌদ্র প্রকম্পিত তাড়দহের আকাশ বাতাস যেন অদ্ভুত প্রাণ উচ্ছ্বাসে আমোদিত হয়ে ওঠে। মাঝখানে থালাতে চুড়ো করে রাখা থাকে তেল, কাঁচা লংকা মাখানো আলু ভর্তা। তার সাথে, দাদা এক পেগ হবে নাকি - বলে অনাবিল আবদারের ফোড়ন আপনাকে মোহাবিষ্ট করবেই। হৃদয়ের এমন পাগলপারা আসরে মহাদেব আর মদিনার নবী কেউ আলাদা নন, মিলেমিশে সব একাত্ম হয়ে যান। তাইমদিনায় নবী এলো মা আমিনার ঘরে মত গানেও থেকে থেকে জয় ধ্বনি ওঠে দেবাদিদেব মহাদেবের। ধর্ম বিশ্বাসের এমন মধুর ককটেল আর কোথায়!


তাড়দহ মাঝিপাড়ায় শিবের থান, সামনের চাতালে মাটির মকর মূর্তি।  

এখানকার টানটাই অন্যরকম,” বলছিলেন স্থানীয় চায়ের দোকানি প্রহ্লাদ মণ্ডল।ভিন্ন গ্রামের যে সব মেয়েরা এখানে বউ হয়ে আসে, তারা বাপের বাড়ি ভুলে যায়। আবার এখানকার মেয়েরাও বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে বেশিদিন মন ধরে থাকতে পারে না।

চায়ের দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে বসে শুনছিলাম উনার কথা। সামনের মাঠে ছোট ছোট ছেলেদের ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। চৈত্রের চড়া রোদ, পিচ রাস্তা তেতে নরম হয়ে গেছে। এর মধ্যে খালি পায়ে দুটি কিশোর বয়সী ছেলে মেয়ে এসে উপস্থিত, হাতে তাদের একটি করে মাটির মালসা। তাতে কয়েক মুঠো চাল, গুটিকয় আলু আর কিছু খুচরো পয়সা পড়ে আছে। সমস্বরে তারাদেবের দেব মহাদেববলে উঠতেই দোকানিও হাত কপালে ঠেকিয়ে মহাদেবের নামে জয়ধ্বনি দিলেন এবং কিছু খুচরো পয়সা মালসার মধ্যে ফেলে হাসিমুখে তাদের বিদায় দিলেন। চড়ক উপলক্ষে গাজনের এটি একটি বহু পুরনো রীতি, দিনের শেষে এই চাল আলু দিয়েই দিনের একমাত্র পাক-কৃত আহার সম্পন্ন হয়। বাকি সারাদিন ফল পাকুড় দিয়ে চলে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারন

রাস্তার পাশে যত্রতত্র বুচ গাছের ঝুপড়ি, তাতে হলুদ হলুদ ফুল ফুটেছে সুন্দর। কাঁটা যুক্ত গাছ। চড়কের দিন এই গাছ জড়ো করে তার উপরে ঝাঁপ দেয় সন্ন্যাসীরা। ঝাঁপ সন্ন্যাসী বলে একে। তবে এলাকায় যে দুটো প্রাচীন শিবের মন্দির আছে, তাদের নিয়ম কিন্তু সব ক্ষেত্রে এক নয়। খেয়াদহ হয়ে বামনঘাটা লেদার কমপ্লেক্সে যাওয়ার এই পিচ রাস্তার দুপাশে রয়েছে দুটি মন্দির, একটি মাঝি পাড়ায় অন্যটি প্রতাপনগরের মণ্ডল পাড়ায়। জেলে পরিবারের নিত্যকুমার মাঝি তৈরি করেছিলেন মাঝি পাড়ার মন্দিরটি, তাও দেড়শো দুশো বছর হয়ে গেল। নীল পূজার আগের দিন, মন্দিরের সামনে ব্রতী ভক্তদের হাতে পানীয় জল কাঁচা ছোলা তুলে দিচ্ছিলেন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা নিত্যকুমার মাঝির প্রপৌত্র সতীশ কুমার মাঝি। বললেন, এখানে চড়ক দেখতে একসময় পূর্ণেন্দু পত্রী এসেছিলেন। মন্দিরের সামনে চাতালে প্রকাণ্ড কুমিরের অবয়ব শায়িত দেখে চমকে উঠেছিলাম প্রথমে, কিন্তু এখানে এটাই নিয়ম; পুকুরের কালো পাঁক দিয়ে কুমিরের আদল বানানো হয়, তারপরে গায়ে কাঁচা খেজুর ফল লাইন করে এমন পুঁতে দেওয়া হয় যে কুমিরের গায়ের ডুমো ডুমো যে অমসৃণতা সেটা বেশ সুন্দর ফুটে ওঠে।। চোখ করা হয় ঝিনুকের খোল দিয়ে, দুদিকে দুটি। খানিক কেরচা করে বসানো হয়, কুমিরের মতন। উজ্জ্বল দেখাতে ঝিনুকের ওপরে দেখলাম রুপোলী রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। শিবের জটা থেকে নির্গত গঙ্গার বাহন মকরকে এখানে মাদি বাছুর ভেট দিয়ে পূজা করার নিয়ম। নীল ষষ্ঠীর বিকেলে সেই পূজা হয়। জ্বালানো হয় নীল মোমবাতি। নীল পূজার দিন, সকাল থেকে চরম ব্যস্ততা থাকে মন্দিরে। শুরু হয় চোর ধরা ব্রত দিয়ে; কাকভোর থেকে মন্দিরের চারপাশে ব্রতীরা মাথায় আতপ চালের পুঁটলি নিয়ে প্রদক্ষিণ করে। একজনের শেষ হলে আর একজন একইভাবে চালের পুঁটলি নিয়ে চারদিক ঘোরে। এই পর্ব শেষ হলে নীল পূজার মূল পর্যায় অর্থাৎ রুদ্রাভিষেক পর্ব শুরু হয়


প্রতাপনগর মণ্ডলপাড়ার শিবের মন্দির।  

মাঝিদের ছোট বড় ঘরের মাঝখান দিয়ে সরু গলি রাস্তা চলে গেছে মন্দিরের পেছনে, যেখানে ইট দিয়ে বাঁধানো প্রতিষ্ঠিত পুকুর রয়েছে। স্যাকরার পুকুর। সেই পুকুর থেকে জল এনে শিব লিঙ্গের মাথায় ঢালতে সারাদিন ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে মন্দিরে।

চড়কের দিন এখানে খেজুর গাছের পাতার ওপর ঝাঁপ দেওয়া হয়, প্রতাপনগরের মত কাঁটাওয়ালা বুচ গাছের ব্যবহার হয় না। তবে চড়কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আগুন সন্ন্যাসী দুটি মন্দিরের ক্ষেত্রেই এক। মাটির কুঁদোর ওপর চারদিকে চারটি খেজুর ডালা পুঁতে, মাথার দিকে পাতাগুলিকে একজোট করে বেঁধে তার ওপরে খড় দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়, নীচে সন্ন্যাসীদের হামাগুড়ি দিয়ে একদিক দিয়ে ঢুকে আর একদিক থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। পূর্বে মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে জ্বালা আগুনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেত হত

এখন নিয়মের কিছু শিথিলতা এসেছে। মন্দিরগুলোর থেকে চড়কতলার মাঠ খানিকটা দূরে, বিকেলে সেখানে মেলা দোকান পাট বসে, লোকজনের সমাগম হয়। বিশেষ করে, আলুর বিভিন্ন প্রিপ্যারেশান বিক্রি হওয়ার কথা সুবিখ্যাত এখানে। আলুর দম, আলু কাবলি থেকে আলু ঘুগনি, আলুর চাটনি। মাঠের পাশে দু দুটো শান বাঁধানো পুকুর রয়েছে, ছোটবেলায় মেলার স্মৃতি বলতে গিয়ে সতীশ বাবু বললেন, পুকুর ঘাটে বসে তখন যে তারা কি আমোদ করে শালপাতার ঠোঙ্গা চেটে আলুর তরকারি খেতেন, এখনও তা ভুলতে পারেন নি।

এককালে মগের মুলুক, তখন অবশ্য বিদ্যাধরীর বুক ছিল জল পূর্ণ। এখন বৃষ্টির সময় ছাড়া শীর্ণ নদী খাত শুকনোই থাকে। আগাছা, লতাপাতায় ভর্তি এক বিপন্ন অস্তিত্ব।

রাস্তা পেরিয়ে, খেলার মাঠের ওপর দিয়ে প্রতাপনগর মণ্ডল পাড়ার মন্দিরে পৌঁছে দেখি, চাতালে গাঁদা ফুলের ডাই। পাড়ার যুবতী সন্ন্যাসিনীরা ছুঁচ সুতো দিয়ে মালা গাঁথছে। আর মন্দিরের চূড়া থেকে পরপর সেই মালা গুলোকে ঝুলিয়ে সাজাচ্ছে পাড়ার সন্ন্যাসী যুবকেরা। এখানে মন্দিরে দুটি শিব লিঙ্গ রয়েছে পাশাপাশি, পুরোহিত বললেন পুরোনো শিব লিঙ্গটি ভেঙে গিয়েছিল, এক পাগল সেটিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করাতেই এমন বিপত্তি। পরবর্তীকালে তার বাড়ির লোকেরা দ্বিতীয় শিব লিঙ্গটি স্থাপন করেন।

চড়ক শেষে, মাঝিপাড়া শিবের থানে পালিত হয় বিশেষ নববর্ষ লোকাচার। জ্যান্ত শোল মাছ পুড়িয়ে, আতপ চালের ভাত সহ ডাক্তারবাগান পুকুর পাড়ের বাদার মাঠে ভূতেদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় বিশেষ ভোগ, ভোগদানের স্থলে, মাটি খুঁড়ে পুঁতে ফেলা হয় সন্ন্যাসীদের ধারন করা গুচ্ছ গুচ্ছ পৈতের সুতো।

ভোগ দানের শেষে কিন্তু ফিরে তাকাবার নিয়ম নেই। ভূতের নাথ ভূতনাথ তাতে ক্রুদ্ধ হন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...