বাড়ির বাইরে গুচ্ছের হোগলা গাছ, তাতে লাঠির
মতো, হলুদ হলুদ ফুল রেণু মাখা মঞ্জরী দন্ড গজিয়ে
ওঠা শুরু হয়েছে বেশ। চৈত্রের নির্মেঘ আকাশ কেমন যেন নিস্পন্দ, নিথর; দিনভর তপ্ত
রবির তেজে ঝলসানো, ম্রিয়মাণ! শীতল ঝড়ের
ছন্দ বুঝি কোন্ আড়ালে বসে প্রহর গুণছে মুক্তির অপেক্ষায়।
এমত সমযে তাই প্রলয়ের অন্তর কথা স্পষ্ট হয় মনের পর্দায়। "গোমড়া মুখের
আকাশ/ চাইছে আমায় বড় একান্ত।"
প্রলয়ের 'মধুক্ষরণ' রূপ কী শুধুই
প্রকৃতির ক্লেশ নাশিনী, নাকি জাগতিক জীর্ণতার স্থবিরতা বিনাশী এক
রূপক? কবি প্রলয় বসু বোধহয় এক তীরে দুই পাখি বধ
করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত (২০২৬, কোলকাতা বইমেলা) কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'আবার ছন্দপথিক' এ কবি তার সাক্ষর রেখেছেন। 'কালবৈশাখী' এবং 'প্রলয়ের রাত' কবিতা দুটিতে
ঝড়ের প্রলয়ঙ্করী রূপ কে তিনি যেমন দহনমুক্তির একান্ত কারক হিসেবে বন্দনা করেছেন, তেমনি 'উড়ে যায়
বুঝি জীবনের সকল কপাট' লাইনে ঝড়কে জীবনের গতিরোধ কারী সকল বদ্ধ শৃঙ্খল ভঙ্গের কারিগর হিসেবেও প্রতীত করেছেন।
কবি প্রলয় বসুর কবিতায় আধুনিক রচনার সমস্ত ব্যঞ্জনা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও
কখনো তা দুর্বোধ্যতার আড়ালে অন্তরীণ মনে হয়নি। বরং ছন্দের জাদু ছড়ানোয় তাঁর
উৎসাহ এবং আস্থা উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। ছন্দপথিক নাম সে কথার প্রমাণ।
প্রসঙ্গত 'ছন্দপথিক' নামে ২০২৫
সালে কবির আর একটি কাব্যগ্রন্থ বেরোয়, 'আবার ছন্দপথিক' সেটার
সিকোয়েল বলা যেতে পারে।
ছন্দের গুরুত্ব বোঝাতে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'জীবন স্মৃতি'তে লিখেছিলেন, "কবিতার মধ্যে
মিল জিনিসটার এত প্রয়োজন কেন? মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না
- তাহার বক্তব্য যখন ফুরায় তখনো তার ঝংকারটা ফুরায় না।"
কিন্তু সেই ছন্দ নির্মাণে বিন্দুমাত্র অপটুতাও কাব্যপ্রসাদ উপভোগে অনভীষ্ট ছন্দপতন ঘটাতে পারে।
এই বিষয়ে কবি প্রলয় বসু তাঁর নিজের মতামত অত্যন্ত নিখুঁত ছন্দে ব্যক্ত
করেছেন, 'বিজ্ঞাপন' নামক কবিতায়।
কাব্যগ্রন্থের প্রথমেই মুদ্রিত এই কবিতা, বর্তমান
সময়ের যেসব তথাকথিত কবি, যাদেরকে তিনি 'কালাপাহাড়ি
কৃত্তিবাসী' বলে অভিহিত করেছেন, তাঁদেরকে
নিয়ে লেখা। 'বদ্যিপিসির পদ্যি' লেখা কবিদের
শুধু কটাক্ষ হেনেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তাঁদের
উদ্দেশ্য দিয়েছেন কবিতা ও ছন্দ নির্মানের কুশলী পরামর্শও।
"অক্ষর আর স্বরবৃত্ত/ মাত্রাবৃত্ত মেনে/
শব্দবন্ধ রত্নে ভর/কাব্যবিধি জেনে।"
ছন্দ প্রনয়নে কবি যেমন শব্দের পাঠ্য রূপের কথা খেয়াল রেখেছেন, তার ধ্বনি
রূপের দিকটাও গুরুত্ব দিয়ে বিচার করছেন। যার ফলে কবিতার ভাবের সঙ্গে শব্দ ও
শব্দের ব্যবহার তথা ছন্দের প্রকরণ মিলে এক অদ্ভুত মূর্ছনার আবহ তৈরি করেছে বিভিন্ন
কবিতায়। "রঙ তুবড়ির/ ছুট ফোয়ারা/বন্ধ দুয়ার খোল/দখিনা বাতাসে/ আবিরে
গুলালে/ বর্ণিল পাল তোল-" ( কবিতা - দে দোল দোল)
বিশেষ করে, প্রকৃতির রূপ প্রকাশে নিসর্গ প্রেমিক কবি যেন
মুগ্ধতার নতুন পরিভাষা তৈরি করেছেন। অপরূপ চিত্রকল্প গুলো তাই পাঠকের স্মৃতি থেকে
সহজে মুছে যায় না।
"আকাশ যেথায় জোনাক ছড়ায়/ঝিনুক মুক্তা বাঁধে,/নৌকা ভাসায়
আদুল ছেলে/ হাল ভাঙা পাল কাঁধে।" ( কবিতা - সুবর্ণরেখা তীরে)
তবে কবিতা গুলির সঙ্গে কিছু অলংকরণ থাকলে তা আরোও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতো। অবশ্যই
প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে ঋতপ্রভ বসু (কবি পুত্র), যাকে কবি এই
কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন, তারিফযোগ্য কাজ করেছেন।
পরিশেষে, বইয়ের সমস্ত কবিতাকে যদি এক সূত্রে বেঁধে
দেখা যায়, তবে এটা একটা জার্নির মতো লাগে। যেখানে কবি
তাঁর পাঠকের সঙ্গে শুধু প্রকৃতি নয়, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি তথা
বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাঁর নিজস্ব বিবৃতি দিতে দিতে এগিয়ে চলেন। একে
একটি সাক্ষাৎকার সফরও বলা চলে।
শেষে যে বিষয়টির কথা বলতেই হয়, বইটির
মুদ্রণের গুণমান বেশ ভালো, মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েনি বললেই চলে।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন