সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রলয় বসুর কাব্যগ্রন্থঃ পর্যালোচনা লিখলেন দেবাশিস জানা।

বাড়ির বাইরে গুচ্ছের হোগলা গাছ, তাতে লাঠির মতো, হলুদ হলুদ ফুল রেণু মাখা মঞ্জরী দন্ড গজিয়ে ওঠা শুরু হয়েছে বেশ। বিকেলে চৈত্রের নির্মেঘ আকাশ কেমন যেন নিস্পন্দ, নিথর; দিনভর তপ্ত রবির তেজে ঝলসানো ও ম্রিয়মাণ! শীতল ঝড়ের ছন্দ বুঝি কোন্ আড়ালে বসে প্রহর গুণছে মুক্তির অপেক্ষায়।

এমত সমযে তাই প্রলয়ের অন্তর কথা স্পষ্ট হয় মনের পর্দায়। "গোমড়া মুখের আকাশ/ চাইছে আমায় বড় একান্ত।"


কবি প্রলয় বসু।

প্রলয়ের 'মধুক্ষরণ' রূপ কী শুধুই প্রকৃতির ক্লেশ নাশিনী, নাকি জাগতিক জীর্ণতার স্থবিরতা বিনাশী এক রূপক? কবি প্রলয় বসু বোধহয় এক তীরে দুই পাখি বধ করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত (২০২৬, কোলকাতা বইমেলা) কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'আবার ছন্দপথিক' এ কবি তার সাক্ষর রেখেছেন। 'কালবৈশাখী' এবং 'প্রলয়ের রাত' কবিতা দুটিতে ঝড়ের প্রলয়ঙ্করী রূপ কে তিনি যেমন দহনমুক্তির একান্ত কারক হিসেবে বন্দনা করেছেন, তেমনি 'উড়ে যায় বুঝি জীবনের সকল কপাট' লাইনে ঝড়কে জীবনের গতিরোধ কারী সকল নষ্ট শৃঙ্খল ভঙ্গের কারিগর হিসেবেও প্রতীত করেছেন।

কবি প্রলয় বসুর কবিতায় আধুনিক রচনার সমস্ত ব্যঞ্জনা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কখনো তা দুর্বোধ্যতার আড়ালে অন্তরীণ মনে হয়নি। বরং ছন্দের জাদু ছড়ানোয় তাঁর উৎসাহ সর্বাত্মক মনে হয়েছে। ছন্দপথিক নাম সে কথারই প্রমাণ। প্রসঙ্গত 'ছন্দপথিক' নামে ২০২৫ সালে কবির আর একটি কাব্যগ্রন্থ বেরোয়, 'আবার ছন্দপথিক' সেটার সিকোয়েল বলা যেতে পারে।


কবি প্রলয় বসুর লেখা চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'আবার ছন্দপথিক' এর প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা। 

ছন্দের গুরুত্ব বোঝাতে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'জীবন স্মৃতি'তে লিখেছিলেন, "কবিতার মধ্যে মিল জিনিসটার এত প্রয়োজন কেন? মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না - তাহার বক্তব্য যখন ফুরায় তখনো তার ঝংকারটা ফুরায় না।"

আবার সেই ছন্দ নির্মাণে বিন্দুমাত্র অপটুতাও কাব্যপ্রসাদ উপভোগে  অনভীষ্ট ছন্দপতন ঘটাতে পারে।

এই বিষয়ে কবি প্রলয় বসু তাঁর নিজের মতামত অত্যন্ত নিখুঁত ছন্দে ব্যক্ত করেছেন, 'বিজ্ঞাপন' নামক কবিতায়। কাব্যগ্রন্থের প্রথমেই মুদ্রিত এই কবিতা, বর্তমান সময়ের যেসব তথাকথিত কবি, যাদেরকে তিনি 'কালাপাহাড়ি কৃত্তিবাসী' বলে অভিহিত করেছেন, তাঁদেরকে নিয়ে লেখা। 'বদ্যিপিসির পদ্যি' লেখা কবিদের শুধু কটাক্ষ হেনেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তাঁদের উদ্দেশ্য দিয়েছেন কবিতা ও ছন্দ নির্মানের কুশলী পরামর্শও।

"অক্ষর আর স্বরবৃত্ত/ মাত্রাবৃত্ত মেনে/ শব্দবন্ধ রত্নে ভর/কাব্যবিধি জেনে।"

ছন্দ প্রনয়নে কবি যেমন শব্দের পাঠ্য রূপের কথা খেয়াল রেখেছেন, তার ধ্বনি রূপের দিকটাও গুরুত্ব দিয়ে বিচার করছেন। যার ফলে কবিতার ভাবের সঙ্গে শব্দ ও শব্দের ব্যবহার তথা ছন্দের প্রকরণ মিলে এক অদ্ভুত মূর্ছনার আবহ তৈরি করেছে তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। "রঙ তুবড়ির/ ছুট ফোয়ারা/বন্ধ দুয়ার খোল/দখিনা বাতাসে/ আবিরে গুলালে/ বর্ণিল পাল তোল-" ( কবিতা - দে দোল দোল)

বিশেষ করে, প্রকৃতির রূপ প্রকাশে নিসর্গ প্রেমিক কবি যেন মুগ্ধতার নতুন পরিভাষা তৈরি করেছেন। অপরূপ চিত্রকল্প গুলো তাই পাঠকের স্মৃতি থেকে সহজে মুছে যায় না।

"আকাশ যেথায় জোনাক ছড়ায়/ঝিনুক মুক্তা বাঁধে,/নৌকা ভাসায় আদুল ছেলে/ হাল ভাঙা পাল কাঁধে।" ( কবিতা - সুবর্ণরেখা তীরে)

তবে কবিতা গুলির সঙ্গে কিছু অলংকরণ থাকলে তা আরোও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতো। অবশ্যই প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে ঋতপ্রভ বসু (কবি পুত্র), যাকে কবি এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন, তারিফযোগ্য কাজ করেছেন।

পরিশেষে, বইয়ের সমস্ত কবিতাকে যদি এক সূত্রে বেঁধে দেখা যায়, তবে এটা একটা জার্নির মতো লাগে। যেখানে কবি তাঁর পাঠকের সঙ্গে শুধু প্রকৃতি নয়, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি তথা বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাঁর নিজস্ব বিবৃতি দিতে দিতে এগিয়ে চলেন। একে একটি সাক্ষাৎকার সফরও বলা চলে।

শেষে যে বিষয়টির কথা বলতেই হয়, বইটির মুদ্রণের গুণমান বেশ ভালো, মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েনি বললেই চলে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট, কোথায় ছিলেন গান্ধীজী?

১৫০/বি বেলেঘাটা মেন রোড। শিয়ালদহ স্টেশন ও ই-এম বাইপাস এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম মূল রাস্তা - বেলেঘাটা মেন রোড তথা সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রোডের ওপর পড়া এই বিশেষ ঠিকানাটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করছে । বিশেষ করে, প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় আসন্ন হলে, এই ঠিকানার কথা স্মরণ না করে থাকা যা য় না। কারণ ১৯৪৭ এ গোটা দেশ যখন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, বিশেষ করে রাজধানী দিল্লিতে স্বাধীনতা লাভের (১৫ ই আগস্ট) দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে আয়োজিত হয়েছে অভূতপূর্ব রাজকীয় সমারোহের - যার শুভ সূচনা হয়েছে, ১৪ ই আগস্টের মধ্যরাতে অর্থাৎ রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে  ১৫ তারিখ পদার্পণ করতেই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে শুভারম্ভ হয়েছে স্বাধীনতা দিবস পালনের মহা নির্ঘণ্ট। এই উচ্ছ্বাস যদিও কাঙ্ক্ষিতই ছিল। কারণ দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরেই দেশবাসীর কাছে এসে পৌঁছেছিল সে বিরল মাহেন্দ্রক্ষণ। সমাগত হয়েছিল সেই মহা মুহূর্ত যখন প্রায় শতবর্ষ ধরে চলা স্বাধীনতাকামী মহাযজ্ঞে মুক্তিলাভের সিদ্ধি স্প...