এখন মাস্টারস্ট্রোকের বড় চল হয়েছে বাজারে, তবে এই মাস্টারস্ট্রোক কিন্ত মাস্টারমশাইয়ের কথিত বেত্রাঘাত
বা চপেটাঘাত নয়। আবার
অভিধানে অন্তর্ভুক্তির সময়ে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হতো, চিত্রশিল্পীর সুদূর-প্রভাবী তুলির টান
বোঝাতে,
সে অর্থেও
নয়। কারণ বর্তমানে এর অর্থগত অনেক প্রসারণ ঘটেছে, তবে আক্ষরিক বিচারে শব্দবন্ধটি যে দুটি
শব্দের মিশ্রণে গঠিত সেই মাস্টার এবং স্ট্রোক শব্দ দুটি সম্প্রতি তাদের নিজ নিজ
শব্দগত অর্থের গুরুত্ব বোঝাতে ভীষণ তৎপর হয়ে উঠেছে। অন্তত আমাদের দেশে। যেখানে এই
স্ট্রোক বা ঘা হলো নিরীহ ভৃত্যদের ওপর তাদের প্রভু বা মনিবের মার। আবার এটা এমন মার যে ভৃত্যরাও
খুশি না হয়ে থাকতে পারে না; দুহাত তুলে ধেই ধেই করে নৃত্য করতে করতে
চারিদিকে মনিবের জয়গান গেয়ে বেড়ায়। চায়ের ঠেক থেকে স্কুলের কমন রুম - আহা এমন
মাস্টারস্ট্রোক,
সত্যিই
কোনো জবাব নেই!
দীর্ঘ ঔপনিবেশতন্ত্রের অধীনে থাকার যে মোসাহেবী অর্জন তা স্বাধীনতার ৭৫ বছর
পরেও একদম ক্ষয়িষ্ণু হয়নি। বরং নিপাট ভৃত্যের মতো নতুন নতুন মনিবের খোঁজ
পাওয়াটাই তার কাছে একমাত্র অভিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিন্তাবিদ দার্শনিকেরা এটা বুঝেই
প্রজাদের হাতে রাজা নির্বাচন করার বা প্রকারান্তরে রাজা হওয়ার ভার সঁপে
দিয়েছিলেন,
কিন্তু
দীর্ঘ খোশামুদে থাকার অভ্যাস যায় কোথায়! তাই তথাকথিত রাজা বা রাজন্যবর্গের
জায়গায় রাজনৈতিক প্রভুদেরকেই এখন তাদের অবিসংবাদিত মনিব মেনে নিয়েছে সর্বদা মাই
বাপ করা লক্ষ লক্ষ মাথা নামানো জনগণ।
ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি তে নাভিশ্বাস লাগছে? সঞ্চয় খালি হতে হতে একেবারে শূণ্যে পৌঁছে
যাচ্ছে?
কর্মসংস্থান
নেই?
থাকলেও
তাতে কোনো নিরাপত্তা নেই ?
টাকার দাম
কমছে?
পেট্রোল
ডিজেল রান্নার গ্যাস মহার্ঘ হচ্ছে? শিক্ষা, স্বাস্থ্য বেসরকারি হয়ে গিয়ে সাধারণের ধরা
ছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে?
হতদরিদ্র
মানুষ আরোও দরিদ্র হয়ে পড়ছে?
তাতে কি?
জিডিপি
বাড়ছে না! দেখেননি,
যে
রাস্তায় কাজ শুরু হয় সেখানে প্রথমে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়, কিন্তু একবার কমপ্লিট হয়ে গেলে
কিভাবে সব বাবু বিবিরা হুস হাস করে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলে যান, দেখেননি! শুনুন মশাই, এটা হলো একটা বড় মাস্টারস্ট্রোক, বিশ্বের তৃতীয় বিত্তশালী দেশ হতে
গেলে এইটুকু তো কষ্ট সহ্য করতেই হবে। তাই ভুলভাল ভাবনা ছেড়ে তারস্বরে জয়ধ্বনি
দিন,
বেসুরো
হয়ে লাভ নেই!
এটা যেন অনেকটা সেই বাজ পড়া নারকেল গাছের মতো, যাকে তার সর্বস্ব খুইয়েও বলতে হয় সত্যিই
এটা ইন্দ্রদেবের বড় মাস্টারস্ট্রোক ছিল।
আসলে রহস্যটা গোলামী মানসিকতার মধ্যে নিহিত, যাকে মনে মনে মনিব মানি সে কখনো ভুল চাল দিতেই
পারে না,
মনিবের সব
চালই তাই মাস্টারস্ট্রোক হয় , এক কিস্তিতে বাজিমাত!
প্রসঙ্গত অধীনস্থভাবের এই বৈশিষ্ট্যের কথা অতীতের নারদ মুনি যেমন জানতেন, বর্তমানের সাংবাদ গোষ্ঠীর কাছেও
তা অজ্ঞাত নয়,
প্রধানত
তাঁরাই এই মাস্টারস্ট্রোক স্টোরিটিকে সর্বপ্রথম উজাগর করেন সর্ব সমক্ষে, ব্যাস্ জনগন আর যায় কোথায়! কারণ
তাদের কাছে কোনো কিছুর আকাশবাণী হওয়া মানে তা সিধা প্রভুর আদেশ, তাই অমান্য করে কার সাধ্যি! যথারীতি তাই মালিকের
মাস্টারস্ট্রোক গাঁথা গীত হয়ে ওঠে চারিধারে।
এ যেন সেই ব্যক্তি,
যে
অত্যাচারীর বুটের নীচে পিষে যেতে যেতেও অবলীলায় বলে চলেন, আসলে এই লাঞ্ছনার আড়ালেও তার
মালিকের মাস্টারস্ট্রোক রয়েছে। নাহলে অত গুরুত্ব দিয়ে কেনই বা তাকে এই
অত্যাচারের যোগ্য বলে বিবেচিত করতেন!
অনেক বছর আগে,
প্রয়াত
অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র The
Telegraph পত্রিকায়
একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন,
যতদূর মনে
পড়ছে তাতে তিনি দুজন চাষীর গল্প করেছিলেন, যাদেরকে জমিদার সময়মতো খাজনা না দেওয়ার
অপরাধে বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা ক্রমাগত বেতের ঘায়ে যখন তাদের শরীর
রক্তাক্ত হয়ে পড়ছিল,
তখনও একজন
আরেকজনের কাছে কাঁপা কাঁপা গলায় সেই বেত্রাঘাতকারীর কত গায়ের জোর সেটা নিয়ে
শ্লাঘা প্রকাশ করছিল কারণ সেই লোকটির বাড়ি আর তার বাড়ি একই গ্রামে।
এ ক্ষেত্রেও সেই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি; তাতে সে মাস্টারের স্ট্রোক যতই কঠিন বা যতই স্বার্থবিরোধী হোক না কেন, ভৃত্য জানে মাস্টার লোকটি অত বড় সেলেব্রিটি হওয়া সত্ত্বেও তাকে বঞ্চিত করার কথা অন্তত ভোলেনি। কম প্রাপ্তি তো নয় এটা। কি বলেন!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন