সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ম্যাজিক ফিগার!

ম্যাজিক ফিগার কথাটির মধ্যে কিন্তু কোনো জাদু টাদু কিছু নেই বরং বেশ একটা আত্মম্ভরিতার ব্যাপার আছে। সেটা হোল পারিস যদি একবার ছুঁয়ে দেখা। পারলে ঠিক আছে,  ছেয়ে যাবি; নইলে সিধা রসাতলে পৌঁছে যাবি।
বাঙালি যখন ফিগার কথাটা বলে তখন তা কোনো সুন্দর দেহ সৌষ্ঠবের কথা ভেবেই বলে, সেখানে সেই ফিগার আবার যদি ম্যাজিক ফিগার হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই, পুরো – 'ঝুমকা গিরা রে, বারেলি কি বাজার মে’ টাইপ মওকা। একবার প্রচেষ্টার পারা নিজেদের অনুকূলে তুলতে পারলেই, ছোঁ মন্তর পাঁচ বচ্ছর। বাকি কাণ্ড কিস্কিন্দা কাণ্ড। 
তাই ম্যাজিক ফিগার শুধুমাত্র এক কাষ্ঠবৎ সংখ্যা মাত্রই নয়; একটি অবদমিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যাকে বিশেষায়িত করতেই জাদু কথাটির সংযোজোন করতে হয়েছে। অনেকটা ঢ্যাঙ্গা কদম গাছের মাথায় জড়িয়ে যাওয়া কাটা ঘুড়ির মত ঝুলে থাকে ম্যাজিক ফিগার, নীচে আমটি আমি খাব পেড়ের মতন আকুল অভিলাষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দেঁতো দাঁতালের দল, কিছু মূঢ় মুনিষের কাঁধ পেলেই তাতে ভর করে শুরু হয়ে যায় সেই জাদু সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলার লড়াই। 

আবার শুধু ছুঁয়ে দেওয়াতেই তো আর মন ভরে না; পাড়ায়, রকে, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ইউ টিউবের পর্দায় সর্বত্র চলে সে তুঙ্গ চুম্বন প্রাপ্তির সম্ভাব্য ভাগ্যবানকে নিয়ে নানা জাবর কাটা জল্পনা।  অঙ্কে ফেল করা ফেলুদাও দিব্যি চায়ের আসরে বসে নানা জটিল অঙ্কের ফরফুলা আওড়ান। তাঁর মতে ভোটের অঙ্কে নাকি সবই সম্ভব। ও সব কেশব নাগ মার্কা গণিতজ্ঞদের কাজ নয় এই হিসেব মিলিয়ে দেওয়া। তাহলে কী হবে, হ্যাঁ এই প্রশ্নটাই কৃষ্ণ ভ্রমরের মত চারিদিকে ভনভন করে ঘুরে বেড়ায়। আর মাঝখান থেকে উত্তরের নামে ভবিষ্যৎবক্তা টিয়াপাখিদের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।  আগেরবার তো দাদা মিলিয়ে দিয়েছিলেন, প্রশ্নটা শুনলেই ফেলুদার সটান কেশর গজিয়ে যায়। কুঞ্চিত কপালে তখন কিঞ্চিৎ ভাঁজ বাড়িয়ে ফেলুদা তাঁর দুই ঠোঁটের ওপর অত্যন্ত  নির্দয় ভাবে তর্জনীর চাবুক চালাতে থাকেন।   যেন কোনো রহস্য উদ্ঘাটনের প্রাক মুহূর্তে এসে পৌঁছেছেন তিনি।  প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য নির্মাণের কৌশলে খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে অকুস্থলে উপস্থিত সকলকে আরও উৎকর্ণ করে ফেলার অভ্যাস তাঁর বহু পুরনো। আসলে এত আগ্রহ ম্যাজিক সংখ্যাকে নিয়ে নয়, কারণ সেটি স্বয়ম্বর সভার যুবরানীর মতই পূর্ব নির্ধারিত। যেমন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ক্ষেত্রে সর্বমোট ২৯৪ টি আসন, এর অর্ধেক অর্থাৎ ১৪৭ এর সঙ্গে  ১ যোগ করলেই দাঁড়িয়ে যায় ম্যাজিক ফিগার, ১৪৮। আসল লড়াইটা হয় এই ম্যাজিক সংখ্যার দখল নিয়েই।। ম্যাজিক ফিগার লাভের ক্ষেত্রে লড়াই আর লড়াইয়ের  ফল বেরনোর মাঝখানে একটি ভারী মজাদার উপত্যকা রয়েছে যেখানে সব কটা যুযুধান পক্ষই যখন যুদ্ধ শেষে ক্লান্তির ঘাম জুড়োতে ব্যস্ত থাকেন বাকিরা তখন ফল কী হতে পারে তাই নিয়ে চর্চার চাচাকিরি চালিয়ে যান। প্রশ্ন একটাই কে তাকে আগে করিবেক জয় এই নিয়ে চলে যাবতীয় হল্লাবাজি।
আর এই ম্যাজিক সংখ্যার পূর্বাভাস বলে কথা। নিষিদ্ধ বইয়ের মত মলাট উন্মোচনের আগেই কিঞ্চিৎ কন্টেন্ট জানার আগ্রহ কার না থাকে। তাই এমন রূপকথার  তৈরি করে।
বিন্দু মাত্র রহস্য মুক্তির কথাও তাই রূপকথার আবহ তৈরি করে ফেলে। 

মায়া বর্ণন এমনভাবেই রূপকথা রচনা করে চলে প্রাক সম্ভোগ শৃঙ্গারের মতন।  
নাকি সবই সম্ভভ   রীতিমত শাশুড়ি ননদ সুলভ গুজগুজ ফুসফুস।

নাটকের শেষ ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছানোর মহড়া।  

 

প্রাপ্তির নেশায় বুঁদ হয়ে ঘাম রক্ত এক করে দেন যারা তারা  পাড়ার নন্তু ঘন্তুরা প্রাণপণে ছোটে গাছ থেকে নামিয়ে কে আগে ছোঁবে সে ম্যাজিক নাম্বার তাই নিয়ে তাতিয়ে তোলে সারা পরিবেশ।    

ম্যাজিক ফিগার  পণ্ডিতরা যতই কাষ্ঠবৎ একটা সংখ্যাকেই   

ম্যাজিকটা আসলে ফিগারের না ফিগারটা ম্যাজিকের।  অনেকটা দড়ি টানাটানি খেলার বুড়ির মত, যুযুধান দু পক্ষই তাকে নিজেদের ঝোলে আনার জন্যে যাকে বলে একেবারে ঘাম রক্ত এক করে ফেলে।     আসলে এই টানাটানির মূলে যতটা না ম্যাজিক দায়ী তার  থেকে বেশী দায়ী ফিগার। কারণ  সে যতই মেরুকরণ হয়ে যাক না কেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...