পত্রালোকে স্বামীজীর দ্বিতীয় পর্বে স্বামীজীর এক গভীর দিব্য বিশ্বাসের প্রসঙ্গ উঠে আসে যেটি বেশ আকর্ষণীয়। কারণ তা প্রচলিত যুগ ধারনায় শুধু যে অভিনব ভাবনার উন্মেষ ঘটায় তাই নয়, জন্ম দেয় নতুন বিস্ময়ের। গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দের উদ্দেশ্যে যে পঞ্চদশ দফার উপদেশাবলী জারি করেন তিনি এই চিঠিতে তারই একটি অংশ হিসেবে সেটাকে তিনি পেশ করেন। সেই হিসেবে ৭ নং পয়েন্টে তাঁর বিধৃত ভাষ্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলাই বাহুল্য, স্বামীজী তাঁর আধ্যাত্ম জ্ঞানের একটি গভীর দর্শনের কথা তুলে ধরেছেন সেখানে এবং সেটি নিয়ে তাঁর মনে যে কোনরূপ কোনো সন্দেহ নেই সেই বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “রামকৃষ্ণাবতারের জন্মদিন হইতেই সত্যযুগোৎপত্তি হইয়াছে”। অর্থাৎ শ্রীশ্রী ঠাকুরের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সত্যযুগের সূচনা হয়ে গিয়েছে। উল্লেখ্য তাঁর বলার ধরনে কোনরকমের কোনো সংশয় প্রকাশ পায়নি। বরং তাতে তাঁর বাকশক্তির স্বভাবসিদ্ধ সত্যতা ও ওজস্বিতা ফুটে বেরিয়েছে। প্রসঙ্গত স্বামীজী যে সত্যযুগের সুচনার কথা বলছেন আদতে সেটি একটি ভেদাভেদ হীন সমাজ গঠনের শুরুয়াত যা ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের আগমন পর্বের সঙ্গে সূচিত হয়েছে বলে তাঁর অভিমত। উক্ত চিঠিতেই অবশ্য তিনি এই বিষয়ে বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এই নিয়ে যাবতীয় ধন্দ নিরসন করার চেষ্টা করেছেন। সেখানে তিনি লিখছেন, “ঠাকুর যেদিন থেকে জন্মেছেন, সব ভেদাভেদ উঠে গেল। ব্রাহ্মণ- চণ্ডাল ভেদ, ধনি- নির্ধনের ভেদ, হিন্দু মুসলমান ভেদ, খ্রিস্টান হিন্দু ভেদ সব চলে গেল। ঐ যে ভেদাভেদে লড়াই ছিল তা অন্য যুগের, এই সত্যযুগে তাঁর প্রেমের বন্যায় সব একাকার”।
কিন্তু এ তো গেল ধান ভাঙার কথা, ধান ভাঙতে গিয়ে কী চিঠিতে একদমই শিবের গাজন করেননি স্বামীজী? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ করেছিলেন। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গিয়ে অন্য অনেক প্রসঙ্গ এসেছে তাঁর ভাবনায় এবং সে সব নিয়েও বেশ কিছু কৌতূহলোদ্দীপক কথা তিনি লিখেছিলেন সেই চিঠিতে, যেগুলির অবতারণাও ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। যেমন তিনি জানতে চেয়েছিলেন বিখ্যাত জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ফ্রেডরিখ ম্যাক্সমুলার যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তার কোনো সদুত্তর তাঁকে দেওয়া হয়েছে কিনা, তেমনি নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক তাঁকে যীশুখ্রিস্টের সঙ্গে তুলনা করাটা যে তাঁর মোটেই না-পসন্দ তাই নিয়েও বলতে কোনো দ্বিধা করেননি। বলেছেন, “ওসব আমাদের দেশে ভালো বটে, কিন্তু এদেশে ছাপাইয়া পাঠাইলে আমার অপমানের সম্ভাবনা”। জনৈক হাডসন নামের মার্কিন নাগরিকের নাম এসেছে তাঁর লেখায়, যার কথিত বিরোধিতাকে যে তিনি খুব বেশী আমল দিতে নারাজ সেটও কোনো রাখঢাক না করেই চিঠিতে লিখে জানিয়েছেন গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে। “তুমি উন্মাদ না কি?” “হাডসন নামক কে কি বকিয়াছে, প্রথমত তাহাকে আমার জবাব দিবার কোন আবশ্যক নাই। দ্বিতীয়ত তাহা হইলে হাডসন প্রভৃতি ফেরঙ্গদের সমদেশবরত্তী হইব আমি।“ আমেরিকায় থাকাকালীন স্বামীজী যে খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছ থেকে প্রভূত শত্রুতা সহ্য করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে তাঁদেরকে হার মানতেও বাধ্য করেছিলেন তা তিনি অকপটে জানিয়েছেন গুরুভাই শশী মহারাজকে। “মিশনারি প্রভৃতিরা বহু চেষ্টা করিয়া এক্ষণে হার মানিয়া শান্তি অবলম্বন করিয়াছে”। এ ক্ষেত্রে যে তার লড়াইয়ের হাতিয়ার ছিল একমাত্র তাঁর শান্ত স্বভাব এবং স্থিতধী ভাব তা কিন্তু জানাতে ভোলেননি। “সকল কার্যই নানা বিঘ্নের মধ্যে সমাধান হয়। শান্তভাব অবলম্বন করিলেই সত্যের জয় হয়”।এই সব ভারী বিষয় ছাড়াও চিঠিতে একটি বেশ দারুন ব্যাপারে জ্ঞাত হওয়া যায়, সেসময় আমেরিকা থেকে একটি পত্র ভারতে আসতে কিংবা ভারত থেকে আমেরিকা যেতে কমবেশি দেড় মাস সময় লাগতো। প্রসঙ্গটি বিশেষ করে ওঠে যখন স্বামীজী রামকৃষ্ণানন্দের উদ্দেশ্যে অনুযোগের সুরে লেখেন, “কাহাকে টাকা পাঠাইতে হইবে তুমি চিঠিতে কিছু লিখ নাই”। পরের বাক্যেই আবার তখনকার দিনে পত্র পত্রাদির গমনাগমনের চরম বাস্তবাতার কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি লেখেন, “প্রায় দেড় মাসে একখানা পত্র আসে, একটা ভুল শুধরাইতে তিন মাস সময় লাগে”। বিশেষ করে ভারতের ঠিক উল্টো গোলার্ধে অবস্থান করা আমেরিকাতে চিঠি পত্র পৌঁছানোর সময় যে একটু বেশীই লাগবে সে ব্যাপারেই তাঁকে অবগত করিয়ে রাখেন, যাতে দরকারি কথা ভবিষ্যতে মিস না করে যান।
উল্লেখ্য চিঠিতে যে টাকা পাঠানোর কথা স্বামীজী বারেবারে উল্লেখ করেছেন, সেটি আসলে মঠ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ভূমিস্থল কেনার টাকা। কারণ তখনো আলমবাজারের এক ভাড়া বাড়িতেই ছিল মঠের অস্থায়ী ঠিকানা। তারও আগে বরাহনগরের এক পোড়ো বাগানবাড়ি থেকে পরিচালিত হত আশ্রমের কাজকর্ম। স্বামীজী তাঁর দীর্ঘ চার বছরের(১৮৯৩ – ১৮৯৬) আমেরিকা প্রবাস কালে প্রায়শই চিঠি লিখে জমি কেনার ব্যাপারে গুরুভাইদের তাগাদা দিয়েছেন; আলোচ্য চিঠিটিতে তিনি এর জন্যে প্রয়োজনীয় টাকা পাঠাতে চেয়ে এতটাই উদগ্রীব যে বলছেন, “যদি তুমি কাহাকে টাকা পাঠাই লিখিতে, তাহা হইলে আজই আমি টাকা পাঠাইতাম”। সাথে এও বলে দিচ্ছেন, “টাকা পাঠাইবামাত্রই জমি খরিদ করিবে”। মনে রাখতে হবে মঠের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বেলুড় স্থিত গঙ্গা পাড়ের যে ২২ বিঘা জমি কেনা হয়েছিল সেটা ছিল এই চিঠি লেখার প্রায় তিন বছর পরে, ১৮৯৮ এর ৪ ঠা মার্চ তারিখে; জনৈক বিহারের বাসিন্দা ভগৎনারায়ণ সিং এর কাছ থেকে এই জায়গাটি সেদিন ক্রয় করা হয়। প্রসঙ্গত কোলকাতা থেকে তথাকথিত দুরের এই জায়গাটিকে বাছা নিয়ে বিবেকানন্দের কিন্তু কোনো অসম্মতি ছিল না। শশী মহারাজকে লেখা এই চিঠিতেই তিনি এই নিয়ে তাঁর অভিমত স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। “কলিকাতা হইতে কিছু দূরে হয়, চিন্তা নাই। যেখানে আমরা মঠ বানাইব, সেথায় ধুম মাচিবে”।
পরবর্তী পর্ব, ক্রমশ...!
প্রথম পর্ব পড়তে নীচে ক্লিক করুনঃ
পত্রালোকে স্বামীজীর অন্য দিক! পর্ব -১

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন