স্বামী বিবেকানন্দের অনেক উক্তি যা কালের কষ্টি পাথরে প্রায় প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে, সেরকম মুখে মুখে ফেরা স্বামীজীর কিছু সর্বজন গ্রাহ্য বানীর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি বাণী হোল – চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না। যথার্থতা ও প্রামান্যতার প্রশ্নে আজও যাদের মান্যতা নিয়ে কোনরকমের কোনো তর্ক নেই জনমানসে। প্রসঙ্গত বিবেকানন্দ এই কথাটি গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে লেখা একটি চিঠিতে সর্বপ্রথম লেখেন। কোনো সভা বা সেমিনারে বক্তৃতা দেওয়ার সময় করা উক্তি নয় এটি। কিংবা কোনো প্রবন্ধের অনুচ্ছেদ অলঙ্কৃত করতেও এমনটা লিখেছিলেন বলে জানা যায় না। উল্লেখ্য স্বামীজী আমেরিকা থেকে চিঠিটি লেখেন ১৮৯৫ সালে, জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে।
আজকের নিবন্ধে, উক্ত চিঠির আলোকে স্বামীজীর চরিত্রের কোনো অপরিচিত দিক ফুটে উঠল কিনা মুলত তাকে কেন্দ্র করেই জারি থাকবে সমগ্র অন্বেষণ। পত্রদাতা স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে প্রাপক রামকৃষ্ণানন্দ মহারাজ সহ আরও অন্য যে সকল ব্যক্তির নাম স্বামীজী ওই চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়নটিও একই সাথে বোঝার চেষ্টা করবো। অনুল্লেখিত থাকবে না সেসময়কার সমাজ এবং পরিবেশের কথাও।
চিঠিতে সাধারণত পত্রদাতাকে তাঁর পোশাকি আবরণের আড়াল মুক্ত হয়ে নিজস্ব অন্তরঙ্গতার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। সেই হিসেবে, স্বামী বিবেকানন্দের মতন জগৎবিখ্যাত মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে দেখার গুরুত্ব অগাধ।
চিঠিতে সাধারণত পত্রদাতাকে তাঁর পোশাকি আবরণের আড়াল মুক্ত হয়ে নিজস্ব অন্তরঙ্গতার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। সেই হিসেবে, স্বামী বিবেকানন্দের মতন জগৎবিখ্যাত মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে দেখার গুরুত্ব অগাধ।
প্রসঙ্গত স্বামী
বিবেকানন্দের যে দুটি পত্র সংকলন এযাবৎ উদ্বোধন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে রয়েছে এই চিঠি। বিস্তৃত বহরের এই দ্বিতীয় সংকলনে ছোট বড় মিলিয়ে মোট পত্র স্থান পেয়েছে ২৩৯ টি। তাতে
স্বামীজীর ১৮৯৫ সাল থেকে তাঁর প্রয়াণের ২০ দিন পূর্বে অর্থাৎ ১৯০২ এর ১৪ ই জুন অবধি লেখা সমস্ত চিঠিগুলিকে
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২৩৯ টি
চিঠির মধ্যে ৬৮ টি ছিল বাংলায় লেখা, ১৬৮ টি বাংলায় অনূদিত ইংরেজি চিঠি ও তিনটি সংস্কৃত ভাষায় লেখার বঙ্গানুবাদ। এ কথা যদিও ঠিক, সংকলনের প্রত্যেকটি পত্রের মধ্যেই আলাদা আলাদা ভাবে নিবন্ধ লেখার রসদ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু তা অত্যন্ত সময় এবং পরিসর সাপেক্ষ। আপাতত সেই সম্ভাবনাকে ভবিষ্যতের খাতায় তুলে রেখে, কেবলমাত্র একটি পত্রকেই যেটি নানা কারণে ও নানা উপাদানে বর্ণময় ও চিত্তাকর্ষক সেটিকেই আজকের নিবন্ধের উপজীব্য করছি।
উল্লেখ্য নিউইয়র্ক থেকে স্বামীজী যখন এই পত্রটি লেখেন, তখন সেখানে প্রবল ঠাণ্ডা। তবে সেই ঠাণ্ডা নিবারণে যে জবরদস্ত ব্যবস্থার কথা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন তা এককথায় অভাবনীয়। আজ থেকে একশো পঁচিশ বছর আগে, নিউইয়র্ক শহরে রীতিমত মাটির নীচে বয়লার লাগিয়ে তার থেকে গরম বাষ্প বের করা হত এবং বাড়িময় তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হত। হিমাঙ্কের নীচে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যাওয়া শৈত্য প্রবাহের সঙ্গে যুঝতে এটাই ছিল তখনকার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। স্বামীজী চিঠিতে লিখছেন, “এদেশের বড় মানুষেরা অনেকেই শীতকালে ইউরোপে পালায় – ইউরোপ অপেক্ষাকৃত গরম দেশ"।
কিন্তু যেটা উল্লেখ্য, শশিভূষণের মধ্যে বিরাজিত থাকা organizing power বা সংগঠন পরিচালন দক্ষতার কথা কিন্তু তখনও কারোর কাছে জ্ঞাত ছিল না, যে কথা শ্রীশ্রীঠাকুর বিবেকানন্দকে ধ্যানে জানিয়েছিলেন। স্বামীজী চিঠিতে সেই কথার উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি চিঠিতে এও ব্যক্ত করেছেন, শীঘ্রই তা ঠাকুরের আশীর্বাদে ফুটে বেরুবে বলে। কিন্তু সেটার জন্যে স্বামীজী তাঁকে যে উপদেশাবলী অনুশীলন করার কথা বলেছিলেন তার মধ্যে যেমন আত্মভাব যুক্ত হয়ে সঠিক কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে ব্যক্তি তথা সমাজ ও জাতীয় জীবন থেকে দুঃখ ক্লেশ মুক্তির পথনির্দেশ ছিল তেমনি আধ্যাত্ম্য জ্ঞানকে অসি রূপে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে থাকা রজোগুণকে বিনষ্ট করার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন সমাজ জীবনে বিরোধিতা হীন উত্তরণের পথ অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়ার কথা। এই প্রসঙ্গে স্বামীজীর পরামর্শ ছিল, যে যেখানে আছে তাকে সেই অবস্থায় গ্রহণ করাই শ্রেয়। “কাহারও সহিত বিবাদ-বিতর্কে আবশ্যক নেই; Give your message, leave others to their own thoughts .(তোমার যাহা শিখাইবার আছে শিখাও, অপরে নিজ নিজ ভাব লইয়া থাকুক)"।
১৫ দফায় বিন্যস্ত এই উপদেশ গুচ্ছের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ১১, ১২ এবং ১৩ নম্বর দাগে তিনি জগতের কল্যানে নারী জাতির উত্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সম্পূর্ণ ধরণী যদি একটি পাখি হয় তবে নারী জাতি তার একটি ডানার মত। “এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নহে,” সংশয়াতীত ভাবে তাঁর এই বিশ্বাসের কথা তিনি চিঠিতে ব্যক্ত করেছিলেন এই মর্মে। আবার শুধু কথাতেই নয়, তিনি যে এই লক্ষে স্ত্রী-মঠ স্থাপনের উদ্যোগ নিতেও চান সেটাও চিঠিতে জানিয়েছিলেন গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে। আশা প্রকাশ করেছিলেন, “উক্ত মঠ গার্গী, মৈত্রয়ী এবং তদপেক্ষা আরও উচ্চতরভাবাপন্ন, নারীকুলের আকরস্বরূপ হইবে”। কিন্তু এই সকল মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ এবং তাকে কার্যকরী করার লক্ষে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই একজনকে আন্তরিক এবং আদ্যন্ত অকপট হওয়ার প্রয়োজন বলে তাঁর অভিমত ছিল। এই নিবন্ধের শুরুতেই বিবেকানন্দের যে প্রবাদোপম উক্তিটির কথা উল্লেখ করেছিলাম – চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না, সেই কথাটিকেই এই সুত্রে গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দের উদ্দেশ্যে উপদেশ হিসেবে প্রেরণ করতে দেখা যায় স্বামীজীকে। উপদেশ প্রদানের সেই ক্ষেত্রটি আসে ১৪ নং পয়েন্টে। যেখানে এসে স্বামীজী তাঁর গুরুভাইয়ের প্রতি তাঁর পৌরুষ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়ে লেখেন, “তৎ কুরু পৌরুষম (সুতরাং পৌরুষ প্রকাশ কর)। চালাকী দ্বারা কোনও মহৎ কার্য হয় না। প্রেম, সত্যানুরাগ ও মহাবীর্যের সহায়তায় সকল কার্য সম্পন্ন হয়”।
পরবর্তী পর্ব পড়তে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ
পত্রালোকে স্বামীজীর অন্য দিক! পর্ব - ২

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন