স্বামী বিবেকানন্দের অনেক উক্তি যা কালের কষ্টি পাথরে প্রায় প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে, সেরকম মুখে মুখে ফেরা স্বামীজীর কিছু সর্বজন গ্রাহ্য বানীর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি বাণী হোল – চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না। যথার্থতা ও প্রামান্যতার প্রশ্নে আজও যাদের মান্যতা নিয়ে কোনরকমের কোনো তর্ক নেই জনমানসে। প্রসঙ্গত বিবেকানন্দ এই কথাটি গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে লেখা একটি চিঠিতে সর্বপ্রথম লেখেন। কোনো সভা বা সেমিনারে বক্তৃতা দেওয়ার সময় করা উক্তি নয় এটি। কিংবা কোনো প্রবন্ধের অনুচ্ছেদ অলঙ্কৃত করতেও এমনটা লিখেছিলেন বলে জানা যায় না। উল্লেখ্য স্বামীজী আমেরিকা থেকে চিঠিটি লেখেন ১৮৯৫ সালে, জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে।
আজকের নিবন্ধে, উক্ত চিঠির আলোকে স্বামীজীর চরিত্রের কোনো অপরিচিত দিক ফুটে উঠল কিনা মুলত তাকে কেন্দ্র করেই জারি থাকবে সমগ্র অন্বেষণ। পত্রদাতা স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে প্রাপক রামকৃষ্ণানন্দ মহারাজ সহ আরও অন্য যে সকল ব্যক্তির নাম স্বামীজী ওই চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়নটিও একই সাথে বোঝার চেষ্টা করবো। অনুল্লেখিত থাকবে না সেসময়কার সমাজ এবং পরিবেশের কথাও।
নিউইয়র্ক থেকে স্বামীজী যখন এই পত্রটি লেখেন, তখন সেখানে প্রবল ঠাণ্ডা। তবে সেই ঠাণ্ডা নিবারণে যে জবরদস্ত ব্যবস্থার কথা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন তা এককথায় অভাবনীয়। আজ থেকে একশো পঁচিশ বছর আগে, নিউইয়র্ক শহরে রীতিমত মাটির নীচে বয়লার লাগিয়ে তার থেকে গরম বাষ্প বের করা হত এবং বাড়িময় তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হত। হিমাঙ্কের নীচে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যাওয়া শৈত্য প্রবাহের সঙ্গে যুঝতে এটাই ছিল তখনকার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। স্বামীজী চিঠিতে লিখছেন, “এদেশের বড় মানুষেরা অনেকেই শীতকালে ইউরোপে পালায় – ইউরোপ অপেক্ষাকৃত গরম দেশ।“
এইরকম প্রচণ্ড শীতের আবহেও স্বামীজী রামকৃষ্ণানন্দের উদ্দেশ্যে চিঠিটি লিখতে বসেছিলেন প্রধানত কিছু উপদেশাবলী প্রেরণ করার লক্ষে। প্রসঙ্গত সেই উপদেশাবলী ছিল ১৫ দফার; তাতে গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দের উদ্দেশ্যে কিছু অবশ্য পালনীয় বার্তা দিয়েছিলেন স্বামীজী। লিখেছিলেন, “এই উপদেশগুলি রোজ একবার করে পড়বে এবং সেই মত কাজ করবে"। এর পেছনে স্বামীজী, ঠাকুর রামকৃষ্ণর থেকে প্রাপ্ত দৈব বার্তার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কি ছিল সেই দৈব বার্তায় জানার আগে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের সম্পর্কে গুটিকয় কথা বলে নেওয়া দরকার। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ তথা শশী মহারাজ ছিলেন বয়সে স্বামীজীর থেকে মাত্র ছয় মাসের ছোট। ১৮৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে (১২ তারিখ) জন্ম হয় স্বামীজীর আর জুলাইতে (১৩ তারিখ) হয় রামকৃষ্ণানন্দ ওরফে শশিভূষণ চক্রবর্তীর। আঁটপুরে তাঁরা একই দিনে (১৮৮৬, ২৪ শে ডিসেম্বর) গুরুভাই বাবুরাম ঘোষের বাড়িতে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত স্বামীজী ও শশিভূষণ ছাড়াও তাঁদের আরও সাতজন গুরুভাই সেদিন সন্ন্যাস নেন। বিরজা হোমের পাবকানলকে সাক্ষী রেখে, নতুন নামকরণ হয় তাঁদের। কোলকাতার নরেন্দ্রনাথ দত্ত হন স্বামী বিবিদিষানন্দ আর হুগলির শশিভূষণ হন স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ; তবে শশিভূষণের এই নতুন নামপ্রাপ্তির পেছনে বিবেকানন্দের ইচ্ছা বড় কারণ ছিল বলে জানা যায়। স্বামীজী ঐকান্তিক ভাবে চেয়েছিলেন শশীর নামের সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের নামটা জুড়ে থাক। কারণ শশিভূষণ ছিলেন সার্থক অর্থে এক রামকৃষ্ণ অন্ত প্রাণ। প্রয়াণের পূর্বে (১৮৮৬, ১৬ই আগস্ট) ঠাকুরের অসুস্থ থাকাকালীন পর্বে শশিভূষণের একনিষ্ঠ সেবা প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছেছিল। খাওয়া দাওয়া ভুলে সারাক্ষণ ঠাকুরের সেবায় নিয়োজিত শশিভূষণ এমনকি বাড়ি ঘর, পড়াশোনা ছেড়ে কাশীপুর উদ্যানবাটীতেই সবসময় পড়ে থাকতেন। বাবা ঈশ্বর চন্দ্র ছেলেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু শশিভূষণ তা অগ্রাহ্য করেছেন। শশিভূষণের এই সেবাব্রত, ঠাকুরের প্রয়াণের পরেও আমৃত্যু বজায় ছিল।
কিন্তু যেটা উল্লেখ্য, শশিভূষণের মধ্যে বিরাজিত থাকা organizing power বা সংগঠন পরিচালন দক্ষতার কথা কিন্তু তখনও কারোর কাছে জ্ঞাত ছিল না, যে কথা শ্রীশ্রীঠাকুর বিবেকানন্দকে ধ্যানে জানিয়েছিলেন। স্বামীজী চিঠিতে সেই কথার উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি চিঠিতে এও ব্যক্ত করেছেন, শীঘ্রই তা ঠাকুরের আশীর্বাদে ফুটে উঠবে বলে। কিন্তু সেটার জন্যে স্বামীজী তাঁকে যে উপদেশাবলী অনুশীলন করার কথা বলেছিলেন তার মধ্যে যেমন আত্মভাব যুক্ত হয়ে সঠিক কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে ব্যক্তি তথা সমাজ ও জাতীয় জীবন থেকে দুঃখ ক্লেশ মুক্তির পথনির্দেশ ছিল তেমনি আধ্যাত্ম্য জ্ঞানকে অসি রূপে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে থাকা রজোগুণ বিনষ্ট করার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন সমাজ জীবনে বিরোধিতা হীন উত্তরণের পথ অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়ার কথা। এই প্রসঙ্গে স্বামীজীর পরামর্শ ছিল, যে যেখানে আছে তাকে সেই অবস্থায় গ্রহণ করাই শ্রেয়। “কাহারও সহিত বিবাদ-বিতর্কে আবশ্যক নেই; Give your message, leave others to their own thoughts .(তোমার যাহা শিখাইবার আছে শিখাও, অপরে নিজ নিজ ভাব লইয়া থাকুক)"।
১৫ দফায় বিন্যস্ত এই উপদেশ গুচ্ছের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ১১, ১২ এবং ১৩ নম্বর দাগে তিনি জগতের কল্যানে নারী জাতির উত্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সম্পূর্ণ ধরণী যদি একটি পাখি হয় তবে নারী জাতি তার একটি ডানার মত। “এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নহে,” সংশয়াতীত ভাবে তাঁর এই বিশ্বাসের কথা তিনি চিঠিতে ব্যক্ত করেছিলেন এই মর্মে। আবার শুধু কথাতেই নয়, তিনি যে এই লক্ষে স্ত্রী-মঠ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে চান সেটাও চিঠিতে জানিয়েছিলেন গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দকে। আশা প্রকাশ করেছিলেন, “উক্ত মঠ গার্গী, মৈত্রয়ী এবং তদপেক্ষা আরও উচ্চতরভাবাপন্ন, নারীকুলের আকরস্বরূপ হইবে”। কিন্তু এই সকল মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ এবং তাকে কার্যকরী করার লক্ষে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই একজনকে আন্তরিক এবং আদ্যন্ত অকপট হওয়ার প্রয়োজন বলে তাঁর অভিমত ছিল। এই নিবন্ধের শুরুতেই বিবেকানন্দের যে প্রবাদোপম উক্তিটির কথা উল্লেখ করেছিলাম – চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না, সেই কথাটিকেই এই সুত্রে দেখা যায় স্বামীজী তাঁর গুরুভাইয়ের উদ্দেশ্যে উপদেশ হিসেবে প্রেরণ করেন। প্রসঙ্গটি আসে ১৪ তম পয়েন্টে। যেখানে এসে স্বামীজী তাঁর গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দের প্রতি তাঁর পৌরুষ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়ে লেখেন, “তৎ কুরু পৌরুষম (সুতরাং পৌরুষ প্রকাশ কর)। চালাকী দ্বারা কোনও মহৎ কার্য হয় না। প্রেম, সত্যানুরাগ ও মহাবীর্যের সহায়তায় সকল কার্য সম্পন্ন হয়”।
পর্ব ২, ক্রমশ...!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন