সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাঁথির যোগসূত্র বহুকথিত, তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে তখনকার প্রশাসনিক ক্ষেত্র নেগুয়া অঞ্চলের ম্যাজিস্ট্রেট তথা ট্যাক্স কালেক্টর হয়ে কাঁথিতে আসেন, তারিখটি ছিল ১৮৬০ এর ২১শে জানুয়ারি। ছিলেন মাত্র ন' মাসের বেশী কিছু সময়। ২৯৩ দিনের মাথায়, ১৮৬০ এরই ৮ই নভেম্বর তারিখে তিনি কাঁথি থেকে বদলি হয়ে ফিরে যান। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর দু দুটি উপন্যাসের পটভূমি ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু চরিত্র প্রাপ্তির উৎস হিসেবে কাঁথিকে তাঁর বিপুল সাহিত্য ভান্ডারের এক চির চর্চিত স্থান হিসেবে পরিচিতি দিয়ে গেছেন। অবশ্যই এদের মধ্যে প্রথম উপন্যাসটির নাম - কপালকুণ্ডলা; যার মূল পটভূমি কাঁথি শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের রসুলপুর নদী ও তার সাগর মিলন স্থল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জনপদ দারিয়াপুরের বালিয়াড়ি ও কাজুবাদামের জঙ্গলে ঘেরা জনবিরল অরণ্য স্থান অন্যতম, যেখানে উপন্যাসের মূল চরিত্র কপালকুণ্ডলা, কাপালিক সহ পথ হারিয়ে ফেলা নবকুমারকে ঘিরে সমগ্র কাহিনীটি আবর্তিত হতে দেখা যায়।
দ্বিতীয় উপন্যাসটির নাম কৃষ্ণকান্তের উইল, উপন্যাসের নাম চরিত্র হিসেবে যে জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায়ের কথা বলা হয়েছে, এই নামেই তৎকালীন সময়ে কাঁথিতে এক জমিদার ছিলেন; কথিত আছে বঙ্কিমচন্দ্র কাঁথিতে বসবাসকালে এই জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায়েরই প্রতিবেশী জনৈক শ্রী বারানসি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভালো, উপন্যাসের মূল চরিত্র হিসেবে কৃষ্ণকান্তের যে ভ্রাতুষ্পুত্র গোবিন্দলাল রায়ের কথা বলা হয়েছে বাস্তবে কিন্তু এই নামে কেউ ছিলেন না। উপন্যাস লেখক হিসেবে এটি একান্তই বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনা প্রসূত। কিন্তু উপন্যাসে বর্ণিত বাপী (জলাশয়) তট বা যে পুকুর পাড়ের কথা রয়েছে তা এখনোও বিদ্যমান। অধ্যাপক তথা কবি ও প্রাবন্ধিক অমলেন্দু বিকাশ জানা'র কথাতেও সেই কথা ফুটে উঠেছে। তাঁর মতে উপন্যাসে উল্লেখিত 'বাপী তট'ই আসলে কৃষ্ণকান্তের খনন করা এই দিঘি। এই প্রসঙ্গে তিনি বললেন, কাঁথিতে থাকাকালীন বঙ্কিমচন্দ্র যে বারানসি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে থাকতেন সেটি দিঘির উত্তর পাড় থেকে অল্প কিছু দূরেই অবস্থিত ছিল, তাছাড়া এই অঞ্চল তখন অত ঘনবসতিপূর্ণও ছিল না, যার ফলে যুবক বঙ্কিম প্রায়শই তাঁর আবাসস্থল থেকে এই দিঘিটিকে অবলোকন করে যথেষ্ট আকৃষ্ট বোধ করতেন।
উল্লেখ্য এই জলাশয়টি বর্তমানে কাঁথি শহরের মধ্যেই পড়ে; শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, স্কুলবাজারের কাছেই এটির অবস্থান। দলিল বা জমির পূর্ব প্রকৃতি সংক্রান্ত রেকর্ড অনুসারে, জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায় এই দিঘিটি খনন করেছিলেন বলে জানা যায়। স্থানীয় মানুষদের কাছে দিঘির পাড় সংলগ্ন জায়গাটি বর্তমানে কেষ্ট কান্তের আড়া (পাড়) নামে পরিচিত। বন্দেমাতরম স্পোর্টিং ক্লাব নামে একটি দীর্ঘদিনের পরিচিত ক্লাব রয়েছে এই দিঘির উত্তর পাড়ে। বিশালাকায় এই দিঘির দুদিকে এখনও কলা বা শিরিষ জাতীয় গাছের ঘন বসতি - ছায়াময় করে রাখে সর্বক্ষণ, উল্টো দিকে, উত্তর-দক্ষিণ মুখী একটি রাস্তা রয়েছে পুকুরের ধার ঘেঁষে।
সাম্প্রতিক কালে এই পুকুরেরই উত্তর দিকের প্রাঙ্গণে স্থাপিত হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি ; কাঁথির সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের চির অকৃত্রিম সম্পর্ক গাঁথাকে স্মরণীয় করে রাখতেই ২০১৩ সালে এই মূর্তিটি এখানে প্রতিষ্ঠা করে কাঁথি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র স্মরণ সমিতি ও চর্চা কেন্দ্র। বঙ্কিম স্মৃতি রক্ষায় ২০১০ সালে গঠিত হয় এই সমিতি, বর্তমানে এর কার্যকরী সভাপতি অধ্যাপক অমলেন্দু বিকাশ জানা বললেন, এই মূর্তিটি যে জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটি কৃষ্ণকান্ত রায়েরই বংশধর পরিমল রায়ের দান করা, যদিও মূর্তির সামনে দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে স্থানীয় পৌরসভা একটি যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ করেছে বলে তাঁর অভিযোগ এবং এই নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলছে বলেও তিনি জানালেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের ১৮৯ তম জন্মদিন (১৮৩৮, ২৬ শে জুন) উপলক্ষে কেষ্টকান্ত আড়ার এই বঙ্কিম মূর্তি পাদদেশে সকাল সকাল সমবেত হয়েছিলেন অধ্যাপক অমলেন্দু বিকাশ জানা সহ সমিতির সভাপতি ডক্টর দিলিপ কুমার দাস, সম্পাদক দীপক রায় ও অন্যান্য সদস্য বৃন্দ। উল্লেখ্য সম্পাদক দীপক রায় হলেন জমিদাতা তথা ঋষি বঙ্কিম জাতীয় ট্রাস্ট কমিটির প্রাণপুরুষ প্রয়াত পরিমল রায়ের পরিবারের একমাত্র জীবিত উত্তরসূরি, পুরুষানুক্রমিক বিচারে যিনি জমিদার কৃষ্ণকান্ত পরবর্তী পঞ্চম প্রজন্ম বলে অনুমান করা যায়।
বলাই বাহুল্য, সকালের (২০২৬, ২৬শে জুন) জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল মূর্তিতে মাল্যদান পর্ব দিয়ে, তারপরে সমবেত কন্ঠে বন্দেমাতরম গান গাওয়া হয় ও শেষে 'বঙ্কিমচন্দ্র ও জাতীয়তাবাদ' এই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক অমলেন্দু বিকাশ জানা। আলোচনা হয় আগামী দিনে বঙ্কিমচন্দ্রের মূর্তির পাশে একটি ভারতবর্ষের মানচিত্র সহ ভারতমাতার মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও।
আগামী দিনে লাইব্রেরী স্থাপন ছাড়াও একটি অডিটোরিয়াম নির্মাণের ভাবনা রয়েছে বলে জানালেন অমলেন্দু বিকাশ বাবু। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে বঙ্কিম মেলা আয়োজন করার ব্যাপারেও তাঁরা ভাবনা চিন্তা শুরু করেছেন বলে জানালেন। যদিও এ ব্যাপারে এখনোও কিছু চুড়ান্ত হয়নি, প্রসঙ্গত বঙ্কিম স্মৃতি
বিজড়িত দারিয়াপুরে বহু কাল আগে থেকেই একটি বার্ষিক মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। সেক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় মেলা হবে। তবে বঙ্কিম মেলা নিয়ে নিশ্চিত কোনো খবর তাঁরা আগামী দিনে সাংবাদিক সম্মেলন করেই প্রকাশ করবেন বলে জানালেন, সমিতির পক্ষ থেকে কার্যকরী সভাপতি অমলেন্দু বাবু।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন