সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঝিল পাড়ের বেলা!

আমাদের চোখে আমরা আমাদেরকেই নিরন্তর খুঁজে চলি, একা দোকা কিংবা ভিড়ের মাঝে থাকা মানুষগুলোকে ঘিরেই আমাদের দৃষ্টি আবর্তিত হয় সবসময়; হয়তো বা নিজেদের প্রতিরূপ খোঁজার নেশাতেই এর বাইরে আমাদের অন্য কিছু চোখে পড়ে না। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বকে ঘিরে থাকা গাছপালা, জলা জঙ্গল, পশু পাখি এদের এই নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। আমাদের সদা আত্মমুখী দৃশ্য প্রবাহে তাদের নীরব উপস্থিতি দিয়ে তারা প্রমান করে দেয়, তারা হোল সেই অতিথি যারা উপেক্ষিত হয়েও আমাদের কখনো ছেড়ে যায় না। তবে সেই উপেক্ষাও যে কখনো কখনো আকর্ষণে রূপান্তরিত হয়ে যায় সে কথাও স্বীকার করতে হবে। কোন এক দুপুরবেলায় তেমনই এক ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে ওদের প্রতি আমার নিবিড় আকর্ষণের কথা অনুভব করেছিলাম। সে এক কুহকী আবেশ। বলাই বাহুল্য, সেই অদম্য মোহপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি, যার ফল এই লেখা। প্রথমে ভেবেছিলাম গদ্যের আঙ্গিকে লিখবো, কিন্তু লেখা শুরু হতেই দেখি  ক্রমশ তা ছান্দিক মাত্রায় সম্পৃক্ত হয়ে যেতে চাইছে। আমি সেই স্বতঃস্ফূর্ততাকে মেনে নিয়ে ছন্দের স্রোতেই ভাসিয়ে দেই কলমের গতিকে। এবং শেষে তা এক পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
ঝিল পাড়ের বেলা, এক বিশেষ সময়ের হয়েও তার চারপাশের বাস্তুতন্ত্রকে সদা চিরন্তনতার আবহে চিত্রিত করে তুলতে থাকে, বাদ যায় না মানুষও; তবে মানুষেরা এখানে স্বতন্ত্র অস্তিত্বে নয় বরং মিশে থাকে অন্য সব কিছুর সঙ্গে, নিজেকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা দিতে চায় না। এটাই এই লেখার বৈশিষ্ট্য। আশা করি ভালো লাগবে। 
তবে পড়া যাক, মূল লেখা - ঝিল পাড়ের বেলা! 

 

ঝিল নিবি না তুই পাড় নিবি? ঝিলের বুকে জল ভরা, পাড়ের জমি খাস; তাতে এখন পুড়ছে রোদে, জংলি মুথা ঘাস। জলের পেটে দিচ্ছে হাওয়া ঢেউ ওঠানো সাজ, উল্টো পারে থমকে আছে দুমকো হরা গাছ। ভ্যারেন্ডা না গরান সেটা কেউ জানে না তা, রেল লাইনের সমান্তরাল ঝিলের জলে পা! বক গুলো সব বোকার মতন ঝিমিয়ে ব'সে ডালে, জ্যৈষ্ঠ মাসের তপ্ত দিনে মাছ খাবে না ভুলে। রেল চলে যায় গমগমিয়ে যাত্রি ঝুলে ঝুলে, ঝিলের জলে রেলের ছবি ছুটছে ছায়া ফেলে। বক হয়েছে বৈষ্ণবী আর মাছরাঙা দরবেশ, জলের বুকে দিব্যি ঢোঁড়া সাঁতার কাটছে বেশ। পান্না রঙা জলটি যেন কাঁচা আমের খোসা, তার বুকেতে চরৈবেতি ঝাঁঝি ফুলের ভাসা!

হিঞ্চে শাকের লাতায় পাতায় ঝিলের আঁচল ঢাকা, ভেজা জলে ডগমগিয়ে চিকন পাতার ঝাঁকা। ঝিরঝিরিয়ে কাঁপন তুলে থিরথিরিয়ে থামা, নাচে সদাই যেমন নাচায় পাগল হাওয়ানামা। জল ফড়িং এর এদিক ওদিক হলুদ সিফন পাখা, মদরঙা আর কুচো ঘাসে আসন তাদের পাকা।

ঝিলের পাড়ে রাস্তা ধরে, ক্লান্তি যদি আসে ধড়ে, জাম কদম আর কাঠ বাদামের ছায়া ঘন মাখা; নুইয়ে পড়া পাতার আদর, চৈত্রে যেন ভরা ভাদর - কপাল ছুঁয়ে থাকা।

এমনি কখন টুপটুপিয়ে, দু একটা পাকা জামের - ধরা তলে পড়া, ঝিলের পাড়ে হঠাৎ হাওয়া, সৃষ্টিছাড়া ছন্ন সুখে ছেলেবেলায় ফেরা।

ঝিলের পাড়ে জলের দোলা শান বাঁধানো ঘাটে; ঝাপুস ঝুপুস পড়ছে সবে জল উড়ছে টুটে।

বলছে নায়ক মোবাইল কানে, তুই নায়িকা আর হবি নে; বয়স তোর বিরূপ। দেহে মনে মেদের রাশি , নায়িকা আমি দেখছি নতুন।

এদিকে নায়ক যিনি বেজায় পৃথুল, মাথায় বেঁচে দু একটিই চুল; ঝিলের পাড়ে তবু রাজা তিনিই, নায়িকা তার চাইই যুবরাণী।

গুমটি ঘরে সেলুন চলে, আশা ভোঁসলের গানে ; ঝিমোয় রামু মুদিখানায় হেডফোন দিয়ে কানে।

মেঘ ঘনিয়ে আসলে পরে, বৃষ্টি হতে পারে, চায়ের দোকান বাঁচবে কেমন ভাঙা চালের ঘরে।

এমনি করে বিকেল সন্ধ্যা, রাত্রি আসে নেমে; ঝিলের পাড়ে দিন গুজরান সময় যায় না থেমে। সকাল হলে কাঠবিড়ালি ঘোরে শিরিষ ডালে, ফিঙে শালিক খেয়াল খুশি ওড়ে বৃষ্টি এলে।

সেই ছেলেটা গান শিখছে নয়তো এলেবেলে, ঝিলের পাড়ে কুহু শুনে ভাবে এ কোন তালে?

হঠাৎ রৌদ্র নিভু নিভু, মেঘের বেজায় বেড়ে উৎপাত; গাছগুলো সব সতর্ক এবার, তাদের ছায়া হয়েছে উৎখাত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...