মেয়েটির কাছে শব্দেরা ছিল বোবা, বধিরতার আঁধারে চোবানো। কারণ মেয়েটি ছিল কর্ণহীন, বাইরে দৃশ্যমান বেসিনাকৃতি কানের পাতা (Pinna) অংশটি তার ছিল না জন্মাবধি। ছিল না তার সঙ্গে যুক্ত কর্ণ নালিকা বা ইয়ার ক্যানেলও। যার ফল বহিঃকর্ণের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং তার সঙ্গে মধ্য কর্ণের টিম্প্যানিক মেমব্রেন বা ইয়ার ড্রামের না থাকা –দুইয়ে মিলে শব্দেরা কোনভাবে পৌছতে পারছিল না অন্তঃকর্ণ বা ককলিয়াতে। ফলশ্রুতি শব্দের পৃথিবীতে নীরবতার নির্বাসনে কাটানোর ভবিতব্য ছিল তার বরাদ্দ। কিন্তু করুণাময় ঈশ্বর হয়তো অন্য কিছু লিখেছিলেন মেয়েটির কপালে। তাই সাত বছর বয়সে এসে শেষ পর্যন্ত তার সামনে বন্ধ শব্দের দেরাজ খোলার একটা সম্ভাবনা দেখা দিল। কারণ প্রতিবেশী বাংলাদেশের এই সাত বছরের বধির মেয়েটিকে তার রুদ্ধ শ্রবন ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে শেষমেশ তার বিচ্ছিন্ন কর্ণ কুহরে সেতুবন্ধনের কাজটি করা শুরু করে দিল কোলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতাল। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার খবরে প্রকাশ, প্রখ্যাত কর্ণ বিশারদ তথা শল্য চিকিৎসক ডক্টর NVK মোহন এক অভিনব পন্থায় এই বিচ্ছিন্নতা মেরামত করার চেষ্টা করেছেন। কারণ আশ্চর্যজনক ভাবে মেয়েটির অন্তঃকর্ণ বা ককলিয়াটি কিন্তু অবিকল রয়েছে। শুধু বহিঃকর্ণ যা বাইরের শব্দকে সংগ্রহ করে তাকে বায়ু পূর্ণ কর্ণ নালিকা দিয়ে অন্তঃকর্ণে প্রেরণ করার কাজটি করে তার অনুপস্থিতির কারণেই এই শব্দ প্রতিবন্ধকতার জন্ম হয়েছিল। তাই এখানে ককলিয়া প্রতিস্থাপনের মত প্রচলিত অস্ত্রোপচারের কোনো ভূমিকা নেই, বরং ইয়ার ক্যানেল বা ইয়ার ড্রামের মত অংশগুলিকে পুনঃস্থাপিত করার মাধ্যমে অন্তঃকর্ণের সঙ্গে সংযোগ রচনা করাই ইপ্সিত লক্ষ ছিল। উল্লেখ্য এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হত যেটি শিশু মেয়েটির শরীরের পক্ষে একেবারেই অনাকাঙ্খিত। এক্ষেত্রে ডক্টর মোহন একটি চৌম্বকীয় আধান যুক্ত শব্দ সংবাহক বস্তুকেই তার মাথার পেছনে টেম্পোরাল বোনের নীচে প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা করেন, যার ফলে আলাদা করে আর ইয়ার ক্যানেল বা ইয়ার ড্রাম ইত্যাদি প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা পড়ে না। উল্লেখ্য প্রাথমিক এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে ডক্টর মোহন টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক পৃথ্বিজিৎ মিত্রকে সম্প্রতি জানিয়েছেন। চিকিৎসার পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বোন কন্ডাক্শান ইমপ্ল্যান্ট বলে। উল্লেখ্য টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি এই ইমপ্ল্যান্টটি ফিক্সার বা স্ক্রু’র মত করে চামড়ার নীচে আটকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত টাইটেনিয়াম ধাতুটি কানের মধ্যেকার কোমলাস্থির সঙ্গে অত্যন্ত সহনশীল বলেই এটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ডাক্তার বাবু আশা প্রকাশ করেছেন, শীঘ্রই এই অস্ত্রোপ্চার স্থল শুকিয়ে যাবে এবং তিন সপ্তাহ পরে এর দ্বিতীয় তথা অন্তিম পর্ব হিসেবে বাইরের প্রসেসর ইউনিটটিকে সেট করা হবে। এটি শব্দ সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করবে; যার মধ্যে একটি মাইক্রোফোন ও একটি প্রসেসর যুক্ত থাকবে। পিজোইলেকট্রিক ইমপ্ল্যান্ট নামে কথিত এই অংশটি এক সঙ্গে দুটো ভূমিকা পালন করবে। প্রথমত এটি বাইরের শব্দকে যেমন একটি শ্রবনীয় কম্পনে পরিণত করবে তেমনি সেটিকে ডিজিটাল সংকেত রূপে পূর্বের টাইটেনিয়াম ইমপ্ল্যান্টটিতে প্রেরণ করবে যাতে তা ককলিয়া হয়ে অডিটারি নার্ভে সহজে পৌছতে পারে এবং শোনার যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ডাক্তার মোহনের মতে বাইরের এই প্রসেসর ইউনিটটি একটি চৌম্বকীয় মুদ্রার মত দেখতে চিপ যেটিকে হেয়ারিং এইডের মত স্নান বা ঘুমনোর সময়ে খুলেও রাখা যেতে পারে।
ইতিমধ্যে মেয়েটির পরিবারের লোকেরা আশায় বুক বেঁধেছেন, অস্ত্রোপচারের প্রথম দফা যেভাবে সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে তাতে দ্বিতীয় পর্বও সঠিক সময়ে শেষ হবে এবং তার পরে মেয়েটি স্বাভাবিকভাবে সব কিছু শুনতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস। তখন হয়তো পাখির ডাক, মেঘের গর্জন, বৃষ্টির শব্দ থেকে মানুষের মুখের ভাষা সবকিছুই ধরা দেবে তার নবনির্মিত শ্রুতি যন্ত্রে। ডাক্তার মোহন বলেছেন, দ্বিতীয় চিপটি প্রতিস্থাপিত হয়ে গেলে বাইরের কানের পাতা অংশটি ততটা অপরিহার্য নয়। তবে এক্ষেত্রে কানের পাতার মত দেখতে কৃত্রিম কান ব্যবহার করা যেতে পারে, যেটি স্বাভাবিক শোনার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন না করলেও বাহ্যিক কর্ণহীন অবস্থাটির একটি দৃশ্যগত পরিবর্তন আনবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে এই বিরল জন্মগত ত্রুটি যেটিকে পরিভাষায় বাইল্যাটারাল মাইক্রোটিয়া উইথ কনজেনিটাল অরাল অ্যাট্রেসিয়া বলা হয় যেখানে জন্মগত ভাবে শিশুর বহিঃকর্ণ সহ বাইরের দৃশ্যমান পিনা অংশটি গড়ে ওঠে না, সেটা থেকে মুক্তি পেতে এই ধরনের OSIA -3 বোন কন্ডাক্টশন ইমপ্ল্যান্ট প্রক্রিয়া সম্পাদন পূর্ব ভারতে এই প্রথম। যদিও পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরোও একটি পর্ব শেষ হতে বাকি এখনো।
সে অর্থে সাত বছরের এই বধির মেয়েটি যেন শব্দ আর শব্দহীনতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শুধুমাত্র একটা পর্বের অন্তরাল ভাঙার অপেক্ষায় এখন, যে পর্ব শেষে শীঘ্রই পৃথিবী তার কাছে শব্দ মুখর হয়ে উঠবে এই আশায় সকলে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে সে দিকে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন