"ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে!" সেই কোন্ ছোটবেলায় পড়েছিলাম কবি গোলাম মোস্তফার লেখা বিখ্যাত এই লাইন দুটি,
ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে,
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে!
মোদ্দা কথা, ছেলেরও ছেলে আছে। অর্থাৎ আজ যে শিশু সে আগামীদিনে শিশুর জন্মদাতা, পিতা। সাধারণত শিশু দিবসের দিনে এই লাইনটির কথা বেশী করে মনে করা হয়। কিন্তু আজ পিতৃ দিবসের সন্ধ্যায়, ওই কবিতার সূত্র ধরেই, আমার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠলো অনেকদিন আগে পড়া একটা ছোট গল্পের কথা। যার সঙ্গে কবিতার এই লাইনটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
গল্পটি পড়েছিলাম, তাও প্রায় বছর পনেরো তো হবেই। তখন সপ্তাহান্তে কৃষ্ণনগর থেকে বিকেল ৪টা ২০'র লোকাল ট্রেন ধরতাম শিয়ালদহ আসার। ভীষণ ভীড়। তাও আড়াই ঘন্টার রাস্তা। কি করবো, বুক স্টল থেকে একটা সাপ্তাহিক 'দেশ' কিনে নিতাম, আর সেটা পড়তে পড়তেই পৌঁছে যেতাম গন্তব্যে। হকার, যাত্রী, স্টেশনে ওঠা নামার ত্রস্ত ব্যস্ততা, চিৎকার চেঁচামেচি কোনো কিছুই স্পর্শ করতো না বিশেষ। প্রসঙ্গত বলে নিই, 'দেশ' এর সঙ্গে আমার সখ্যতা সেই আটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন সাগরময় ঘোষ 'দেশ' এর সম্পাদক। ক্লাস সেভেন, এইটে পড়ি, তখন থেকে পড়া শুরু করি। আমার বাবা 'দেশ' এর নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন; শত ব্যস্ততার মধ্যেও বাবাকে দেখেছি, বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা এই সাহিত্য ম্যাগাজিনটিকে, দিনের মধ্যে একবার অন্তত হাতে তুলে নিতে। বাবার দেখাদেখি আমরাও উল্টে পাল্টে দেখা শুরু করি, এবং বলাই বাহুল্য, বাবা এইভাবে - খুব নিভৃতে, আমাদের মধ্যে সাহিত্য চর্চার নেশা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। বাবা কিন্তু কোনোদিন, পড়ার বইয়ের পাশাপাশি এই সব বই পড়া ভালো বা এইরকম কিছু বলেননি। কিন্তু বুঝতে পারতাম, বাবার এই ব্যপারে বেশ সস্নেহ প্রশ্রয় ছিল। যাই হোক এই নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। তবে আজ নয়, অন্য আর এক দিন তা বলা যাবে।
শুরুতেই বরং যে গল্পটির কথা বলছিলাম সেটার কথায় ফেরা যাক। কারণ ওই গল্পের অন্তিম উপলব্ধি এবং কবি গোলাম মোস্তফার লেখা কবিতার লাইন দুটি - উভয়েই এক গভীর সত্যের সামনে
এনে আমাদেরকে দাঁড় করায়।
একটি পিতৃত্বের চিরন্তন ও অন্যটি বর্তমান সময়ের নিরিখে পিতৃত্বের বিপন্নতাকে তুলে ধরলেও এরা একে অন্যের সহযাত্রী হয়ে যাত্রা সম্পন্ন করে এবং আজকের দিনে যা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
গল্পটির নাম বা লেখকের নাম এতদিনে আর মনে নেই আমার। এইজন্যে প্রথমে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
সংক্ষেপেই বলি, গল্পটিতে এক বৃদ্ধ বাবা, তাকে তাঁর ছেলেরা - শহরের বিলাসবহুল এক বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, যদিও বর্তমান দিনের এটাই চল, তাতে কোনোরকম নতুনত্ব নেই। কিন্তু এক রবিবারের ভোরে ঘটলো বিপত্তি। ছেলেদের কাছে খবর এলো, বৃদ্ধাশ্রমে তার বাবাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাস, যার যা রবিবাসরীয় প্ল্যান বাতিল, উল্টে ছেলেরা সব দৌড়লো বৃদ্ধাশ্রমে; বড়ছেলের ছেলে সেও তার বাবার সঙ্গী হলো দাদুকে খুঁজে বার করার অভিযানে। এখানে ওখানে, আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের বাড়ি, পাশাপাশি পার্ক, বাজার, কিন্তু কোথাও কোনো লাভ হলো না। শেষে পুলিশে নিখোঁজ ডায়েরি করতে হলো। ভগ্ন হৃদয়ে, ছেলেরা শেষ পর্যন্ত, যে যার বাড়ি (ফ্ল্যাটে ) ফিরে গেল। ক্লান্ত অবসন্ন সেই রাত্রিতে, বড়ছেলে যখন তার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে, তাঁর সদ্য হারিয়ে যাওয়া বাবার স্মৃতি মন্থন করছিল, তখন ঘরের মধ্যে বিছানায়, ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল তার একমাত্র পুত্র সন্তান, তার স্নেহের ধন।
বারান্দা থেকে ঘুমে
কাতর ছেলেকে দেখে, বড্ড মায়া জাগে তার বাবার; ধীরে ধীরে, তিনি তাঁর ছেলের মাথার কাছে এসে দাঁড়ান। মনের অজান্তেই ভাবতে শুরু করেন, ছেলে ও তাঁর মধ্যেকার সম্পর্কের ভবিতব্য নিয়ে।
ভাবতে ভাবতে, কখন যে নিজেকে বিপর্যস্ত ভাবতে শুরু করেন
তার খেয়াল থাকে না।
যখন কবি গোলাম মোস্তফার লেখা
সেই কবিতার লাইনের মতো করে, কেউ যেন বারবার তাঁকে মনে করিয়ে দিয়ে
যাচ্ছিল -

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন