সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুলফিওয়ালা!

কুলফিওয়ালা, একটু সন্ধি বিচ্ছেদ করে দেখি কি পাই - কুল যদি ঠান্ডা হয় তবে ফি - এই কথাটির অর্থ হলো প্রতি সময়; তাহলে কুল-ফি-ওয়ালা হলো প্রতি সময় যিনি ঠান্ডা বিলিয়ে বেড়ান

তবে এটি সম্পূর্ণ ভাবে আমার ব্যাখ্যা। একটু মজার ছলে বলা, যদিও সাধারণ ভাবে কুলফিওয়ালা বলতে আমরা যাদেরকে বুঝি, সেই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কুলফি মালাই বিক্রি করা লোকগুলো তো প্রকৃত অর্থে ঠান্ডাই বিলি করে বেড়ান। যদিও কুলফি এই কথাটি একটি ফারসি শব্দ; যার অর্থ হলো ঢাকা কাপ। আর সেই ঢাকা কাপ বা কুলফি ভর্তি 'রে - জ্বাল দেওয়া দুধ আর চিনির মিশ্রণ কে মালাই হিসেবে পরিবেশন করার ভাবনা কিন্তু প্রথম শুরু হয় সেই ষোড়শ শতাব্দীতে। দিল্লিতে তখন মোঘল শাসনকাল। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ষোড়শ শতকে তিন জন মোঘল বংশীয় দিল্লির ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। বাবর, হুমায়ূন এবং আকবর। এঁদের নিজ নিজ সাম্রাজ্য কাল বিচার করে অনুমান করা যায়, সম্ভবত সম্রাট আকবরের আমলেই (১৫৫৬ – ১৬০৫) শুরু হয়েছিল এই কুলফি তৈরির চল।  কারণ ১৫৯০ সালে প্রকাশিত, সম্রাট আকবরের সভাকবি তথা তাঁর প্রধান মন্ত্রনাকার আবুল ফজলের লেখা ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে, প্রথম এর উল্লেখ দেখা যায়। প্রসঙ্গত, আবুল ফজল কর্তৃক লিখিত এই বই যেমন সেসময়কার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক চিত্রকে তুলে ধরার কাজ করেছিল তেমনি তখনকার সমাজ সংস্কৃতি থেকে শুরু করে মানুষের পোশাক আশাক তথা তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন খ্যাদ্যাভ্যাস ও সেসময়ের প্রচলিত খাদ্য রুচির সম্পর্কেও একটা সম্যক ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। গ্রন্থটি ফার্সি ভাষায় লেখা হয়েছিল।
যথারীতি মোঘলদের শাসন যুগ অবসান হয়ে গেছে অনেক কাল হোল, তারপরে, শুরু হয় ইংরেজদের রাজত্ব কাল; তাও শেষ হয়ে গেছে সেই কবে; কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে কুলফিমালাই এর চাহিদা বিশেষ করে গরমের দিনগুলোতে যাকে বলে, অপ্রতিরোধ্য এখনো।
এমনকি ভারতের বাইরে, মধ্যপাচ্য বা সুদূর ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতেও কুলফি বেশ জনপ্রিয়; শেষ পাতের মিষ্টি বা ডেসার্ট হিসেবে এদের কদর বেশ ঈর্ষনীয়।   

প্রথম থেকেই কুলফির মধ্যে হিমায়িত দুধ ও চিনির মিশ্রনকে সুগন্ধি যুক্ত করার জন্যে এলাচ, পেস্তা, জাফরান বা কেসর ইত্যাদি মেশানোর প্রচলন আছে। সেই মোঘল আমল থেকে চলে আসছে এই চল।  

প্রচ্ছদের ছবিতে এই কুলফিওয়ালা ভাই সাইকেলে করেই কুলফি ফেরি করেন, পেছনের কেরিয়ারে লাল শালু মোড়া মালাই রাখার পাত্র, সামনে মালাই পরিবেশনের কুলফি গুলো প্লাস্টিকের মধ্যে একটার মধ্যে একটা ঢোকানো থাকে। এই কুলফিগুলোর আকৃতি শাঙ্কব। প্রসঙ্গত মাটির গোল পাত্রের মধ্যে যখন একে পরিবেশন করা হয়, তখন একে মটকা কুলফি বলা হয়ে থাকে।  

তবে পথচলতি কোনো হকারের কাছে সাধারণত গোলাপি আভা যুক্ত, দানাময়, মসৃণ দেহ সৌষ্ঠব বিশিষ্ট, শঙ্কু আকৃতির হিমায়িত কুলফিই পাওয়া যায়।  সাইকেলে কিংবা তিনচাকার ঠেলায় করে বিক্রি করতে দেখা যায়। অবশ্যই এদের সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলতে দেখা যায় একটি বড় পেতলের ঘন্টিকে। দুপুরের পিচ গলা রোদ্দুরে ঢং ঢং আওয়াজ শুনলেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাড়ির মেয়ে বাচ্চারা মুখ বাড়িয়ে দেখে এই বুঝি কুলফিওয়ালা এলো

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...