বড়দিনের অঞ্জলি হয়, ঘন্টা বাজে, ফাদারকে চার্চের পুরোহিত বলা হয়; পরনে থাকে আপাদকন্ঠ ঢাকা দুধ শুভ্র জোব্বা; পরিভাষায় যাকে অ্যালব বলা হয়। গলায় সাদা স্কার্ফ বা স্টোল, বুকের ওপর রুদ্রাক্ষের মালার মতো ঝোলে ক্রুশ চিহ্নের লকেট সম্বলিত লম্বা হার। মন্দিরের গর্ভগৃহের মতোই নাটমন্দির, থুড়ি চার্চের লম্বা আয়তাকার হল পেরিয়ে দেখা যায় সেই উপাসনার লক্ষ্যবস্তু, আলোকমালায় সাজানো পবিত্র ক্রুশ সিম্বলকে। পেছনের দেওয়াল জুড়ে দাঁড় করানো থাকে সেই পূর্ণাবয়ব আকৃতি, দেখে সম্ভ্রম জাগে মনে। সামনের লাল পর্দা টেনে মুক্ত করলেই তবে তার দর্শন হয়।
মুখে, ডায়াসের ওপরে রাখা থাকে - কাঠের বড় একটি পোডিয়াম। দুপাশে ফুল গুচ্ছ গোঁজা বড় বড় দুটো ফুলদানি, পেতলের পিলসুজ তাতে অবশ্য প্রদীপ নয় মোমবাতি জ্বলছে। ফাদার প্রভাত মন্ডল, পোডিয়ামের খুব সুন্দর একটা বাংলা বললেন, ফুলপিঠ।
বাঙালির কাছে, বড়দিন মানে কেক, শুভেচ্ছা জানানো, বেড়াতে যাওয়ার হিড়িক বা পার্ক স্ট্রিটের উদ্ভ্রান্ত ভিড় শুধু নয়, একশো ভাগ বাঙালিয়ানায় ভরা অন্যতম প্রধান একটি উৎসব এখন এটি। বাঙালির বারো মাসের তোরো পার্বণের একটি। তাই পিকনিকে যাওয়ার আগে, সে তিনি পৌত্তলিক হোন কিংবা নাই হোন, যীশুর ছবির দিকে তাকিয়ে একবার অন্তত কপালে হাত ঠেকান না, এমন বাঙালি প্রায় নেই বললেই চলে।
কিন্তু মানিকপুরের মেথোডিস্ট চার্চে প্রভু যীশুর কোনো মূর্তি বা এমনকি কোনো ছবি পর্যন্তও নেই।
একটু অফবিট চার্চের খোঁজে বেরিয়েছিরাম, যেখানে উৎসবের অত জাঁক না থাকুক অন্তত প্রাণের স্পন্দন, সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে।
নরেন্দ্রপুর মিশন গেট পেরিয়ে, রাজপুরের দিকে চলেছি। পথের দুপাশে বাড়ি ঘর, কারখানার গেট, মন্দির, স্কুল, দোকান বাজার, দিগন্তে মাথা তোলা নতুন নতুন ফ্ল্যাট বাড়ির সুউচ্চ চিলেকোঠা, আরোও দূরে নারকেল সুপারির সুলম্ব অবস্থিতি, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কোনো চার্চের হদিস পাচ্ছিলাম না আমি; সেই বহু পরিচিত গথিক স্থাপত্যে তৈরি ত্রিকোণ চূড়ার ছবি - দূর দূর পর্যন্ত তার কোনো চিহ্ন নজরে আসছিল না আমার।
একজন দাড়িওয়ালা, গ্যালিলিওর মতো দেখতে সাইকেল আরোহীকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা এখানে কোনো চার্চ আছে কাছাকাছি, কোনো পোড়ো চার্চ?
পোড়ো? পোড়ো মন্দির হয়, চার্চ হয় না। ঠিক আছে ঠিক আছে। তাই সই। কোনো চার্চ আছে?
সোজা আরো একটু এগিয়ে যান। মিনিট দশেকের মতো; হরহরিতলার মোড় পড়বে। ডানদিকে মানিকপুর যাওয়ার রাস্তা। কয়েক মিনিট হাঁটলেই পড়বে চার্চ। এ এলাকায় একটিই।
বেশ তাই হোক। রাস্তার দুদিকেই দেখি, চুটিয়ে বিক্রি হচ্ছে - ছোট বড় নানা সাইজের, গাঢ় সবুজ রঙের ক্রিসমাস ট্রি, কাপড়ের তৈরি পুতুল সান্তাক্লজ থেকে শুরু করে মেরি ক্রিসমাস লেখা সাদা পাড়ের লাল টুপি, জরি কাগজের ঝলমলে শিকলি, স্টার সহ আরোও কত কি। মুদিখানা বা মনোহারী দোকানেই সব পাওয়া যাচ্ছে। সাথে নানা ফর্মার কেক তো বলার নয়।
এখন বাঙালি, কেকের প্যাকেটেই জয়নগরের মোয়া কিনে বাড়ি নিয়ে যায়। নলেন গুড়ের মিষ্টি দোকানেও বেশ জমিয়ে কেক বিক্রি হচ্ছে। দেখে তো মনে হয়, শীতের দিনে পিঠে পুলি খাওয়ার যে বহু পুরনো রেওয়াজ ছিল বাঙালির তা বোধহয় বড়দিনের কেক খাওয়ার মধ্যে দিয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধি লাভ করতে চাইছে। হলদিরামের দোকান থেকে পাটিসাপটা কিনে খাওয়ার মতো।
তবে এর মধ্যেও একটা জিনিষ যেটার কথা না উল্লেখ করে পারছি না সেটা হোল বাবুই পাখির বাসার মতো দেখতে পোড়া মাটির জাগ, যার মধ্যে টুইটুম্বর হয়ে থাকা বিশুদ্ধ নলেন গুড়ের কথা। দেখলেও মায়া পড়ে যায়। সেটা অবশ্য বিক্রি হচ্ছে কেকের দোকানেই। আশার কথা।
যাক বলতে বলতে, চার্চে এসে পৌছালাম। লাল ইঁটের দেওয়ালের ওপরে সাধারণ ছাদ দেওয়া একটি গীর্জা ঘর। সামনে দোচালার একটা প্রবেশ পথ। ছাদের উত্তর মুখে, ত্রিকোণ চূড়া, যার শীর্ষে এবং দুদিকে দুটি, মোট তিনটি ক্রুশ রয়েছে। চারদিকে গাছপালা বলতে তেমন নেই, ন্যাড়া। শুধু দক্ষিণ পশ্চিম কোনে একটা বাবলা গাছ। চুড়ার গায়ে লেখা, প্রতিষ্ঠা সাল ১৯৬৩।
ফাদার বললেন, এটি আগে অন্যত্র ছিল, ৬৩ সালে এখানে উঠে এসেছে। গ্রিফিক্স সাহেব তৈরি করেছিলেন এটি। পূর্বের স্থানে এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই এর। মেথোডিস্ট, প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে থাকা একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী। যারা কোনোরকম ছবি বা মূর্তি রাখায় ঘোরতর অবিশ্বাসী। ভারতবর্ষের মেথোডিস্টদের প্রধান কার্যালয় লক্ষ্ণৌ।
হলের লাল কার্পেট দেওয়া মেঝে, দুপাশের বেঞ্চে প্রভু যীশুর বাণী ও প্রার্থনা সঙ্গীত সম্বলিত বাংলা বই রাখা। পরেশ হালদার, বই গুলো যত্ন করে রেখে যাচ্ছিলেন জায়গায় জায়গায়। বলতে বলতে, শিপ্রা মন্ডল উপস্থিত হলেন একটা বড় ক্রিসমাস ট্রি নিয়ে। ডায়াসের একদিকে রেখে আলোর মালা পরিয়ে দেওয়া হলো তার গায়ে।
ক্যান্ডেল লাইট সার্ভিস শুরু হওয়ার আগে, হলের সমস্ত লাইট নিভিয়ে দেওয়া হল। সবার হাতে প্রজ্জ্বলিত মোম । কন্ঠে - হে প্রভু অন্ধকার থেকে আমাদের আলোয় নিয়ে চলো'র জপ মন্ত্র। তমসো মা জ্যোতির্গময়ো।
মাইক্রোফোন মুখে, ফাদার, বিশ্বপিতা যীশুর উদ্দেশ্য প্রার্থনা স্তোত্র পাঠ করছেন, সাথে সাথে হলের দুপাশে উপস্থিত মন্ডলীর সদস্য সদস্যারা নিজ নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, সমস্বরে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। গমগম করছে ছোট্ট গীর্জা ঘরটি।
কি অঞ্জলি দেওয়া হলো তো?





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন