চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের ওপর যদি কোনোকালে পঞ্জিকা লেখার ভার বর্তাত তাহলে কি হত সেটা একবার ভেবে দেখুন। নির্ঘাত, দেবীর বছরকার বাংলা ভ্রমনের নির্ধারিত চতুরযান ব্যবস্থাটিকে পুরোপুরি তুলে দিতেন তিনি; উল্টে ছেলেপুলে নিয়ে, দেবীকে হেঁটে হেঁটেই মর্ত্যধামে আসতে উদ্বুদ্ধ করতেন। কারণ শিল্পী মানুষ, মা হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দালানে এসে পৌঁছচ্ছেন, তারপরে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে মুঠো বন্দি আঁচলকে উঁচিয়ে ধরছেন মুখের সামনে, এই ভাবনাটাই তো যথেষ্ট বৈপ্লবিক। কে জানে, পদব্রজে দুর্গাকে তখন কিভাবে চিত্রপটে ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। রঙ তুলি আর কল্পনার ত্রিগুণবন্দীতে, সিংহবাহিনী দুর্গা তখন গজগামিনী অম্বিকা হয়ে দেখা দিতেন কিনা ভক্তদের সামনে, কে জানে!
তবে ফিদা হুসেনের নাম শুনে যারা ইতিমধ্যে কপালে ভাঁজ ফেলেছেন, তাঁদের অভয় দিয়ে বলি তেমন কোনো সম্ভাবনার আশা কেবলমাত্র সাহিত্যের আঙিনাতেই সীমাবদ্ধ। অনেক সময় ভুমিকাতে এই ধরনের উল্লেখ, পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের পক্ষে সহায়ক হয়।
আমাদের আজকের নিবন্ধের ভরকেন্দ্র, বছরকার দেবীর আগমন এবং গমন নিয়ে যে অপরিসীম কৌতূহলের আবহ তৈরি হয় জনমানসে, তাকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে যে চারটি প্রচলিত মাধ্যম রয়েছে দেবীর শরৎকালীন গমনাগমনের – গজ, ঘোড়া, দোলা এবং নৌকা, এদের মধ্যে ঠিক কোন কোন বাহনে চড়ে দেবীর সম্বৎসরে আসা যাওয়া স্থির হয় এটা জানার জন্যে যে তুমুল ঔৎসুক্য দেখা যায় আপামর বাঙালীর মধ্যে, তা এককথায় অবর্ণনীয়। এই প্রবল উৎসাহের উৎপত্তিকাল তথা এর পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যেই আজকের এই নিবন্ধের অবতারণা। এমনিতে পঞ্জিকা খুললেই এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কথিত আছে, বারের ওপর ভর করে ঠিক হয় দেবী কিসে আসবেন এবং কিসে যাবেন। সপ্তমী (আসার দিন) এবং দশমী (যাওয়ার দিন) যদি রবিবার বা সোমবারে পড়ে তবে দেবীর আগমন এবং গমন হবে গজে বা হাতীতে। যদি মঙ্গলবার বা শনিবার হয় তবে তা হবে ঘোটকে বা ঘোড়ায়। বুধবারে হলে নৌকায়, আর বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার হলে হবে দোলায়। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বার অনুসারে দেবীর আসা যাওয়ার বাহনও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, প্রত্যেকটি বাহন আবার আগাম প্রাকৃতিক, সামাজিক তথা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস জ্ঞাপনকারী হিসেবেও চিহ্নিত। ভবিষ্যতের বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ কিংবা দুর্বিপাকের প্রাক সংকেত প্রদানকারী হিসেবে, পঞ্জিকায় এদের ভূমিকা নির্দিষ্ট। যেমন গজে এলে ধরনী শস্যশ্যামলা হবে, ঘোটকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে, নৌকায় এলে প্রবল বৃষ্টি, বন্যা বা ঝঞ্ঝা ইত্যাদি হতে পারে আর দোলায় এলে সবথেকে খারাপ - মহামারী বা দুর্ভিক্ষ হতে পারে। এখন প্রশ্ন, পঞ্জিকায় এই প্রসঙ্গটি ঠিক কবে থেকে উল্লেখিত হওয়া শুরু হল। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ শ্রী মহেশ চন্দ্র শর্মা যে 'পঞ্জিকার ইতিবৃত্ত' নামে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন; তাতে তিনি লিখেছেন সময় এবং কাল বিভাজনের লক্ষে জগতে সর্বপ্রথম যে পঞ্জিকা প্রবর্তিত হয় যাকে সংস্কৃতে পঞ্চাঙ্গ বলা হয়, তা হয় স্বয়ং সূর্যদেবের হাত ধরে। যা জগতে সূর্যসিদ্ধান্ত নামে পরিচিত। সত্যযুগের প্রায় শেষার্ধে, আনুমানিক ২১ লক্ষ ৬৫ হাজার বছর পূর্বে, সূর্য এই সংক্রান্ত তাঁর জ্ঞান প্রদান করেন অসুর ময় কে। পরবতীতে ময় অসুরের মাধ্যমেই তা মুনি ঋষিদের কাছে এসে পৌঁছায়। ক্রমে ক্রমে তা খ্রিস্ট জন্মের গণ্ডী পেরিয়ে, তারও প্রায় চারশো সাল বাদে জন্ম নেওয়া জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের সমক্ষে এলে তিনি পঞ্চ সিদ্ধান্তিকা প্রণয়ন করেন। এটি যথাক্রমে পৌলিশ, রোমক, বশিষ্ঠ, সৌর ও পৈতামহ এই পাঁচটি সিদ্ধান্তের সমন্বয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের ইতিহাসে সূর্যসিদ্ধান্তের পরে পঞ্চসিদ্ধান্তিকা দ্বিতীয় বড় মাইলস্টোন।
এখন প্রশ্ন, তখনকার পঞ্জিকায় কি দেবী দুর্গার এই গমনাগমন নিয়ে কোনো উল্লেখ থাকতো? হিসেবমত, শারদীয় দুর্গা পুজার প্রচলন হয় রামের অকাল বোধনের পরে। কারণ পুরান বলছে, আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়, যখন সূর্য কর্কট রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে অর্থাৎ কর্কট সংক্রান্তির দিন থেকে পৌষের অন্ত পর্যন্ত বা মকর সংক্রান্তির দিন অবধি ছয় মাস দেবলোকে রাত্রি চলে। একে দক্ষিণায়ন বলে। মকর সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু হয় উত্তরায়ণ, মানে রাত শেষ হয়ে, দিন শুরু হয়। টানা ছ মাস ধরে চলে। অনেকটা আমাদের পৃথিবীর নরওয়ের প্যাটার্ন; তবে এর জন্যে আমাদের দেবদেবীরা সকলে নরওয়ের বাসিন্দা ছিলেন সেরকমটা ভাবার কোনো দরকার নেই। তা যাক গে, দক্ষিণায়নের সময়ে, দেবদেবীরা সকলে যোগ নিদ্রায় অতিবাহিত করেন। তাও দেবী, রামের আকুল ডাকে সাড়া দিয়ে নিদ্রা ভঙ্গ করতে বাধ্য হন এবং মর্তে অবতীর্ণ হন। সেই থেকে, অর্থাৎ রামায়ণের কাল থেকেই নাকি জগতে শুরু হয় মহিষাসুরমর্দিনী, দেবী দুর্গার শারদীয় পূজা অর্চনার চল। এইখানে কিন্তু একটা বড় বিতর্ক রয়েছে। সেটা হল, মূল বাল্মিকী রচিত রামায়ণে, এমনকি বাংলা ছাড়া অন্য ৩৭ টি ভাষায় অনূদিত রামায়ণেও কিন্তু এই অকাল বোধনের কাহিনী কোথাও নেই। এর পেছনে একমাত্র ফুলিয়ার কৃত্তিবাস ওঝা মহাশয়েরই হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ তিনিই এই পর্বটিকে, অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁর অনুবাদ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার কাজটি করেছিলেন।পাশাপাশি, দেবী কৃত নীল পদ্ম হরনের গল্পটিও, অত্যন্ত মানানসই ভাবে তিনি তাঁর অনুবাদের সঙ্গে জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অর্থাৎ, আশ্বিন মাসের শুক্লা তিথিতে অনুষ্ঠিত বাঙালীর কথিত শ্রেষ্ঠ উৎসবটির ভিত্তিভূমি হিসেবে, কৃত্তিবাস বর্ণিত রামায়ণেকেই পুরো কৃতিত্ব দেওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। যেটির রচনাকাল ধরা হয় মোটামুটি ১৪ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে।
মনে রাখতে হবে, বাংলার অন্যতম প্রাচীন পূজা, এই সময়কালেই (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত হয় তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণের বাড়িতে। সেই প্রথম লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্ত্তিক সহ সপরিবারে দুর্গা পুজা হওয়া শুরু হয়। তার কয়েক দশকের মধ্যেই নবদ্বীপে জন্ম নেন স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, যাকে আধুনিক বাংলা পঞ্জিকার জনকও বলা হয়। কথিত আছে, রাজা শশাঙ্কের আমলেই প্রথম বাংলা পঞ্জিকা প্রবর্তিত হয়, এবং সেটি ঐতিহাসিক ভাবেও স্বীকৃত। কারণ শশঙ্কের সময়কাল (৫৯৪ -৬২৫ শক) এবং বঙ্গাব্দের শুরুর সময়কাল (খ্রিস্টজন্মের ৫৯৪ বছর পরে শুরু হয় বঙ্গাব্দ) ধরলে রাজা শশাঙ্ককেই বঙ্গাব্দ প্রচলনের জনক বলাটা বেশী যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। অন্য আর একটি মত অনুসারে, মোঘল সম্রাট আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে দেখানো হয়। তবে একথা ঠিক, আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ, প্রচলিত সাল ও মাস বণ্টনের ব্যবস্থার মধ্যে কিছু সংস্কার আনার উদ্যোগ নেন। কারণ ফসলের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সেসময় কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল তাঁকে। তাই জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লাহ সিরাজীর ওপর দায়িত্ব দেন, প্রচলিত চান্দ্র হিজরী ও সৌর পঞ্জিকার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর কাজে। শেষ পর্যন্ত ১৫৮৪ সালে এসে তিনি তারিখ ই ইলাহি নামে একটি সন ব্যবস্থা চালু করেন যেটির বর্ষারম্ভ হয় বৈশাখ মাসে। এটিকে ফসলি সন ও বলা হয়। তাই আকবরকে বঙ্গাব্দের জনক না বলে সংস্কারক বলাটাই বেশী যুক্তিপূর্ণ।
এখন যদি ঘটনাগুলিকে এইরকম সাজিয়ে নেওয়া হয়, ১৪ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রকাশ কাল এবং ১৫ শতাব্দীর শেষ দশকে এসে অধুনা বাংলাদেশ স্থিত রাজশাহীর তাহিরপুরে শারদীয় দুর্গা পুজার প্রবর্তন; আগেই বলেছি রাম কর্তৃক দুর্গার যে অকাল বোধনের ধারনা তা প্রথম কৃত্তিবাসই তাঁর অনুবাদ গ্রন্থে আমদানি করেন। এর পরে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে, স্মার্ত রঘুনন্দন কর্তৃক বাংলা পঞ্জিকার নব রূপ প্রাপ্তির ঘটনা, যেটি একটা বড় দিকচিহ্ন হিসেবেই স্বীকৃত বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাসে। এর পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র (১৭১০-১৭৮৩) তাঁর শাসনাকালে পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যানিধিকে দিয়ে বাংলা পঞ্জিকায় বড়সড় সংস্কার আনেন। ইতিমধ্যে পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে (১৭৫৭, ২৩শে জুন) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নবাবের মধ্যে। বলাই বাহুল্য সে যুদ্ধে কোম্পানি জয়লাভ করে, এবং কোম্পানির পক্ষে থাকা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, সেই আনন্দে মহা ধুমধাম করে সেবছর শারদীয় দুর্গা পূজার আয়োজন করেন। যে পুজায় ইংরেজরাও উপস্থিত হয়েছিল বলে কথিত। বাংলায় এইভাবে দুর্গা পুজার প্রচলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীতে ১৮১২ সালে এসে বাংলা পঞ্জিকা তার প্রথম মুদ্রিত রূপ পায়। ক্রমে ক্রমে, নানা বিবর্তনের হাত ধরে আজকের বাংলা পঞ্জিকায় এসে পৌঁছানোর পূর্বে, সবথেকে যে বড় সংস্কারটি হয় সেটি হয় ১৯৫২ সালে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহার তত্ত্বাবধানে পঞ্জিকৃত হয় প্রথম রাষ্ট্রীয় পঞ্জিকা। যদিও আজকের দিনে প্রচলিত সবকটি পঞ্জিকাতেই দেবীর আগমন এবং গমন সংক্রান্ত যে জ্যোতিষ ভাষ্য দেওয়া থাকে, এতদূর আলোচনার পরেও কিন্তু সেটি ঠিক কবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল পঞ্জিকায়, সে সম্পর্কে কিছু ধোঁয়াশা কাটে না। এখন তথ্যের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে যদি একটু কাল্পনিক ভাবে কারণ খোঁজার ব্যাপারে মনোনিবেশ করা যায় তাহলে কি দাঁড়ায় দেখা যাক। সে ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে, ব্রিটিশ আমলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, গ্রামের জমিদার মশাই তিনি তাঁর মেয়েকে হাতীর পিঠে চাপিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজ বাটীতে নিয়ে আসছেন। তবে হাতী বা ঘোড়া পোষার সাধ্য তো আর সকলের হত না। তাই অনেককেই দেখা যেত পালকি বা দোলা পাঠাতে। কমজোর জমিদাররা আবার গরুর গাড়িও পাঠাতেন। নদীপথে এলে তো নৌকা ছাড়া কোনো গতি নেই। বলা হয়, সম্বৎসরে মা দুর্গার এই আগমন আসলে, স্বামীর বাড়ি থেকে, মেয়ের বাপের বাড়ি আসার সঙ্গেই তুলনীয়। ব্যাস, বাংলার পাঞ্জিকারেরা সেই মোতাবেক দেবী দুর্গারও আগমন ও প্রত্যাবর্তনের যানবাহন হিসেবে সেই হাতী, ঘোড়া, পালকি এবং নৌকার কথাই পাঞ্জিতে লিপিবিদ্ধ করে গেলেন। যদিও নির্দিষ্ট করে এর সময়কাল নিরূপণ করা, তথ্যের অপ্রতুলতার কারনে, নিবন্ধের একদম অন্তে এসেও সম্ভব হল না। তবে যানবাহনের গতিপ্রকৃতি বিচার করে অনুমান করা যায় এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে, যখন থেকে নাকি বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজার জোরদার প্রচলন শুরু হয় তখনকার কোনো সময়ের করা। বাকি বাহন গুলিকে পূর্বাভাস প্রদানকারী হিসেবে প্রতিকায়িত করার ব্যাপারটি দীর্ঘ জ্যোতিষীয় নিরীক্ষণের ফসল বলে মনে হয়, যেটি আরও পরে সংযুক্ত হয়েছে বলেই ধারনা।
কিন্তু কালে কালে যানবাহনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ কালের কেউ যদি পঞ্জিকা সংস্কারে হাত লাগাতেন নিশ্চিতভাবে মায়ের আসা যাওয়ার ব্যাপারটা আকাশ পথেই সেটল করতেন। সুদূর কৈলাস থেকে এতদূরে এই গাঙ্গেয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে আসা তো আর কম ঝক্কির কথা নয়। টুক করে একটা ফোর সিটার চপারে চড়ে, পুজো প্যান্ডেলের পাশে কোনো বড় বাড়ির খোলা ছাদে এসে নামলেই হল।
আমাদের আজকের নিবন্ধের ভরকেন্দ্র, বছরকার দেবীর আগমন এবং গমন নিয়ে যে অপরিসীম কৌতূহলের আবহ তৈরি হয় জনমানসে, তাকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে যে চারটি প্রচলিত মাধ্যম রয়েছে দেবীর শরৎকালীন গমনাগমনের – গজ, ঘোড়া, দোলা এবং নৌকা, এদের মধ্যে ঠিক কোন কোন বাহনে চড়ে দেবীর সম্বৎসরে আসা যাওয়া স্থির হয় এটা জানার জন্যে যে তুমুল ঔৎসুক্য দেখা যায় আপামর বাঙালীর মধ্যে, তা এককথায় অবর্ণনীয়। এই প্রবল উৎসাহের উৎপত্তিকাল তথা এর পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যেই আজকের এই নিবন্ধের অবতারণা। এমনিতে পঞ্জিকা খুললেই এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কথিত আছে, বারের ওপর ভর করে ঠিক হয় দেবী কিসে আসবেন এবং কিসে যাবেন। সপ্তমী (আসার দিন) এবং দশমী (যাওয়ার দিন) যদি রবিবার বা সোমবারে পড়ে তবে দেবীর আগমন এবং গমন হবে গজে বা হাতীতে। যদি মঙ্গলবার বা শনিবার হয় তবে তা হবে ঘোটকে বা ঘোড়ায়। বুধবারে হলে নৌকায়, আর বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার হলে হবে দোলায়। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বার অনুসারে দেবীর আসা যাওয়ার বাহনও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, প্রত্যেকটি বাহন আবার আগাম প্রাকৃতিক, সামাজিক তথা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস জ্ঞাপনকারী হিসেবেও চিহ্নিত। ভবিষ্যতের বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ কিংবা দুর্বিপাকের প্রাক সংকেত প্রদানকারী হিসেবে, পঞ্জিকায় এদের ভূমিকা নির্দিষ্ট। যেমন গজে এলে ধরনী শস্যশ্যামলা হবে, ঘোটকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে, নৌকায় এলে প্রবল বৃষ্টি, বন্যা বা ঝঞ্ঝা ইত্যাদি হতে পারে আর দোলায় এলে সবথেকে খারাপ - মহামারী বা দুর্ভিক্ষ হতে পারে। এখন প্রশ্ন, পঞ্জিকায় এই প্রসঙ্গটি ঠিক কবে থেকে উল্লেখিত হওয়া শুরু হল। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ শ্রী মহেশ চন্দ্র শর্মা যে 'পঞ্জিকার ইতিবৃত্ত' নামে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন; তাতে তিনি লিখেছেন সময় এবং কাল বিভাজনের লক্ষে জগতে সর্বপ্রথম যে পঞ্জিকা প্রবর্তিত হয় যাকে সংস্কৃতে পঞ্চাঙ্গ বলা হয়, তা হয় স্বয়ং সূর্যদেবের হাত ধরে। যা জগতে সূর্যসিদ্ধান্ত নামে পরিচিত। সত্যযুগের প্রায় শেষার্ধে, আনুমানিক ২১ লক্ষ ৬৫ হাজার বছর পূর্বে, সূর্য এই সংক্রান্ত তাঁর জ্ঞান প্রদান করেন অসুর ময় কে। পরবতীতে ময় অসুরের মাধ্যমেই তা মুনি ঋষিদের কাছে এসে পৌঁছায়। ক্রমে ক্রমে তা খ্রিস্ট জন্মের গণ্ডী পেরিয়ে, তারও প্রায় চারশো সাল বাদে জন্ম নেওয়া জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের সমক্ষে এলে তিনি পঞ্চ সিদ্ধান্তিকা প্রণয়ন করেন। এটি যথাক্রমে পৌলিশ, রোমক, বশিষ্ঠ, সৌর ও পৈতামহ এই পাঁচটি সিদ্ধান্তের সমন্বয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের ইতিহাসে সূর্যসিদ্ধান্তের পরে পঞ্চসিদ্ধান্তিকা দ্বিতীয় বড় মাইলস্টোন।
এখন প্রশ্ন, তখনকার পঞ্জিকায় কি দেবী দুর্গার এই গমনাগমন নিয়ে কোনো উল্লেখ থাকতো? হিসেবমত, শারদীয় দুর্গা পুজার প্রচলন হয় রামের অকাল বোধনের পরে। কারণ পুরান বলছে, আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়, যখন সূর্য কর্কট রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে অর্থাৎ কর্কট সংক্রান্তির দিন থেকে পৌষের অন্ত পর্যন্ত বা মকর সংক্রান্তির দিন অবধি ছয় মাস দেবলোকে রাত্রি চলে। একে দক্ষিণায়ন বলে। মকর সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু হয় উত্তরায়ণ, মানে রাত শেষ হয়ে, দিন শুরু হয়। টানা ছ মাস ধরে চলে। অনেকটা আমাদের পৃথিবীর নরওয়ের প্যাটার্ন; তবে এর জন্যে আমাদের দেবদেবীরা সকলে নরওয়ের বাসিন্দা ছিলেন সেরকমটা ভাবার কোনো দরকার নেই। তা যাক গে, দক্ষিণায়নের সময়ে, দেবদেবীরা সকলে যোগ নিদ্রায় অতিবাহিত করেন। তাও দেবী, রামের আকুল ডাকে সাড়া দিয়ে নিদ্রা ভঙ্গ করতে বাধ্য হন এবং মর্তে অবতীর্ণ হন। সেই থেকে, অর্থাৎ রামায়ণের কাল থেকেই নাকি জগতে শুরু হয় মহিষাসুরমর্দিনী, দেবী দুর্গার শারদীয় পূজা অর্চনার চল। এইখানে কিন্তু একটা বড় বিতর্ক রয়েছে। সেটা হল, মূল বাল্মিকী রচিত রামায়ণে, এমনকি বাংলা ছাড়া অন্য ৩৭ টি ভাষায় অনূদিত রামায়ণেও কিন্তু এই অকাল বোধনের কাহিনী কোথাও নেই। এর পেছনে একমাত্র ফুলিয়ার কৃত্তিবাস ওঝা মহাশয়েরই হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ তিনিই এই পর্বটিকে, অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁর অনুবাদ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার কাজটি করেছিলেন।পাশাপাশি, দেবী কৃত নীল পদ্ম হরনের গল্পটিও, অত্যন্ত মানানসই ভাবে তিনি তাঁর অনুবাদের সঙ্গে জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অর্থাৎ, আশ্বিন মাসের শুক্লা তিথিতে অনুষ্ঠিত বাঙালীর কথিত শ্রেষ্ঠ উৎসবটির ভিত্তিভূমি হিসেবে, কৃত্তিবাস বর্ণিত রামায়ণেকেই পুরো কৃতিত্ব দেওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। যেটির রচনাকাল ধরা হয় মোটামুটি ১৪ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে।
মনে রাখতে হবে, বাংলার অন্যতম প্রাচীন পূজা, এই সময়কালেই (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত হয় তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণের বাড়িতে। সেই প্রথম লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্ত্তিক সহ সপরিবারে দুর্গা পুজা হওয়া শুরু হয়। তার কয়েক দশকের মধ্যেই নবদ্বীপে জন্ম নেন স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, যাকে আধুনিক বাংলা পঞ্জিকার জনকও বলা হয়। কথিত আছে, রাজা শশাঙ্কের আমলেই প্রথম বাংলা পঞ্জিকা প্রবর্তিত হয়, এবং সেটি ঐতিহাসিক ভাবেও স্বীকৃত। কারণ শশঙ্কের সময়কাল (৫৯৪ -৬২৫ শক) এবং বঙ্গাব্দের শুরুর সময়কাল (খ্রিস্টজন্মের ৫৯৪ বছর পরে শুরু হয় বঙ্গাব্দ) ধরলে রাজা শশাঙ্ককেই বঙ্গাব্দ প্রচলনের জনক বলাটা বেশী যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। অন্য আর একটি মত অনুসারে, মোঘল সম্রাট আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে দেখানো হয়। তবে একথা ঠিক, আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ, প্রচলিত সাল ও মাস বণ্টনের ব্যবস্থার মধ্যে কিছু সংস্কার আনার উদ্যোগ নেন। কারণ ফসলের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সেসময় কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল তাঁকে। তাই জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লাহ সিরাজীর ওপর দায়িত্ব দেন, প্রচলিত চান্দ্র হিজরী ও সৌর পঞ্জিকার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর কাজে। শেষ পর্যন্ত ১৫৮৪ সালে এসে তিনি তারিখ ই ইলাহি নামে একটি সন ব্যবস্থা চালু করেন যেটির বর্ষারম্ভ হয় বৈশাখ মাসে। এটিকে ফসলি সন ও বলা হয়। তাই আকবরকে বঙ্গাব্দের জনক না বলে সংস্কারক বলাটাই বেশী যুক্তিপূর্ণ।
এখন যদি ঘটনাগুলিকে এইরকম সাজিয়ে নেওয়া হয়, ১৪ থেকে ১৫ শতাব্দীর মধ্যে কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রকাশ কাল এবং ১৫ শতাব্দীর শেষ দশকে এসে অধুনা বাংলাদেশ স্থিত রাজশাহীর তাহিরপুরে শারদীয় দুর্গা পুজার প্রবর্তন; আগেই বলেছি রাম কর্তৃক দুর্গার যে অকাল বোধনের ধারনা তা প্রথম কৃত্তিবাসই তাঁর অনুবাদ গ্রন্থে আমদানি করেন। এর পরে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে, স্মার্ত রঘুনন্দন কর্তৃক বাংলা পঞ্জিকার নব রূপ প্রাপ্তির ঘটনা, যেটি একটা বড় দিকচিহ্ন হিসেবেই স্বীকৃত বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাসে। এর পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র (১৭১০-১৭৮৩) তাঁর শাসনাকালে পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যানিধিকে দিয়ে বাংলা পঞ্জিকায় বড়সড় সংস্কার আনেন। ইতিমধ্যে পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে (১৭৫৭, ২৩শে জুন) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নবাবের মধ্যে। বলাই বাহুল্য সে যুদ্ধে কোম্পানি জয়লাভ করে, এবং কোম্পানির পক্ষে থাকা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, সেই আনন্দে মহা ধুমধাম করে সেবছর শারদীয় দুর্গা পূজার আয়োজন করেন। যে পুজায় ইংরেজরাও উপস্থিত হয়েছিল বলে কথিত। বাংলায় এইভাবে দুর্গা পুজার প্রচলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীতে ১৮১২ সালে এসে বাংলা পঞ্জিকা তার প্রথম মুদ্রিত রূপ পায়। ক্রমে ক্রমে, নানা বিবর্তনের হাত ধরে আজকের বাংলা পঞ্জিকায় এসে পৌঁছানোর পূর্বে, সবথেকে যে বড় সংস্কারটি হয় সেটি হয় ১৯৫২ সালে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহার তত্ত্বাবধানে পঞ্জিকৃত হয় প্রথম রাষ্ট্রীয় পঞ্জিকা। যদিও আজকের দিনে প্রচলিত সবকটি পঞ্জিকাতেই দেবীর আগমন এবং গমন সংক্রান্ত যে জ্যোতিষ ভাষ্য দেওয়া থাকে, এতদূর আলোচনার পরেও কিন্তু সেটি ঠিক কবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল পঞ্জিকায়, সে সম্পর্কে কিছু ধোঁয়াশা কাটে না। এখন তথ্যের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে যদি একটু কাল্পনিক ভাবে কারণ খোঁজার ব্যাপারে মনোনিবেশ করা যায় তাহলে কি দাঁড়ায় দেখা যাক। সে ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে, ব্রিটিশ আমলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, গ্রামের জমিদার মশাই তিনি তাঁর মেয়েকে হাতীর পিঠে চাপিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজ বাটীতে নিয়ে আসছেন। তবে হাতী বা ঘোড়া পোষার সাধ্য তো আর সকলের হত না। তাই অনেককেই দেখা যেত পালকি বা দোলা পাঠাতে। কমজোর জমিদাররা আবার গরুর গাড়িও পাঠাতেন। নদীপথে এলে তো নৌকা ছাড়া কোনো গতি নেই। বলা হয়, সম্বৎসরে মা দুর্গার এই আগমন আসলে, স্বামীর বাড়ি থেকে, মেয়ের বাপের বাড়ি আসার সঙ্গেই তুলনীয়। ব্যাস, বাংলার পাঞ্জিকারেরা সেই মোতাবেক দেবী দুর্গারও আগমন ও প্রত্যাবর্তনের যানবাহন হিসেবে সেই হাতী, ঘোড়া, পালকি এবং নৌকার কথাই পাঞ্জিতে লিপিবিদ্ধ করে গেলেন। যদিও নির্দিষ্ট করে এর সময়কাল নিরূপণ করা, তথ্যের অপ্রতুলতার কারনে, নিবন্ধের একদম অন্তে এসেও সম্ভব হল না। তবে যানবাহনের গতিপ্রকৃতি বিচার করে অনুমান করা যায় এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে, যখন থেকে নাকি বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজার জোরদার প্রচলন শুরু হয় তখনকার কোনো সময়ের করা। বাকি বাহন গুলিকে পূর্বাভাস প্রদানকারী হিসেবে প্রতিকায়িত করার ব্যাপারটি দীর্ঘ জ্যোতিষীয় নিরীক্ষণের ফসল বলে মনে হয়, যেটি আরও পরে সংযুক্ত হয়েছে বলেই ধারনা।
কিন্তু কালে কালে যানবাহনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ কালের কেউ যদি পঞ্জিকা সংস্কারে হাত লাগাতেন নিশ্চিতভাবে মায়ের আসা যাওয়ার ব্যাপারটা আকাশ পথেই সেটল করতেন। সুদূর কৈলাস থেকে এতদূরে এই গাঙ্গেয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে আসা তো আর কম ঝক্কির কথা নয়। টুক করে একটা ফোর সিটার চপারে চড়ে, পুজো প্যান্ডেলের পাশে কোনো বড় বাড়ির খোলা ছাদে এসে নামলেই হল।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শ্রী মহেশ চন্দ্র ন্যায়রত্ন প্রনীত পঞ্জিকার ইতিবৃত্ত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন