সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নরেন্দ্রপুর স্টেশন ও বিবেকানন্দ স্মরণের ইতিহাস!

নরেন্দ্রপুর হল্ট, ভারতীয় রেল মানচিত্রে একমাত্র রেলওয়ে স্টেশন, যার নামকরণের নেপথ্যে স্বামী বিবেকানন্দের পূর্ব-নাম নরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি মহিমা কে উজাগর করে রাখার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা জড়িয়ে আছে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরের এই হল্ট স্টেশন হওয়ার ইতিহাস অবশ্য বেশ আকর্ষণীয়। কারণ গড়িয়া এবং সোনারপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী এই নরেন্দ্রপুর থেকে পূর্বোক্ত দুই স্টেশনের দূরত্ব খুব বেশি নয়। খুব জোর হলে এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে।


নরেন্দ্রপুর স্টেশনে স্বামীজীর মূর্তি।

প্রসঙ্গত ১৮৬২ সাল অর্থাৎ স্বামীজীর জন্মেরও (১৮৬৩, ১২ ই জানুয়ারি) এক বছর আগে শিয়ালদহ থেকে নামখানা গামী রেল লাইনের পত্তন হয়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্রপুর স্টেশনের সূচনা হয়েছিল তার অনেক পরে, ১৯৮৪ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর। শুরুর সময়ে মাত্র ছয়, ছয় বারোখানা ট্রেন দাঁড়াতো, বললেন স্টেশনের সেই সময়কার স্টেশন মাস্টার বসন্ত কুমার নস্কর।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার জমি মানচিত্রে নরেন্দ্রপুর নামে কোনো মৌজা কখনো ছিল না, এমনকি আজোও নেই।  ১৯৫৬ তে, উত্তর কোলকাতার পাথুরিয়াঘাটা থেকে, বর্তমান স্থল উখিলাপাড়া- পাইকপাড়া অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়ে আসা - রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন পরিচালিত স্টুডেন্ট হোম কে (পাথুরিয়াঘাটায় প্রতিষ্ঠা সাল, ১৯৪৩) কেন্দ্র করেই নরেন্দ্রপুর নামের উন্মেষ। সর্বজনবিদিত, স্বামী লোকেশ্বরানন্দজীর নেতৃত্বে, সেদিনকার সেই স্টুডেন্টস হোমের, আজকের দিনে শিক্ষা এবং শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান হিসেবে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের বিশ্ব বিশ্রুত হয়ে ওঠার কথা।

তাই ১৯৭৯ তে যখন সোনারপুর রেলওয়ে জংশনকে সামনে রেখে, সোনারপুরের অদূরেই (বর্তমান নরেন্দ্রপুর স্টেশনের দক্ষিণবর্তী প্রান্তে) একটি কারশেড গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়, তখন থেকেই পার্শ্ববর্তী গ্রাম কাদারাট, শ্রীখন্ডা এবং কুসুম্বার মানুষজনেরা এই অঞ্চলে একটি রেলওয়ে স্টেশন করার ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। তাতে অগ্রবর্তী ভূমিকা নেন, আইনজীবী তারকনাথ নস্কর, যামিনী চট্টোপাধ্যায় সহ গোপাল বিশ্বাসেরা। গঠিত হয় রেল যাত্রী স্টিয়ারিং কমিটি। আবেদন, নিবেদন থেকে শুরু করে রেল আটকানোর মতো জঙ্গী আন্দোলনও সংঘটিত হতে দেখা গেছে সেই সময়। ছুটে এসেছেন, শিয়ালদহ শাখার জি এম। শেষ পর্যন্ত যা ফলপ্রসূ হতে সময় লেগেছে আরোও চার বছর। কিন্তু হাল ছাড়েননি কেউই; আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া মানুষজন থেকে এলাকার সাধারণ লোকজনেরা সকলেই লড়ে গেছেন অদম্য জেদ নিয়ে।


স্বামী বিবেকানন্দ জন্মজয়ন্তী উৎসব কমিটির সদস্য বৃন্দ।

শেষমেষ দাবী মেনে নেওয়া হলে, স্টেশনের নামকরণের প্রশ্নে তিন গ্রামের মানুষ সর্বসম্মতভাবে স্থির করেন নরেন্দ্রপুর নামটি। পূর্ব রেল, আনন্দের সঙ্গে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। প্রসঙ্গত তখন রেল মন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত গণিখান চৌধুরী। স্টেশন উদ্বোধনের কয়েকদিন বাদেই, স্বামীজীর জন্মদিন, ১২ই জানুয়ারিতে (১৯৮৫) নবোদ্ঘাটিত স্টেশন চত্ত্বরে সর্বপ্রথম ঘটা করে পালিত হয় বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তী। আসেন রেলের তদানীন্তন ডি আর এম, এম কে ঘোষ। সেই থেকে আজ ( ১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬) স্বামীজীর ১৬৩ তম জন্মদিন পালন পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে আসছে স্বামীজীর জন্মজয়ন্তী পালনের আয়োজন। প্রথমের দিকে গোপাল বিশ্বাসের আঁকা স্বামীজীর পোর্ট্রেটেই মাল্যদান করে পালিত হতো জন্মদিন, পরে ২০০১ সালে নতুন স্টেশন বিল্ডিং তৈরি হলে বিবেকানন্দের বড় ছবি লাগানো হয়। কাঁচের ফ্রেমের মধ্যে বন্দী সেই ছবিটি আজোও রয়েছে অকুস্থলে। তবে ইতিমধ্যে, ২০১০ সালে স্থাপিত হয়েছে বিবেকানন্দের পূর্ণাবয়ব মর্মর মূর্তি (১ নং প্লাটফর্মে, স্টেশনে ওঠার সিঁড়ির মুখে, বাঁদিকে)। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের তত্বাবধানে নির্মিত মূর্তিটি উদ্বোধন করেন তদানীন্তন জাহাজ মন্ত্রী মুকুল রায়। উদ্যোক্তা, স্বামী বিবেকানন্দ জন্মজয়ন্তী উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ নাথ নস্কর বললেন, ১৯৯২ সাল থেকে স্বামীজীর জন্মজয়ন্তী পালনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন উৎসব কমিটি। প্রসঙ্গত এই কমিটিই পূর্বের রেল যাত্রী স্টিয়ারিং কমিটি হিসেবে আন্দোলনের সূচনা করেছিল।


আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যামিনী চট্টোপাধ্যায়। 

মূর্তিতে মাল্যদান, মাটির দীপাধারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন থেকে শুরু করে ফল মিষ্টির ভোগদান পর্যন্ত হয়েছে আজ মূর্তির পাদদেশে। ট্রেনের যাওয়া আসা চলছে, লোকজনের ওঠানামা, এর মধ্যে ছোট করে বিবেকানন্দ স্মরণ, পুষ্প অর্পণ করেছেন কমিটির সদস্যেরা। এসেছিলেন, তখনকার আন্দোলনের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যামিনী চট্টোপাধ্যায়। অশক্ত শরীরেও, তিনি মূর্তির সামনে বসে বিবেকানন্দের স্মৃতি উজাগর করেছেন তাঁর শ্রদ্ধা -শুদ্ধ স্মরণ কথায়। তাঁকে প্রণাম করতে, তিনি আপ্লুত হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে বললেন আমাকে নয়, স্বামীজীর পায়ে প্রণাম করো।

 ১২ই জানুয়ারি, ২০২৬
নরেন্দ্রপুর স্টেশনে স্বামীজীর ১৬৩ তম জন্মজয়ন্তী পালন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...