হেঁড়ে গলায়,
হাত তালি
দিতে দিতে,
যাদেরকে
প্রায়শই আমরা বাসে ট্রেনে হাত পাততে দেখি, সেই শাড়ি পরা পুরুষালি চেহারার বৃহন্নলাদের
তো খিল্লি-খিস্তি ছাড়া কোনোভাবে ভাবতেই পারি না আমরা; কিন্তু সেই তাদের মুখেই যদি ‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তা হারে’ শুনি তা একটু খটকা তো লাগেই। তাও
অত সুন্দর এবং বিশুদ্ধ উচ্চারণে! সুভাষগ্রাম স্টেশন থেকে নেমে রেল লাইনের পাশ ধরে
হেঁটে যাওয়ার সময়,
কানে আসতেই
- পেছন ফিরে তাকালাম। খানিকটা পেছনেই হাঁটছিল ওরা। দুজনে ছিল। আমার তাকানো দেখে, একে অপরের উপরে হেঁসে একেবারে
কুটোপুটি খেতে লাগলো।
রাত ফুরোলেই সরস্বতী পূজা; এবারে আবার নেতাজীর জন্মদিনও (১২৯ তম) পড়েছে একই দিনে। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি আর জানুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ একইদিনে পড়েছে, এরকম উদাহরন কিন্তু খুব বেশী নেই। তাই এমন দিনে, বাগদেবীর আরাধনা মন্ত্র আর দেশাত্মবোধের শ্লোগান মিলে মিশে যে ভক্তি আর দেশপ্রেমের একেবারে সুপারহিট সিম্ফনি বেজে উঠবে সে কথা বলাই যায়। ২২ তারিখ সন্ধ্যায়, খানিকটা সেই আবেগের আঁচ পোহাতেই বলা যায়, উপস্থিত হয়েছিলাম সুভাষগ্রামে। সুভাষগ্রাম স্টেশনের অদূরেই, কোদালিয়া গ্রাম; যেখানে সুভাষের পৈত্রিক ভিটে। সুভাষের পূর্বের প্রায় ১৩ পুরুষের বাসস্থান ছিল এই কোদালিয়ায়। পুরন্দর খাঁ থেকে শুরু করলে, সুভাষের বাবা জানকীনাথ বসুর নাম আসে ১৩ তম তে। কারণ, জানকীনাথ ও তাঁর বাকি তিন অগ্রজ ভাই যদুনাথ, কেদারনাথ ও দেবেন্দ্রনাথরাই কোদালিয়ার পৈতৃক ভিটেতে বসবাসকারী শেষ প্রজন্ম। পরবর্তীকালে এদের কর্মজীবন বা প্রতিষ্ঠা সহ সবই অন্য নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখনকার যে বাড়ি, দেউড়ি, কাছারি বাড়ি, হরনাথ লজ লেখা প্রবেশ পথ বা বিশালাকার দুর্গা দালান ইত্যাদি দেখি তা অবশ্য তৈরি করেছিলেন সুভাষের ঠাকুরদা শ্রী হরনাথ বসু।
প্রতি বছরের মত, এবারেও দুর্গা দালানে সরস্বতী পূজার আয়োজন হবে; কিন্তু এবারে একটু অন্যরকম। কারণ একই দিনে ২৩ শে জানুয়ারিও পড়ে গেছে; তাই নেতাজীর জন্মদিন পালনের ঘটাও দেখা যাবে এক সাথে। এই উপলক্ষে স্থানীয় মানুষ থেকে এখানকার নেতাজী জন্মজয়ন্তী পালনের মুখ্য আয়োজক সংস্থা নেতাজী কৃষ্টি কেন্দ্রের সদস্যদের ব্যস্ততা একেবারে তুঙ্গে। আলোর মালা দিয়ে বাড়ি সাজানো, ঝাড় পোছ, দোতলার বারান্দায় নেতাজীর পৈতৃক বাড়ি লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানোর ব্যবস্থা করা, পাশাপাশি জানকীনাথ বসু প্রতিষ্ঠিত হরনাথ - বীণাপাণি লাইব্রেরী (প্রতিষ্ঠা সাল - ১৯২০) প্রাঙ্গনে এই উপলক্ষে অনুষ্ঠান মঞ্চ নির্মাণের কাজও চলছে মহা তৎপরতার সঙ্গে। কৃষ্টি কেন্দ্রের অন্যতম সদস্য তথা রাজপুর- সোনারপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ডক্টর পল্লব দাস, কোদালিয়া বোসপাড়ারই বাসিন্দা, তিনি দেখলাম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জাতীয় পতাকা স্তম্ভ নির্মাণের কাজে তদারকি করছেন। এই বছরই সেটি উদ্বোধন হওয়ার কথা। লাইব্রেরী পার্শ্বে অবস্থিত নেতাজীর আবক্ষ মূর্তিটি অবশ্য ১৯৮৪ সালের ২৩ শে জানুয়ারির দিন উন্মচিত হয়েছিল। ১৯৮১ সালে গড়ে ওঠা নেতাজী কৃষ্টি কেন্দ্রই, ১৯৮৪ সালে এই মূর্তিটি এখানে প্রতিষ্ঠা করে। এইবছর মূর্তির চারপাশের রেলিঙের ঘেরাটোপ তথা মূর্তির মাথার ওপরে থাকা ছাউনিটিরও নব রূপায়নের কাজে হাত দেওয়া হয়েছিল। উদ্বোধনের আগের দিন সন্ধ্যায় দেখলাম, সেই কাজেরই ফাইনাল টাচ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে জোর কদমে। সেই হিসেবে, ২০২৬ সালের ২৩ শে জানুয়ারী, নব পতাকা স্তম্ভ নির্মাণ তথা নেতাজীর মূর্তির চারপাশের নব রূপায়ন প্রকল্পের উদ্বোধন বছর হিসেবে স্মরনীয় হয়ে থাকবে বলে জানালেন ডক্টর পল্লব দাস।
এই প্রসঙ্গে, পল্লব বাবু ২০১৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের
আচমকা সফরের কথা স্মরণ করলেন। সেদিনটাও ছিল ২২শে জানুয়ারি। অন্য একটি প্রোগ্রামে
আসা মুখ্যমন্ত্রী - হঠাৎই মিডিয়া এবং বাকি সকলের নজর এড়িয়ে, বারুইপুর গামী রাজ্য সড়ক ছেড়ে, স্থানীয় অ্যাটলাস মোড় হয়ে
কোদালিয়ায় ঢুকে পড়েছিলেন। আবেগমথিত কন্ঠে পল্লব বাবু বলছিলেন, সেদিনকার কথা; যা তাঁরা কোনোদিনই
ভুলতে পারবেন না। প্যান্ডেলের
কাপড় সেলাই করা ছুঁচ সুতো দিয়েই মুখ্যমন্ত্রী সেদিন হলুদ গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে
ছিলেন,
এবং শুধু
তাই নয়,
সেই মালা
নেতাজীর গলায় পরাবার সময় নিজের আঁচল দিয়ে মূর্তির মুখ মুছিয়ে দিয়েছিলেন। সর্বোপরি সেই দিনই নেতাজীর পৈতৃক
বাড়িটিকে হেরিটেজ বিল্ডিং করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এর ফলে চুন সুড়কি ও কড়ি কাঠের ছাদ
দেওয়া শতবর্ষ প্রাচীন এই দোতলা বাড়িটি, তার পুরনো স্থাপত্য বজায় রেখেও, অনিবার্য
ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এখন নির্দিষ্ট তিনটি দিনে, যথাক্রমে ২৩শে জানুয়ারী, প্রজাতন্ত্র দিবস অর্থাৎ ২৬শে
জানুয়ারি ও ১৫ই আগস্টের দিন জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় বাড়িটি। বিশেষ
অনুরোধে,
পল্লব বাবু
আগের দিন সন্ধ্যাতে,
আমাদের
ঘুরে দেখার জন্যে খুলে দেওয়ার অনুমতি দেন। এই প্রসঙ্গে বলি, ভেতরে কিছু দুষ্প্রাপ্য পোর্ট্রেট
দেখলাম,
ঘোড়ায়
চড়া সুভাষ চন্দ্র এবং সুভাষের বাবা ও মায়ের আলাদা আলাদা দুটো দুর্লভ ছবি।
সম্প্রতি কয়েকবছর ধরে ঠাকুর দালানের সামনের প্রাঙ্গণে চিত্র ও হস্তলিল্পের
প্রদর্শনী বসে। এবারেও বসেছে। স্থানীয় ছেলেমেয়েরাই, এই সব প্রদর্শিত শিল্পকলার নেপথ্য শিল্পী।
অনেক ছবির মধ্যে,
শ্রেষ্ঠা
মণ্ডলের আঁকা নেতাজীর প্রতিকৃতিটি বেশ লাগলো; শিল্পী - ক্লাস নাইনে পড়া কিশোরী। জিজ্ঞাসা
করলাম,
তুমি কি
ভাবে নেতাজীর জন্মদিন পালন করবে! প্রসঙ্গত, ১৮৯৭ সালের ২৩ শে জানুয়ারী, দুপুর ১২ টা ১৫ মিনিটে নেতাজীর
জন্ম হয়েছিল ওড়িশার কটক শহরে। দেশবরেণ্য এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর জন্মক্ষণের
মাহাত্ম্যকে তুলে ধরতে,
প্রতিবছর
ওই সময়ে শঙ্খধ্বনি এবং উলুদানের মাধ্যমে সমগ্র এলাকাকে মুখরিত করে তোলার ব্যবস্থা
হয়। তা আমার প্রশ্নের উত্তরে, মেয়েটি বলল কি - সে ওই সময় উলু দেবে। আমি
বললাম তাহলে শাঁখ বাজাবেন কারা, মেয়েটি বলল তার মা, সঙ্গে পাড়ার কাকিমা জেঠিমারা সকলে
বাজাবেন।
এখন প্রশ্ন,
সুভাষ কি
এসেছিলেন কোদালিয়ায় তাঁর এই পৈতৃক ভিটেতে। এই প্রশ্নের মুখে পল্লব বাবু শুধু বললেন
সবই পূর্বজদের মুখ থেকে শোনা। কোনো প্রামান্য লেখা জোখা কিছু নেই। তবে দুর্গা পূজার
সময় কয়েকবার এসেছিলেন বলে শোনা যায়। বিশেষ করে অষ্টমীর সন্ধি পুজার সময়টায়, সুভাষ খালি গায়ে ধুতি আর কাঁধে
উত্তরীয় চাপিয়ে ধ্যানে বসার মত করে সারাক্ষণ চোখ বুজে বসে থাকতেন। সন্ধি পূজা শেষ
হলেই মা প্রভাবতী দেবীকে নিয়ে এলগিন রোডের বাড়িতে ফিরে যেতেন। বসু পরিবারেরই
প্রবীণ বংশধর মানিক বসুর মুখেও একই কথার প্রতিধ্বনি শুনলাম। উনি শুধু যোগ করলেন, সুভাষের প্রচণ্ড মাতৃ ভক্তির কথা।
সুভাষ কি তাহলে কোনোদিন রাত্রিবাস করেননি কোদালিয়ায়? দোতলার পশ্চিম দিকের ঘর খুলে, বাড়ির বর্তমান কেয়ারটেকার সন্তোষ
ঘোষ বহু পুরনো
একটি পালঙ্ককে দেখিয়ে বললেন এই খাটেই নাকি সুভাষ এলে ঘুমোতেন। সন্তোষ ঘোষের বাবা
পাঁচু ঘোষও এই বাড়ির দেখাশোনাতেই জীবন কাটিয়েছেন। পাঁচু ঘোষ নাকি সুভাষকে দেখেছেন।
যাই হোক,
কথিত আছে, এলাকার সেই সময়কার বিপ্লবীদের
সঙ্গে নাকি সুভাষ কয়েকবার গোপন বৈঠক করতে কোদালিয়ায় এসেছিলেন। ডক্টর পল্লব দাসের
মতে সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়,
হরিকুমার
চক্রবর্তী,
শৈলেশ্বর
বসু প্রমুখ সেসময়কার অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে সুভাষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
ছিল। যদিও এই তত্ত্বের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সুভাষগ্রামের বিশিষ্ট
ইতিহাস চর্চাকারী তথা বামপন্থি মতাদর্শে বিশ্বাসী দেবাশিস দাস। তাঁর মতে এই সকল
বিপ্লবীদের কার্যকাল সুভাষের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনেক কাল আগেকার।
বিশিষ্ট সংস্কৃত শাস্ত্রবিদ শ্রী দ্বারকানাথ বিদ্যা ভূষণের পৌত্র জয়ন্তী চক্রবর্তী, এলাকার ইতিহাস নিয়ে একটি
প্রামান্য গ্রন্থ লিখেছেন। বইটির নাম – চার পুণ্য ধাম। কোদালিয়া, চ্যাঙড়িপোতা,
হরিনাভী ও মালঞ্চ এই চারটি গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা রয়েছে বইটিতে। সে বইতেও সেরকম কোনো উল্লেখ নেই। অনেকেই বলেন, ১৯৫৮ সালে, চ্যাংড়িপোতা স্টেশনের নাম পরিবর্তিত
হয়ে সুভাষগ্রাম হওয়ার নেপথ্যে, এলাকায় সুভাষের পৈতৃক ভিটে হওয়াটাই মুখ্য কারণ ছিল।
এছাড়াও সুভাষের স্থানীয় বিপ্লবীদের সঙ্গে
গোপন সভা বা যোগাযোগ ইত্যাদি রাখার কথিত ইতিহাসেরও একটা ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে
করা যেতে পারে।
কিন্তু ১৯৫৮ র নভেম্বর মাসে স্টেশনের নাম পরিবর্তন হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯৭ এ
সুভাষের জন্মশতবর্ষে, খোদ প্লাটফর্মের ওপর নিয়মবহির্ভূত ভাবে কিভাবে নেতাজীর
পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপিত হোল, সে আর এক গল্প। পরে এক দিন হবে ক্ষণ।






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন