সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাবুঘাট, বঙ্কিমচন্দ্র, দিগম্বর সন্ন্যাসী ও মকর সংক্রান্তি !

বলা হয় গঙ্গা সাগর যাওয়ার পথ নাকি বাবুঘাট হয়েই যায় আদি গঙ্গা বা পৌরাণিক কাহিনীর সত্যাসত্য ইত্যাদি বিতর্ক সরিয়ে রাখলে, এইটুকু অন্তত বলাই যায় যে, সগর বংশধর ভগীরথ এই পথেই পূণ্য সলিলা জাহ্নবীকে পাহাড় থেকে সমতলে আনয়ন করেছিলেন যদিও গঙ্গা সাগর থেকে প্রত্যাগমনের পথ কিভাবে দিকভ্রষ্ট হয়ে বঙ্গোপসাগরের এক অচেনা মোহনা, রসুলপুর নদীর সাগর সঙ্গম তটে গিয়ে উপস্থিত হয় তা সাহিত্য সম্রাট তাঁর 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসে দেখিয়েছেন 'কপালকুণ্ডলা' প্রথম অধ্যায় 'সাগর সঙ্গমে' দিকভ্রান্ত হওয়ার সেই রোমহর্ষক বর্ণনা রয়েছে পৌষের শেষ এবং মাঘের শুরুতে, সাধারণত প্রবল কুজ্ঝটিকার কারণে এমন বিপত্তি প্রায়শই ঘটতো সেসময় তখন জলপথেই পৌঁছতে হতো গঙ্গাসাগর কিন্তু এখন সময় বদলেছে তবে গঙ্গা সাগরের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের গাঁটছড়া ছিন্ন হয়নি এখনো; আজোও বাবুঘাটে অবতরণ করা প্রত্যেক সাগর যাত্রীকেই তাঁর বিশালকায় মর্মর মূর্তির সমীপবর্তী হতে হয় একবার স্ট্যাচুর পাদদেশে বড়বড় করে লেখা - ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, পূণ্যস্নানে আগত অগণিত ঋষি মুণি সাধুদের পরম স্বস্তির বার্তাবহ কিনা কে জানে


বাবুঘাটে, কল্কে মুখে সাধু! 
পাশেই সরকারি ব্যবস্থাপনায়, সাধুদের জন্যে বাঁশ ত্রিপলের প্রচুর অস্থায়ী আখড়া বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মকর সংক্রান্তির পূণ্য স্নানের কয়েকদিন আগে থেকেই, সাধুরা বাবুঘাট সংলগ্ন নানা স্থানে এসে তাঁদের ঘাঁটি গাড়েন। শ্মশ্রুমন্ডিত, জটাজুট ধারী সাধুদের দেখতে ভিড় জমান ভক্ত থেকে সাধারণ রসিক মানুষজন। স্নানযাত্রার পরেও কয়েকদিন থাকেন তাঁরা।

বাবুঘাটের খণ্ড চিত্র!   

চাল কলা, তিল সহ নগদ টাকা কিংবা কম্বল বা পরিধানের বস্ত্র দিয়ে সাধুদের প্রণাম করার হিড়িক বেশ চোখে পড়ার মতো। বিহারের ভাগলপুর থেকে আসা এক সাধু বাবার সামনে অবশ্য দেখি কয়েকটা মাত্র ছোট ছোট বিস্কুটের প্যাকেট আর খানকয়েক সিঙ্গাপুরী কলাই পড়ে আছে দান সামগ্রী হিসেবে। বিশাল লম্বা জটা তাঁর, কয়েকবার গুটিয়েও নেমে এসেছে পা অবধি। জিজ্ঞাসা করতে বললেন, চল্লিশ বছরের দীর্ঘ সাধনার ফল এই জটা।


দীর্ঘ জটাধারী সাধু!

বেশিরভাগই অবাঙালি সাধু এবং বয়সে সকলেই বেশ প্রবীণ। শীর্ণ চেহারা, কোটোরাগত চোখ, বয়সের ভারে জীর্ণ। সাধুদের দেশ ভারতবর্ষে কি তাহলে আগামী দিনে সাধুর আকাল দেখা দেবে!

তবে একজন যুবা সাধুও দেখলাম, লাল ধুতি এবং উত্তরীয় পরা, সে আবার বাঙলাভাষী, ক্রমাগত শিঙ্গা ফুকে চলেছেন আর থেকে থেকে হর হর মহাদেব বলে গম্ভীর আওয়াজ তুলছেন।


শিঙা ফোঁকা বাবা!

বেশিরভাগ সাধুদের হাতেই ময়ূরের পালক গোঁজা আশীর্বাদী বাড়ী। অবনত ভক্তের মাথায় নিরন্তর তা ঝেড়ে ঝেড়ে মঙ্গল বারি ঢেলে চলেছেন তাঁরা। বাঘ ছালের মতো দেখতে কাপড় পরা এক সাধু এবারে বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাকি সাধুদের ন্যায় কৃশকায় নন তিনি। বেশ নধর, পেছন থেকে এক ছোট্ট ছেলে, তাঁর পাকা চুল ধরে টান দিলে, ভেবেছিলাম কুপিত হবেন। না, বরং বাচ্চাটাকে কোলে বসিয়ে দেখলাম আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। প্রচুর মানুষ সাধু দর্শণে এসেছেন। কেউ কৃপা প্রার্থী, কেউ বা শুধু ক্লিক প্রার্থী। ছাই ভস্ম মাখা দিগম্বর সাধুরাও, ছবি দেওয়ার ব্যাপারে কুন্ঠিত নন একেবারেই। কেউ গাঁজার কল্কে মুখে পোজ দিচ্ছেন তো কেউ ডমরু হাতে। সাধ্বী মায়েরাও কম নেইতাঁদের আখড়ায় ভক্ত সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কোথাও আবার চলছে লোকগীতির জম্পেশ মজলিশ, 'ধন্য ধন্য, বলি কারে'

প্রায় প্রত্যেকের আখড়ার সামনে দেখলাম ইঁটের ওপর মাটি লেপা অগ্নি কুন্ড, পাশে শিব, কালী,বা মা তারার বাঁধানো ফটো; চাইলে পোড়া কাঠের ছাই কপালে তিলকের মতো এঁকে দিচ্ছেন সাধুরা। চলছে স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ভান্ডারার ব্যবস্থা ‌, খিচুড়ি, চা জল দানের বিস্তর আয়োজন।

এই সবই দেখছিলাম ঘুরে ঘুরে, হঠাৎ পাশ থেকে এক বয়স্কা মহিলা একটা কার্ড হাতে ধরিয়ে বললেন, এতে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা রয়েছে। ইতস্তত করছি নেবো কি নেবো না..., বললেন চিন্তা করবেন না, সত্য যুগ সমাগত প্রায়, কলি যুগ সমাপ্ত ঠিকানা দেখে চলে আসুন আপনার কাছাকাছি কোনো সেন্টারে। আরোও জানতে পারবেন।

মনে পড়ে গেল, স্বামীজী তো সেই কবে, ১৮৯৫ সালেই গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দ কে (শশী মহারাজ) লেখা একটি চিঠিতে বলে গেছেন, "রামকৃষ্ণাবতারের জন্মদিন হইতেই সত্যযুগোৎপত্তি হইয়াছে।'

যাই হোক, সত্যযুগ শুরু হোক না হোক, সূর্যদেব কিন্তু ছাগল মাথা এবং মৎস্য পুচ্ছ বিশিষ্ট বিশেষ আকৃতির নক্ষত্র পুঞ্জ - মকর রাশিতে প্রবেশ করে তাঁর উত্তরায়ণ যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। উত্তরায়ণ মানে দেবতাদের দীর্ঘ ছয় মাস ব্যাপী যোগ নিদ্রা যাপনের কাল শেষ হওয়া। কারণ মকর সংক্রান্তির পরে স্বর্গে রাত শেষ হয়ে, শুরু হবে দিন, সূচনা হবে জেগে ওঠার পালা।

তাই মকর সংক্রান্তির পূণ্য স্নান এত তাৎপর্যপূর্ণ।

পরিশেষে বলি, শুরু করেছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রকে দিয়ে, শেষও করতে হবে সেই সেই বঙ্কিম চন্দ্র কে দিয়েই। তবে এবার শিব মস্তকে শোভা পাওয়া, বঙ্কিম চন্দ্রযেখান থেকে নির্গত গঙ্গা, তাঁর মকর বাহনে উপবিষ্ট হয়ে উচ্ছল গতিতে বয়ে চলেছেন সাগর সঙ্গমে, অবশ্যই ভায়া বাবুঘাট হয়ে!


বাবুঘাটের আরও খণ্ড চিত্র! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আখ্যায় ভূষিত করেছেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘ...