বিদ্যার দেবী হিসেবে, বাংলায় সরস্বতীর সাম্রাজ্য যতটা
নিরঙ্কুশ, মন্দিরের ক্ষেত্রে ততটা নয়। বাঙালীর
সরস্বতীর প্রতি যাবতীয় ভক্তি, কেবলমাত্র বসন্ত পঞ্চমী দিনটির জন্যেই বরাদ্দ; বছরের
বাকি দিনগুলিতে আর সরস্বতী আরাধনায় তার মন থাকে না। সেই কারনেই হয়তো সরস্বতীর
নিত্য পূজা কল্পে, মন্দির নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে না বাঙালীর। যে কারনে হাতে খড়ি পড়া থেকে শুরু করে স্কুল,
কলেজ, লাইব্রেরী, বিশ্ববিদ্যালয় এর সর্বোচ্চ স্তরের পড়ুয়াদেরকেও বাগদেবীর কৃপা
লাভের আশায় সম্বৎসরে রীতিমত উপোস করে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়; একপ্রকার - বীণাপাণির
আরাধনায় ঢল নেমে যায় চতুর্দিকে। কিন্তু পরের দিন ঘট বিসর্জন সহ প্রতিমা
নিরঞ্জনের পালা একবার শেষ হয়ে গেলে আর পাত্তা থাকে না কারোর। বাকি সারাবছর আর সরস্বতীর কৃপা প্রার্থনার প্রয়োজন কেউ অনুভব করে না। এই কারনেই হয়তো, পাড়ায় পাড়ায় যে হারে শিব, কালী বা শীতলা এমনকি
সর্প দেবী মনসারও পর্যন্ত মন্দির গড়ে উঠেছে, সে ভাবে সরস্বতীর মন্দির তৈরি হয় নি।
তা কেবল দুটো একটাতেই সীমিত। এদের মধ্যে
প্রাচীনত মন্দিরটি রয়েছে হাওড়া জেলার পঞ্চাননতলায়, ১৯১৯ সালে রাজস্থান থেকে একটি
সরস্বতী মূর্তি নিয়ে আসেন রনেশ চন্দ্র দাস, তাঁর বাবা শিক্ষক উমেশ চন্দ্র দাসের
একান্ত ইচ্ছা ছিল বাড়িতে একটি সরস্বতী মন্দির স্থাপনের, কিন্তু তিনি তা করে যেতে
পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯২৩ সালে স্নান যাত্রার দিনে মন্দিরটি উদ্বোধন হয়। এখন তার
বয়স ১০২ বছরেরও বেশী। নিয়ম করে বছরের ৩৬৫ দিনই নিত্য পূজা হয় এখানে। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এই হাওড়া জেলাতেই আর
একটি সরস্বতী মন্দির স্থাপিত হয়েছে বলে খবর। ২০১৬ সালে, হাওড়ার উদয়নারায়নপুরের
খেমপুর গ্রামে, জনৈক সুশীল জানার বাড়িতে এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে বলে সংবাদে প্রকাশ। সুশীল জানা,
সরস্বতীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির নির্মাণে উদ্যোগী হন।
এই নিবন্ধে বিশেষ করে আজ আমরা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর, কাঁথির - প্রান কেন্দ্রে গড়ে ওঠা সরস্বতী মন্দিরটিকে নিয়েই বিশদে আলোচনা করবো। বাংলার
হাতে গোণা যে কটি সরস্বতী মন্দিরের কথা এখনো পর্যন্ত সর্বজনবিদিত, তাদের মধ্যে
কাঁথির সরস্বতীর মন্দিরটি প্রাচীনতার দিক থেকে দ্বিতীয়। দালান শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরটি, কাঁথি শহরের
হাতাবাড়ী মৌজায় অবস্থিত। বলাই বাহুল্য মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলটিকে এই কারণে সরস্বতীতলা বলা হয়।
প্রচ্ছদের সরস্বতীর মূর্তিটি, কাঁথির সরস্বতী মন্দিরের। সরস্বতী পুজা উপলক্ষে মন্দিরে বিশেষ পুজানুষ্ঠানের
আয়োজন হয়। মর্মর মূর্তিকে সাজানো হয় বিশেষ বাহারী ফুল এবং মালায়।
প্রসঙ্গত মন্দিরের গাত্রস্থিত ফলক অনুসারে, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় মন্দিরটি। অর্থাৎ ইংরেজি, ১৯৩৯ সাল। তখন অবশ্য মন্দিরের দেওয়াল ছিল মাটির এবং মাথায় ছিল খড়ের চালা। কিন্তু তিন বছর পরে অর্থাৎ ১৯৪২ এর অক্টোবর মাসে হওয়া বিধ্বংসী ঝড়ে (কাঁথির ঝড় বলে খ্যাত) মন্দিরটি পুরো ভেঙে যায়। তারপরে তৈরি হয় বর্তমান মন্দিরটি। দালান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত
মন্দিরের শীর্ষদেশে সুদৃশ্য সিংহবাহিনী চূড়া দেখা যায়; চুন সুড়কির এই মন্দিরটির বর্তমানে প্রায় আশি বছরের বেশী বয়স। এবং বয়সের ভারে
তা বেশ জরাজীর্ণ।
উল্লেখ্য, কাঁথির এই সরস্বতী মন্দিরটি নির্মাণের পেছনে জনৈক আইনজীবী তপন কুমার মাইতির অবদান স্মরণীয়। রাজস্থানের পুষ্কর ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার সরস্বতী মন্দির দেখে, বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত হন তপন বাবু। এবং যথারীতি কাঁথি
ফিরে বন্ধু আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে একটি সরস্বতী মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শুধু তাই নয়, মন্দির নির্মাণ কল্পে বর্তমান জায়গাটিকে কাঁথি_সিভিল_বার_অ্যাসোসিয়েশনের নামে দান করে দেন। বলাই বাহুল্য মন্দির এবং মন্দিরের সামনের বিশাল প্রাঙ্গণের বর্তমান মালিক কাঁথি_সিভিল_বার_অ্যাসোসিয়েশন। বার অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে, বর্তমানে মন্দিরে নিত্য পুজা ছাড়াও সরস্বতী পুজোর দিনে আয়োজিত হয় বিশেষ পুজো ও হোম যজ্ঞের। পূর্বে, সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যায় আয়োজিত হতো সদস্য আইনজীবীদের দ্বারা অভিনীত বিশেষ যাত্রানুষ্ঠান। এখন যাত্রা না হলেও আতস বাজী পোড়ানো হয়।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরস্বতী মুর্তিটি ১৯৮৬ সালে রাজস্থানের জয়পুর থেকে আনানো হয়, তখনকার বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মনোজ কুমার রায়ের বিশেষ উদ্যোগে। প্রায় চার ফুট উচ্চতার এই মূর্তিটি সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরের তৈরি। মর্মর এই মূর্তির চোখে মুখে
বিচ্ছুরিত হয় শুক্লা পঞ্চমীর দিব্য বিভা। চূড়ায় থাকে সুশোভিত রত্ন সজ্জা, পেছনে উত্থিত থাকে বৃত্তাকার বিভা
মণ্ডলী। দেহ বিভঙ্গে নির্ঝরিত হয় সঙ্গীত সাধিকার সুশোভন দীপ্তি। দেবী এখানে দ্বি-হস্ত বিশিষ্ট; যার বাম হস্তে শোভা পায় বীণা আর ডান হাতে থাকে আশীর্বাদ প্রদান ভঙ্গিমা!
বিঃ দ্রঃ - কাঁথির সরস্বতী মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তথা বর্তমান পূজা আয়োজন নিয়ে, মন্দিরের ২০২৫ সালের -, পূজা পরিচালন সমিতি তথা কাঁথি সিভিল বার অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সম্পাদক শ্রী শুভদীপ বেরার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত হয়েছে উপরের প্রবন্ধটি।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন