আসলে ভুলটা হয়েছিল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে।
শিয়ালদাহ সাউথ শাখায় বেশ কয়েকদিন ধরে বিকেল ৩ টে ২ এর বারুইপুর লোকাল - ১৮ নং
প্লাটফর্ম থেকে ছাড়ছিল, সেদিনও যথারীতি ১৮
নম্বরে রাখা গাড়িতেই তাই উঠে বসেছি, নিত্য যাত্রী বলে কথা। ইতিমধ্যে জানালার ধারে ইপ্সিত
জায়গায় বসতে পেরে হালকা করে গা এলিয়েও দিয়েছি সিটের গায়ে। তখনও ট্রেন ছাড়তে ৭
মিনিট মত বাকি। আধ ঘণ্টার যাত্রা পথ, তাই সত্বর নামার চিন্তা নেই। মে মাসের
প্রচণ্ড গরম, ট্রেনের টুই দ্বিধাহীন ভাবে তেতে লাল, এমত অবস্থায় সিটের মাথায় চলা ফ্যানগুলো
আর ঠাণ্ডা হাওয়া পাবে কোত্থেকে, গরম হাওয়াকেই তাই নির্বিচারে পরিবেশন করে যাচ্ছে
যাত্রীদের মাথায়। মাঝে মাঝে পূব দিক থেকে ঈষৎ ঠাণ্ডা হাওয়া ফুরফুর করে
জানলা দিয়ে ঢুকলে কী যে গদগদ ভাব লাগছে, মনে হচ্ছে আহা, এই তো এলে এখনি প্লিজ
বিদায় বল না। ইতিমধ্যে পাশে একজন মাঝবয়সী লোক বসে মশলামুড়ি
খাচ্ছেন, কাঁচা লংকা ফ্যাচর ফ্যাচর করে চিবিয়ে একেবারে কান মাত করে ফেলছেন। একবার
ট্রেনে উঠলেই নাকি বেশীরভাগ মানুষের ভ্যাগাস নার্ভ সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্লাটফর্মের
মাঝখান দিয়ে তাই এত সার বেঁধে খাওয়ার দোকান! শিব ঠাকুরের ডমরুর মত দেখতে পেঁচানো
মড়ার ওপরে রাখা লাল শালু মোড়া ঘুগনির হাঁড়ি হোক কী খোপ কাটা কাঠের বাক্সের মধ্যে
ঝাল মুড়ি তৈরির সাত সতেরো। ট্রেন যাত্রীদের খিদে মেটানোর একেবারে দমদার ইকোনমিক আয়োজন। কোথাও ছোট ছোট শোকেসে রাখা হাফ
পাউণ্ড পাউরুটির গাদা, সঙ্গে সস্তার নানা মিষ্টির পসরা, কোথাও বা মুড়ি ভর্তি ঢাউস
সাদা প্লাস্টিকের বস্তা রাখা, পাশে স্টিলের ক্যানে মুড়ি আর আঁচার তেল ইত্যাদি
মাখার ব্যস্ততা, থেকে থেকে ক্যানের মাথায় চামচ ঝাড়ার ঠং ঠং শব্দ কোন জ্যাজ গানের
বিটসের চেয়ে কম জাদুকরি নয়। নিত্য যাত্রীদের কাছে এদের প্রত্যেকের মুখ বড় চেনা,
এরাও তাঁদেরকে চেনে আপনজনের মত। ফেরার ট্রেন ধরার আগে একবার শুধু সামনে গিয়ে
দাঁড়ালেই হল, শাল পাতার ঠোঙ্গায় ঠিক এক বাটি ঘুগনি আর একটা টাটকা ডিমের সেদ্ধ সাজিয়ে
হাতে ধরিয়ে দেবে।
ইতিমধ্যে ট্রেন ছাড়বো ছাড়বো করছে, গেটের কাছে দাঁড়িয়ে এক চুরকো দাঁড়ির ছেলে তার
সঙ্গীকে ডেকে একেবারে গলা চিরে ফেলছে, “এয় সম্বন্ধি, শিগগির আয়...”। ওদিকে বন্ধুটি
তখন পাকা আম কিনতে ব্যস্ত। ডাক শুনে, চটপট
করে সেগুলিকে প্লাস্টিকের থলের মধ্যে ঢোকাতে গিয়ে প্রায় নাস্তানাবুদ হওয়ার অবস্থা
তার। দেখে শুনে জল জিরে যিনি বিক্রি করছেন, তিনি আবার
পাশ থেকে আওয়াজ দেন, “ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে কিন্তু, তাড়াতাড়ি যান।“ প্রায়শই ফেরার সময় এখান
থেকে ফল নেই, বাখারির ঝুড়িতে কলা পাতা বিছিয়ে তাতে আপেল মুসুম্বি আঙুর কিংবা ডাঁসা
পেয়ারা যখন যেমন পাওয়া যায় তখন তেমন সাজানো থাকে। বেশ সস্তাও হয় একটু। এখন
আমের সময়, তাই আম তুলেছে। প্লাটফর্মে ট্রেন না থাকলে যখন লোকজন কম থাকে, তখন
কাঁধের গামছা দিয়েই আপেলের গা গুলোকে মুছে চকচকে করে রাখেন দোকানদার। চেনা খরিদ্দার দেখলে ডেকে
বলেন, “নিয়ে যান, মিষ্টি গ্যারেণ্টি”।
গাড়ি চলা শুরু হতেই, ভ্যাপসা এক দঙ্গল উষ্ণ হাওয় নাকে মুখে এসে হামলে পড়ে। দুদিকে জমজম
করে চলা বিকিকিনির হাটও ধীরে ধীরে পেছনের দিকে হাঁটা দিতে শুরু করে। পাঁচমেশালি
চানাচুরের দোকানে ডাই করা নিমকি, সবুজ মটর, চীনেবাদাম ইত্যাদির মাঝে দাঁড় করানো সরু
খাঁচির মাথায় বাঁধা রঙিন কাগজের চরকি ঘুরতে থাকে বনবন করে, মা তার কোলের বাচ্চাকে আঙুল
উঁচিয়ে ট্রেনের চলে যাওয়া দেখায়। চেনা, নিত্য যাতায়াতের পথ; স্টেশন থেকে বেরিয়ে,
লাইনের দুদিকে লাল ইটের রেল কোয়ার্টার গুলো কিংবা তাদের বেড়া দেওয়া চৌহদ্দির মধ্যে
ফল ধরা আম পেয়ারা বা আশ ফলের গাছ গুলো বেশ নজরে পড়ে। পেকে ওঠা আমের লাল হলুদ, মে মাসের কঠিন দাবদাহকেও এক নিমেষে ভিজে জল করে ফেলে। কিন্তু এর থেকেও, ১৮ নং প্লাটফর্মের মুখে বিক্রি
হওয়া মিঠে কড়া আমের আমোদ কিঞ্চিৎ বেশীই। বিশেষ করে হাসনাবাদের রাজবাড়ীর সেই বিখ্যাত
কাঁচা মিঠে আমের কদর তো অসামান্য, শিয়ালদহ স্টেশনের ফলওয়ালার ঝুড়িতে এই সময় একেবারে
রাজকীয় মর্যাদায় শোভা পায় এটি। কলা পাতা
বিছানো বৃত্তাকার ঝুড়ির ওপর সাজিয়ে সারাবছরই নানা ধরনের সিজন ফল বিক্রি হয় এখানে।
কখনো কোঁদ বেল, জলপাই, রসালু; তবে শশা পেয়ারা বা পাকা পেঁপে ইত্যাদি ফলগুলো সবসময়ের জন্যে কমন। এখানকার
বিশেষত্ব হোল, আগের থেকে কিছু কাটা থাকে না, বললে আপনার সামনে কেটে দেবে। অনেক উৎসাহী যাত্রী আবার পুরো দৃশ্যকে, সে ফলের
খোসা ছাড়ানো থেকে শুরু করে তাকে কেটে শাল পাতার বাটিতে নুন মশলা সহ পরিবেশন করা
ইস্তক পুরো প্রক্রিয়াটিকে মোবাইলের ক্যামেরায় ধরে রাখে। অর্থাৎ কেনা আর রিল বানানো
একসাথে হল।
কিন্তু শিয়ালদহ স্টেশন লেখা মস্ত বড় সিমেন্টের খোদাইটি তো আজও সমান গৌরবে স্টেশন বাড়িটির মাথায় উত্থিত রয়েছে। পাশে লাল রঙের বিশাল বড় ডিজিটাল ঘড়িটাও রয়েছে তার আগের মর্যাদায়। সময়ের কাঁটার অনন্ত প্রবহমান স্রোতে, দুপুর ১৪ টা ৫০ সংখ্যাটি সেখানে শুধুই একটি জায়মান প্রহর হয়ে কিছু সময়ের জন্যে ফুটে ওঠে প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে। সেদিকে তাকিয়ে না তাকিয়ে, হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ কিংবা এলোমেলো হয়ে একটা নিরবিচ্ছিন্ন ভিড়ের অংশ হিসেবে একে একে ঢুকে পড়ে স্টেশন বিল্ডিংটির মধ্যে। মে মাসের প্রচণ্ড প্রখর রৌদ্রে যেন শিয়ালদহ স্টেশনের সামনে অত বড় উন্মুক্ত প্রাঙ্গনটি আজ কুল অফ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাঁক ডাক হীন, হেঁটে যাওয়া এক জনস্রোত, যার গর্জনটি কেবল মিউট করা আছে।
এদিকে বোর্ডে লেখা ফুটে উঠেছে, বিকেল ৩ টে ২ এর বারুইপুর লোকাল ১৮ নং প্লাটফর্ম থেকেই ছাড়ছে। সময় নেই, পা চালিয়ে অগ্রসর হই। ভেতরে দুটো একটা বাঁধাই চা স্ন্যাক্সের স্টল ছাড়া আর কিছুই নজরে আসে না। তাদের সুদৃশ্য কাঁচের শোকেসে প্যাটিস পিৎজা ছাড়াও নানা কিসিমের কেক সাজানো থাকে, গায়ে লাগানো থাকে দামের স্টিকার, তবু মানুষগুলো বড়ই উদাসীন, কোলাহল হীন ভাবে হেঁটে যায় কাঁচ বন্দি স্ট্যাচুর মতন। বাইরের আর ভেতরের অনাগত শব্দ গুলো যেন নিজের গরজেই আজ কাঁচের ঘেরাটোপ বন্দি হয়ে থাকতে চাইছে। প্লাটফর্মের দুদিকে চলা দরাদরি, বিকিকিনি আর তার সাথে গন্তব্য এবং যাত্রা শুরুর ফাঁকে ফাঁকে চলা জীবন ও জীবিকার যৌথ যাপন শুধু মিসিং। না, পথ ভুল করিনি আজ...।। এটাই হওয়ার ছিল।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন