সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জগন্নাথের রথযাত্রা ও লক্ষ্মীর বিরোধ!

ঝিপ ঝিপ করে বৃষ্টি পড়ছে আর তার মাঝেই জগন্নাথ দেব দাদা বলরাম তাদের আদরের বোন সুভদ্রাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন মাসী গুন্ডিচার বাড়ির উদ্দেশ্যে! গ্রামে গঞ্জে এখন চাষাবাদের মরসুম; লাঙল দেওয়া, ধান রোপণ করা ইত্যাদি এখন সবার আগে, এর মধ্যে হলধর বলরামের মাসির বাড়ি ঘুরতে যাওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে বিলকুল প্রশ্ন উঠতে পারে। কথা ঠিক, এখন দিন বদলেছে, চাষের কাজে বলদ কিংবা হাল প্রভৃতি বস্তু গুলো এখন ওই অভিধানের পাতাতেই টিকে আছে। বাস্তবে এদের অস্তিত্ব ওই ঢেঁকি কিংবা ঢেঁকি ছাঁটা চালের মতই অর্থহীন। 


রথারূঢ় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা

তবে একটা গল্প আছে, ভগবান কৃষ্ণের পরলোকগতির সঙ্গে সঙ্গে দ্বাপর যুগের অবসান এবং তৎপরবর্তী কালে কলির সূচনা হয় বলে কথিত, সেখানে জগন্নাথ দেবের উদ্ভব যেহেতু ভগবান কৃষ্ণের অদাহ্য দেহাবশেষ তথা পবিত্র দারু ব্রহ্ম থেকে হয়েছে বলে শাস্ত্রকারেরা বলে গেছেন তাই জগন্নাথ দেব যে একান্তই কলির দেবতা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এখানেই এক অবধারিত টুইস্ট চলে আসে মনে, কারণ কলির অলি গলি থেকে ধুলো বালি সবই তো টুইস্ট নির্ভর, সেখানে প্রভু জগন্নাথ তাঁর বাৎসরিক রথযাত্রায় যে সমাদরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সহ ভগিনীকে নিয়ে বড় দান্ডের পথে বেরিয়ে পড়েন অথচ নিজ পত্নী লক্ষ্মী দেবীকে তাঁর সফরসঙ্গী হওয়া থেকে বিরত রাখেন তাতে স্বাভাবিকভাবেই নতুন মোচড়ের ইঙ্গিত খোঁজা শুরু হয়ে যায়। যদিও বলরাম-পত্নী রেবতী দেবীকেও এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না, কিন্তু জগন্নাথ যেহেতু এই রথযাত্রার কেন্দ্রে রয়েছেন তাই তাঁর সহধর্মিণী মহালক্ষ্মীর অনুপস্থিতি নিয়েই যাবতীয় জল্পনা আবর্তিত হয়। তবে এই জল্পনার পেছনে যে শুধু কলির কেচ্ছা মার্কা গুজব তন্ত্রই দায়ী তা কিন্তু নয়।। কারণ স্কন্দ পুরানেও এর উল্লেখ রয়েছে। তাতে দেখা যায় দেবী মহালক্ষ্মী মোটেই জগন্নাথ দেবের এই যাত্রায় সম্মত ছিলেন না; এমনকি অসন্তুষ্ট মহালক্ষ্মী উল্টো রথের পূর্বেই স্বামীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে রেগেমেগে স্বয়ং মাসীর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।
রথযাত্রার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায়, স্বামীকে খুঁজে ক্রুদ্ধ মহালক্ষ্মীর এই আগমন পর্বকে হেরা পঞ্চমী নামে অভিহিত করা হয়। আষাঢ় মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে প্রতি বৎসর এই হেরা পঞ্চমী উৎসব পালিত হয় মাসী গুন্ডিচার বাড়িতে। কথিত আছে লক্ষ্মী দেবী সেদিন সুবর্ণ লক্ষ্মী রূপে একটি পালকিতে চড়ে আবির্ভূত হন এবং রীতিমতো জগন্নাথের কাছে এসে কৈফিয়ত চান, কেন তিনি এতদিন মাসীর বাড়িতে এসে থেকে গেলেন বা আরোও কতদিন থাকবেন ইত্যাদি নিয়ে। বলাই বাহুল্য শুধুমাত্র এই কটি হুকুম জবাবেই কিন্তু ব্যাপারটা থেমে থাকে না, কারণ লক্ষ্মীর কথা মতো তখনই ফিরে যেতে রাজি হন না জগন্নাথ দেব আর তাতেই আগুনে ঘি পড়ে। শেষ পর্যন্ত দাম্পত্য বিরোধ এমন এক চুড়ান্ত আকার ধারণ করে যে রুষ্ট লক্ষ্মী দেবী তাঁর এক অনুচরকে দিয়ে পর্যন্ত স্বামী জগন্নাথের কথিত রথযান নান্দীঘোষের একটা অংশকে সম্পুর্ন রূপে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন
প্রসঙ্গত রথযাত্রা থেকে উল্টো রথ অবধি দীর্ঘ ' দিন ব্যাপী জগন্নাথ দেবের এই মাসীর গৃহ অবস্থান পর্বে হেরা পঞ্চমী একটি উল্লেখযোগ্য আচার হিসেবে পালিত হয প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে। মন্দিরের নিত্য পূজারীরাই লক্ষ্মী, জগন্নাথ বা বলরামের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নকল ঝগড়ার আসর বসান, দাম্পত্য কলহের রস নিতে উৎসাহী মানুষের ভিড় জমে যায়।
শোনা যায়, ওড়িশার পুরীতে রাজা কপিলেন্দ্র দেবের সময় থেকে নাকি এই হেরা পঞ্চমী পালনের চল শুরু হয়েছে।

তবে সে যাই হোক না কেন, স্বামী স্ত্রীর এই লড়াইয়ের মাঝে জনগন কিন্তু একেবারেই বিব্রত বা বিচলিত নন, তাঁরা ঠিক কাছিতে টান দিয়ে তাদের প্রিয় কালোসোনা জগন্নাথকে তাদের অতিথি হিসেবে বরণ করে আনেন, তাতে লক্ষ্মী ক্রুদ্ধ হলেন বা না হলেন সে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখা যায় না। আসলে আম জনতার মনে আজোও জগন্নাথের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নহীন। যার প্রমাণ ফি বছর এই কথিত জুলাই যাত্রার দিনটিতে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত সে কারণেই লক্ষ্মী দেবীর অমন কঠোর আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা ধোপে টেঁকে না। জগতের নাথ জগন্নাথ শেষমেশ নেমে আসেন রাস্তায়, সাধারন জনগনের মাঝে। প্রবল হর্ষ ধ্বনি আর অভিবাদনের মাঝে এগিয়ে চলেন রথারূঢ় হয়ে। প্রমাণিত হয় কলিতে জন উচ্ছ্বাসের চেয়ে আর বড় কিছু নেই।  
বলা বাহুল্য জন ভিত্তি প্রদর্শনের দৌড়ে জগন্নাথ যে লক্ষ্মী সহ অন্য যে কোনো দেবদেবীর চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে তিনি সেদিন দেখিয়ে দেন; সে বাঙালী তাঁকে যতই ঠুঁটো জগন্নাথ বলে দাগিয়ে দিক না কেন, গলি থেকে রাজপথে আর কে রয়েছেন যিনি এক ডাকে এত মানুষকে জড়ো করতে পারেন। তাই মহালক্ষ্মীকেও শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছাকেই মর্যাদা দিতে হয়। এবং ইচ্ছা না থাকলেও স্বামীদেবকে এই কয়দিনের জন্যে কাছছাড়া করতে বাধ্য হন তিনি।
কলির জন কল্লোলের কাছে এইভাবেই হয়তো দেব নর সকলে নিরূপায়। আপনারা কী বলেন!


ছবিগুলো কাঁথির প্রাচীনচম রথযাত্রা উৎসব দারুয়ার রথের মেলা থেকে নেওয়া, ক্যামেরাবন্দি করার কৃতিত্ব আমার ভাইঝি দেবাংশীর

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...