এই পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম এবং একমাত্র নিখাদ মৌলিক সৃষ্টির নাম হলো আলো, যার নেপথ্যে রয়েছে নিদারুণ দহনের ইতিহাস। বলা যায়, আলো আগুনের সহজাত; অর্থাৎ স্রষ্টা একইসাথে দাহ্য এবং আলোক বিকিরণকারী। নিজেকে অকাতরে পুড়িয়েই সে জন্ম দেয় অকুতোভয় আলোক ধারা কে। যার অকপট ছোঁয়ায় সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে এ জগৎ জীবন সংসার। আলোর আত্মপ্রকাশ তাই ধরিত্রীর এক অতি নাটকীয় বিস্ময়, এক অলেখকের মহাকাব্যিক আলেখ্য প্রনয়নের গল্প।
আলো হয়তো অবতার, তার মহা প্রতাপশালী রশ্মি রূপ অপরিমেয় দুর্দম গতিতে ছুটে আসে ধরার বুকে জমে থাকা আঁধারের রাজ্যপাট ভেঙে নিরাধার করে দিতে! আলোর গতিবেগ কল্পনার মতোই তীব্র এবং বিচিত্রগামী; দহন যত যন্ত্রনার, আলোর বিস্তার তত সুদূরপ্রসারী।
কতটা ভয়ঙ্কর সূর্যের জ্বলন যে তা ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে থেকেও তার স্ফুলিঙ্গ স্রোত এসে পড়ে ভূপৃষ্ঠের সমুদ্র পাহাড় মালভূমি থেকে সমতলে!
প্রতিদিন সকালে সাইকেলে চড়ে আলো দি আসেন খবরকাগজ দিতে, এই আলো বাড়ির একমাত্র উপার্জনকারী, স্বামী মারা গেছেন অকালে, দুই মেয়ে এক ছেলের ভার এখন তাঁর কাঁধে, ঝড় বৃষ্টিতেও কোনো ছাড় নেই, কেমন আছেন - জিজ্ঞাসা করলেই চোয়াল শক্ত করে বলেন, যন্ত্রনার শেষ নেই। বুঝতে পারি এ অপরিসীম দহন কোনোদিন পুঞ্জিত আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে এই আশাতেই তিনি আজ এত অদম্য।
তাই আলোর উৎস যদি দহন স্থল হয়, তার আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য তবে প্রতিফলিত হতে চাওয়ার মধ্যে পরিস্ফুট হয়। আমরা জানি, জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আলো, কিন্তু আলোর শর্ত? অবিমিশ্র দহন আর প্রতিফলকের অবিকল্প প্রতিবন্ধকতা লাভ। অর্থাৎ যন্ত্রনার অনলে নিরন্তর পুড়েও যেন নিস্তার নেই, চাই বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার দুর্গতিও। তবেই ফুটে উঠবে রোদ বৃষ্টির চালচিত্র, মূর্ত হয়ে উঠবে পাকা ধান ক্ষেতের মাঝে একা শুয়ে থাকা সরু আলপথের নিসর্গ চিত্র কিংবা গহন অরণ্যের বুকে শ্যাওলা পড়া সবুজ জমিনের বিয়োগান্তক পদাবলী।
আলো কী তবে প্রকাশ নাকি প্রকাশক? বাতাসের অক্সিজেন যেমন নিজে না জ্বললেও অপরকে জ্বলতে সাহায্য করে, আলোও তেমনি স্বয়ং প্রকাশ নয়, তবে অনন্য প্রকাশক। যেমন তুলির আঁচড় বা ভাস্করের ছেনিহাতুড়ি কিংবা কবির লেখনী। এ সবের পেছনে অবশ্যই থাকে মননের অক্লান্ত দহন, যার বিভায় ফুটে ওঠে ভূপৃষ্ঠের উঠোনে পাতা সেই শীতলপাটির ছবি, যেখানে সুখ দুঃখের সংকীর্তন হয়ে চলে সর্বক্ষণ।
ছোটবেলায় একবার দুর্গাপূজায় ছুটি পড়ার দিন, ক্লাসে অবনী মাস্টারমশাই এসে বললেন, টানা এক মাস ছুটি, অনেকটা সময় হাতে রয়েছে। তা তোরা শরৎকাল নিয়ে একটা রচনা লিখে নিয়ে আসিস তো, স্কুল খুললে দেখবো কিন্তু। সবাই বললো, স্যার কীভাবে লিখবো একটু বলে দেন না। শুনে অবনী বাবু জানালা দিয়ে একবার বাইরের মাঠটার দিকে তাকালেন, তারপরে বললেন, প্রথমেই লিখবি শরতের রোদের কথা, কী সুন্দর বলতো! স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই জৈনু স্যারের কথায় গলা জুড়ে বলে উঠলো, হ্যাঁ স্যার পুরো মায়ের হাঁসির মতো।
ঠিকই, তবে আলো শুধুমাত্র উল্লাসের পরিভাষা নয়, কখনো কখনো চন্দ্রহীনতার বিষণ্ণতায় রাত্রির ইন্দু মুখ যখন অন্ধকারে ঢাকে, তখন রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতেই হয় -
"আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো, এই করেছ ভালো, নিঠুর হে, এই করেছ ভালো"।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন