সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আঃ মরি বাংলা মশা!

মশা মারতে মিসাইল মারা; হয়ে গেল না পুরো অনুপ্রাস! ভারতে একটা শিশু জন্ম হলে কয়েক লক্ষ মশার ঋণ  থাকে তার মাথার ওপরে তবে কত লক্ষ সেটা ঠিক বলা যাবে না, কারণ এ আই - এর কাছেও এই নিয়ে কোনো ডেটা নেই কয়েক কোটি ট্রিলিয়ন কালো, ফরসা, ধূসর, কুচো, ডোরা কাটা, ধুমসো মশক বাহিনী - মাথার ওপরে অহরহ চক্কর কাটছে, যেন শত্রুপক্ষের দ্রোণ বা বোমারু বিমান, জামা কাপড় ঢাকা শরীরের একটুও ফাঁকা স্থান পেলেইসে গৌর শ্যামলা মসৃণ খ্যাংরা তেলতেলে যাই হোক না কেন, মশার চোখে সবই সমান মশার চুষিকাঠি কেবল রক্ত চেনে, সেখানে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় হিন্দু মুসলমান ইহুদী বলে আলাদা কিছু নেই রক্ত উত্তোলনে, মশার হূল একনিষ্ঠ সাম্যবাদী

আবার মশক নিধনের সময়েও উঁচু নিচু ভেদাভেদ থাকে না একবার হূল ফুটলে, অ্যানোফিলিস না কিউলেক্স এই বিচার করবে এমন পরশুরাম এখনো জন্ম হয়নি বিশ্বে। বার তিথি নক্ষত্র যোগ দেখে চপেটাঘাত করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না ঘোরতর অহিংসবাদী, একাদশী ব্রত রাখা মানুষেও মশা মারতে বিলম্ব করে না
মশারাও তেমনি, একদম মরতে ভয় পায় না
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে, তালি পিষ্ট হয়ে জীবন খুইয়ে চলে যায়  সারা দুনিয়ায় এমন আত্মঘাতী বাহিনী আর নেই  সে  নানা পাটেকর যতই বলুন না কেন, এক মাচ্ছর আদমি কো হিজড়া বানা দেতা হ্যায়; আসলে মশা মারার সাফল্য যুদ্ধজয়ের চেয়ে কম কিছু নয় আর মাছি মারলে যদি কেরানী হওয়া যায় তো মশা মারার জন্যে এই রকম তকমা আর বেশী কি!
কারণ ধুপ ধুনো দিয়ে মশার স্নায়ু তন্ত্রকে খানিক বিবশ করে দেওয়া গেলেও, তা ক্ষণস্থায়ী
যতক্ষণ ধুপ ততক্ষণ চুপ তারপরে আবার সেই কুখ্যাত গুঞ্জন আর সেই চিরাচরিত অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার পালা তাই আপন হাতে মশা মারার কৃতিত্বের মত সুখ আর নেই

আঃ মরি বাংলা মশা!
আমাদের পাড়ার বটুকদা, কথায় কথায় নানা চটুল উপমা আর অহেতুক তুলনা টানায় যাকে বলে একেবারে মাস্টার মাইন্ডসেদিন দেখি খুব ভাবুক হয়ে পড়েছেন। ভোম্বলদার বাড়ির রোয়াকে বসে আড্ডা হচ্ছিল, তলায় কালো জল ভরা ড্রেন, পুরো উন্মুক্ত হরমুজ; তাতে কিলবিল করছে মশা। কথাবার্তা চলছে আর তার মধ্যেই উঃ আঃ বলে এর ওর মুখ থেকে এমন আওয়াজ উঠছে যেন মনে হচ্ছে তবলা লহরীতে মুড়কি পড়ছে। এদিকে বটুকদা দেখি চোখ বুজে চুপ করে বসে আছেন, জানি কিছু বিশেষ তানকারি (জানকারি) আসার সময় হয়েছে। শেষে, এল। থাইয়ের ওপরে সজোরে একটা চড় কষেই, বটুকদা ফুলকি মেরে বলে উঠলেন, মোদের নরক, মোদের নাশা, আঃ মরি বাংলা মশা। শোন, এই মশার জন্যে আমি গতকাল, সারা সন্ধ্যা ওঁত পেতে বসেছিলাম বাড়িতে, জীবিত অথবা মৃত – পালাতে দেবো না। কিন্তু কি বলবো, পুরো গরিলা ছকে, আমাকেই উল্টে ছেঁকে ধরলো। বলতে নেই, পৃথিবীর আদিমতম আতঙ্কবাদী যদি কেউ থাকে তো এই মশারাই। অতর্কিতে হানা দিতে এরা পুরো মাস্টার প্রজাতি। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে আছি, মনে হচ্ছে যেন বাঁশবাগানে আত্মগোপন করে আছি।
শত্রুপক্ষের শিবিরে আগুন ধরাতে যেমন বারুদ ভর্তি দ্রোণ পাঠানো হয়, মশার পেটে তেমনি থাকে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া সহ নানা মারক রোগের অনু পরজীবানু। আপনি দিনের পর দিন, ফেসবুকে ছবি ভিডিও ইত্যাদি পোস্ট করে চলেছেন, ৫০০’র বেশী ভিউ হচ্ছে না; সেখানে মশা একবার তার হূল পোস্ট করে দিচ্ছে আপনার শরীরে, ব্যাস পুরো এলাকা ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। মশা বোঝে, এ আই অলগ্যারিদম।
লার্ভা খোর তেলাপিয়া, নায়লনটিকা হয়ে ইলেক্ট্রনিক্স র‍্যাকেট; মশার সামনে সব বিফল কবুতর। মশারি জড়িয়ে তো আর চায়ের ঠেকে বসা যায় না! স্টিলের ফ্লাস্ক থেকে চা ঢালতে ঢালতে, মনাদা ওরফে মনিলাল মণ্ডল বললেন, একটা উপায় আছে। সবার মুখে জিজ্ঞাসা। কি! একমাত্র ঝড় এলেই, এর দৌরাত্ম্য কমতে পারে। কিরকম! বাতাসে ডানা গুলো পটাপট ভেঙে যাবে সজনে ডালার মতন, ব্যাস। সোহাগ চাঁদ কেমনে তুমি ওড় তো দেখি। ধুস, ও আবার হয় নাকি, মশার ব্রেনও এখন জেন নেক্সটে পৌঁছে গেছে। দেখছো না কেমন হূল গুলো আরও শার্প এবং হার্ডার হয়ে গেছে, জিনসের প্যান্টও একদম আরপার করে দিচ্ছে। মনাদা, রবিনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাতে কি? ঝড়ের সামনেও তুই বলছিস, বেঁচে যাবে? হ্যাঁ, আরে টুক করে সব বাঙ্কারে ঢুকে পড়বে না। মানে? আরে তোমার ঘরের ঘুপচি অন্ধকারগুলোয় গিয়ে সব গা ঢাকা দিয়ে দেবে।  
মনাদার চোখে এবার ক্রুর দৃষ্টি। বললেই হল। জানালা দরজা সব বন্ধ করে দেবো না, দেখি কেমন বাঁচে! মানে সেই তো ঘুরেফিরে ঝঞ্ঝার মুখে ফেলে মেরে দেওয়ার কিস্যা।  আচ্ছা বলুন তো, মশার ভোটাধিকার নেই বলে কি হিউম্যান রাইটসও থাকতে নেই! আপনারা কি বলেন?  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...