কবিতায় আলোছায়ার অস্পষ্টতা না থাকলে, পাঠে মায়া জাগে না। হেমন্তের ভোরে কুয়াশার আচ্ছন্নতা মাখা কবিতার শরীরে তাই প্রথম রবির করের মতো তার অন্তর্শায়িত
সৌন্দর্য প্রবাহকে পরিস্ফুট করতে লাগে গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন আলোকপাত।
বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক অরুণিমা চ্যাটার্জি, সেই সারসত্যকেই আরোও একবার প্রমাণিত করে দেখালেন; কবিতা বিশ্লেষণে ঠিক কতটা মগ্নতার প্রয়োজন, তার এক অনুপম নিদর্শন, সম্প্রতি আমার লেখা একটি কবিতার পাঠ প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে, অসাধারণ ভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
একমাত্র স্রষ্টাই জানেন সৃষ্টির কদর দিতে। অত্যন্ত উৎকৃষ্ট কাব্য সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে, যিনি বারবার নিজেকে প্রমানিত করেছেন, সেই কবি - শ্রদ্ধেয়া অরুনিমা দেবীর এই বিশ্লেষণ, কবিতার অন্তরাত্মা বোধনের বিজয়সুখ অনুভব করানোর ক্ষেত্রে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেই মনে করি। কবিতার লেখক হিসেবে এটি আমার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি হিসেবেই বিবেচিত হবে। বাকিটা উনার কলমে এবং মননের গভীরতায় যে ভাবে প্রতীত হয়েছে, সেটাই এখানে শেয়ার করে নেব।
তবে পর্যালোচনা পড়ার আগে, মূল কবিতাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। তাই প্রথমে কবিতা এবং তারপরে পাঠ প্রতিক্রিয়া থাকাই বাঞ্ছনীয়।
কবিতার নাম - স্মৃতির সহমরণ!
কলমে- দেবাশিস জানা
ফিরে যাওয়ার আগে,
চেনা ঘাটের স্মৃতি -
সাপের খোলসের মতো
নিঃশরীর হতে হতে,
ভেসে যাবে অনন্ত শয্যায়!
জল কাদা, গুলে মাছ,
গরান গাছের ছায়া;
হরি পালের দোকানে
নিত্য দই চিড়ে খাওয়া !
লক্ষ কোটি জলকুচি মেখে,
লোনা পাড়, রোদ চিকচিকে;
ছায়াপথে নেবে আশ্রয় !
মাঝি মল্লারের নিত্য কোলাহল,
হেইসা ধ্বনি, জোয়ারের কল্লোল ;
শেষ ট্রেনের ভো'য়ের মতন
নিস্তব্ধ হবে একসময় !
ফিরে যাওয়ার আগে,
বন্ধ হবে ফেরার পথ;
একা হবে রোদ আর
শিশিরের আচমণ !
অদৃশ্য হতে হতে,
বিলীন হবে আকাশ রেখা;
সাঙ্গ হবে,
স্মৃতির সহমরণ!
কবিতাটি সম্পর্কে লেখক দেবাশিস জানা প্রদত্ত পাদটীকা -
ঘাটে নৌকা ভেড়ে, আবার চলেও যায় ফেরৎ সাগরে। এর মাঝে, কয়েকদিনের জন্যে -
পাড়ের সাথে গড়ে ওঠে নতুন সম্পর্কের সীমান্ত। তৈরি হয় স্মৃতির ভালো মন্দ। কিন্তু সে সব ছেড়ে, ফিরতে তো হয়ই একদিন। সেই ফেরার সাথে কি, সেই সব স্মৃতিরও বিলুপ্তি হয়ে যায় চিরকালের মতো? নাকি থাকে কিছু অবশিষ্ট। এই প্রশ্ন থাকলোই।
ফেসবুকে প্রকাশিত (১৩/১০/২০২৫) হওয়ার পরে, কবিতাটির একটি বিশ্লেষণ ঋদ্ধ পাঠ প্রতিক্রিয়া দেন কবি অরুণিমা চ্যাটার্জি।
এখানে রইল কবি অরুণিমা দেবীর লেখা মনোগ্রাহী সেই পাঠ প্রতিক্রিয়াটিঃ
প্রিয় কবি (দেবাশিস জানা), আপনার এই কবিতার পাঠের পর মনে হয়, ফিরে যাওয়া মানে আসলে কোথাও এক চক্র পূর্ণ হওয়া, আর থেকে যাওয়া মানে সেই চক্রের স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকা।
প্রথম পংক্তি ফিরে যাওয়ার আগে ! এই একটি লাইনেই যেন জীবনের সম্পূর্ণ দর্শন লুকিয়ে আছে। যেন ফিরে যাওয়া নয়, বরং এক অদৃশ্য প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি।
আপনার কবিতায় স্মৃতির দহন ও অস্তিত্বের কোমলতা একসাথে মিশে আছে।
"হরি পালের দোকানে নিত্য দই চিড়ে খাওয়া" - এই চিত্র যেন বাংলার ঘ্রাণমাখা সকাল আর মাঝি মল্লারের নিত্য কোলাহল, শুনলে মনে হয় নদীর বুক জুড়ে বয়ে যাওয়া মানুষের জীবনের সুর।
এই কবিতার সৌন্দর্য এইখানেই। এটি স্থানকে ছাপিয়ে সময়ের উপাখ্যান হয়ে ওঠে।
ঘাট, জল, ছায়া, কল্লোল ! সব মিলিয়ে এখানে এক অদৃশ্য সহমরণের মঞ্চ, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও স্মৃতি একাকার হয়ে যায়।
আপনার কলম যেন বলে ওঠে, আমরা কেউই পুরোপুরি ফিরে যাই না, আমাদের কিছু অংশ থেকে যায় !
কখনও হরি পালের দোকানে, কখনও মাঝির সুরে, কখনও শুধু এক অনামা বিকেলের বাতাসে।
এই কারণেই স্মৃতির সহমরণ শুধু একটি কবিতা নয়,
এ এক অমর প্রত্যাবর্তনের দর্শন।
পরম শ্রদ্ধেয়া কবি, অরুনিমা চ্যাটার্জি।
ছবিটি অরুনিমা দেবীর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন