সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তখন সাঁজোয়া, এখন রেস্তোঁরা!

একসময় সাঁজোয়া গাড়ির ঘর্ঘর শব্দে চারিদিক কেঁপে কেঁপে উঠতো আজ সেখানে চায়ের কাপের টুংটাং, ধোঁয়া ওঠা পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সুমধুর সংলাপের গুঞ্জন ভেসে আসে দিনরাত এই মহা পরিবর্তনের মূলে কিন্তু রয়েছে একটি নদী, তার নামটি অবশ্য ভারী মিষ্টি - নায়ামজঙ্গ চু হিমালয়ের বুক থেকে নেমে সে অরুনাচল প্রদেশের জেমিথাঙ্গ গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তার কুলকুল স্বর, কিশোরীর পায়ের নুপূরের মতো সারাক্ষণ বেজে চলে জেমিথাঙ্গে বসবাসকারী মনপা উপজাতির সহজ সরল মানুষদের কানে উপত্যকার এই নদী পেরিয়ে ২০ কিলোমিটার পথ গেলে চীনের সীমান্ত কিন্তু নদী কী আর এসব সীমানা টিমানা বোঝে! যদিও এই সীমানার কারণেই যে তার বুকের ওপর একদিন, ইস্পাতের একটি আস্ত ব্রিজ চেপে বসবে, কে জানতো!

আসলে সমস্যাটা তৈরি হলো ১৯৬২ সালে, যখন ভারত চীনের মধ্যে কথিত লড়াই শুরু হলো এই লড়াইয়ের পটভূমি তৈরি হয়েছিল অবশ্য ১৯৫০ সালে, যে বছর চীন তিব্বতকে তার নিজের দখলে নিয়ে এসেছিল এর ফলে তিব্বতের দলাই লামারা ভারতে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, যে কারণে অসন্তোষ বাড়ছিল চীনের ১৯৫৯ চতুর্দশ দলাই লামা আসতে সেই আক্রোশে কার্যত ঘি পড়েছিল প্রসঙ্গত চতুর্দশ দলাই লামা এই পথেই প্রবেশ করেছিলেন ভারতবর্ষে যে কারণে তিনবছর পরে যখন ভারত চীনের যুদ্ধ বাঁধলো, রাতারাতি অরুনাচলের তথাকথিত এই নির্বিবাদী জনপদ - জেমিথাঙ্গ চলে এলো বিপক্ষের শ্যেন নজরে  লাগোয়া সীমান্তে যথারীতি, ব্যাপক চীনা সৈন্যের সমাবেশ ঘটতে দেখা গেল। যার ফলে, ভারতকেও কার্যত বাধ্য হতে হোল তাদের প্রতিরক্ষার বাঁধন কে আঁটোসাঁটো করতে

প্রসঙ্গত জেমিথাঙ্গ একটি পাহাড়ি উপত্যকায় বসা গ্রাম, অরুনাচলের তাওয়াঙ্গ জেলার অন্তর্গত সীমান্তবর্তী এই গ্রামে পৌঁছতে, জেলা শহর তাওয়াঙ্গ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয় পাকদন্ডী বেয়ে, দীর্ঘ এই পথে পড়ে লুমলা, যেখানে আবহাওয়া যখন তখন প্রতিকূল হয়ে ওঠে কিন্তু সেটার চেয়েও বড় সমস্যা দেখা দিল জেমিথাঙ্গে পৌঁছানোর পর কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০০ ফুট উঁচু এই উপত্যকায় আড়াআড়ি ভাবে বয়ে চলেছে নায়ামজঙ্গ চু নদী ভারতীয় সৈন্যদলের অবাধ অগ্রগতির পক্ষে যা প্রধান অন্তরায় যেখান থেকে সৈন্য তথা যুদ্ধ সরঞ্জামের অবাধ চলাচলের স্বার্থে, জরুরীভিত্তিক ভাবে নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দরকার হয়ে পড়েছিলশুরু হলো, অপারেশন 'সদভাবনা' যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে, মাত্র ৩১ দিনের মধ্যে নদীর বুকে পেতে ফেলা সম্ভব হলো ইস্পাতের তৈরি টিপিক্যাল একটি বেইলি ব্রিজকে যার ওপর দিয়ে চলাচল করতে লাগলো সাঁজোয়া গাড়ি, ট্যাঙ্ক ইত্যাদি; ভারী বুটের আওয়াজে কম্পিত হতে লাগলো ওখানকার আকাশ বাতাস

কিন্তু কালের গতির কাছে সবকিছুই ফিকে ইতিমধ্যে বাহতাঙ্গকাঙ্গ ফলসের ব্যাপ্তি বেড়েছে কয়েকগুণ তাই সৈন্য যাতায়াতে তৈরি হয়েছে নতুন বাধা যা কাটিয়ে ওঠা ভীষণ মুশকিল, যার ফল বেইলি ব্রিজ আজ অপ্রয়োজনীয়, অব্যবহারে পরিত্যক্ত

আর এইখানেই নতুন ভাবনার শুরু ভারতীয় আর্মীর বিভাগীয় অনুমতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত সেদিনকার বেইলি ব্রিজ আজ একটি আকর্ষণীয় রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়েছে নাম - বর্ডার ব্রিউ কাফে স্থানীয় মনপা উপজাতির মহিলারাই চালান এই রেস্তোরাঁ চা কফি, স্যান্ডুইচ বা মোমো ছাড়াও, এখানে পর্যটকদের কাছে ভীষণ প্রিয় আইটেম সুজার আস্বাদন দারুন সাড়া ফেলেছে স্থানীয় পদ্ধতিতে বানানো এই সুজা একধরনের মাখন চা

টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক রাজীব দত্ত জোকেন এটেকে স্থানীয় বিধাযাক সেরিঙগ লাহমু বলেছেন, এই রেস্তোরাঁ শুধুমাত্র যে সীমান্ত পর্যটনেই বড় উন্নতি ঘটিয়েছে তাই নয়, স্থানীয় মানুষদের কাছেও এক বড় সুযোগ খুলে দিয়েছে পাশাপাশি উল্লেখনীয়, বীর সৈনিকদের ছবি অলংকৃত রেস্তোরাঁর একটি পুরো দেওয়ালকে যুদ্ধের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত করা হয়েছে, যেটি পর্যটকদের কাছে অতিরিক্ত আকর্ষনের বস্তু হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে

সর্বোপরি রেস্তোরাঁর মাথায় নির্মিত কাঁচের বৃত্তাকার পরিদর্শন ক্ষেত্র, যেখানে দাঁড়িয়ে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে হিমালয় পর্বতমালার তরঙ্গায়িত শৃঙ্গদেশ পরিলক্ষিত হয়, অবশ্যই সেটা প্রিয় চায়ের চুমুকে বাদ দিয়ে নয় তাই যুদ্ধ, যুদ্ধক্ষেত্র বা সীমান্ত - যাই হোক না কেন; অন্তরে অন্তত যুদ্ধবিরামের এই বিশুদ্ধ চা- তৃষ্ণা টুকু বেঁচে থাক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর এবং দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ!

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যাকে আদিকবির আসনে বসিয়েছিলেন; যার লেখা বইয়ের (বর্ণ পরিচয়) হাত ধরে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় বাংলা বর্ণ যোজনার সঙ্গে; মাত্র চার বছর বয়সে পড়া - যার লেখার প্রভাব থেকে কোনোদিন পারেননি তিনি মুক্ত হতে; ৫১ বছর (১৯১২) বয়সে লেখা 'জীবন স্মৃতি' তে তাই যার লেখার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ র মত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে চির কালজয়ী দুটি লাইনের কথা - সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল মেট্রোপলিটন স্কুলে।   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর তখন মেট্রোপলিটন স্কুলের সভাপতি আর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহ শিক্ষক। রামসর্বস্ব পণ্ডিত ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ কে ‘ম্যাকবেথে’র বাংলা অনুবাদ  করে শোনাতেন, আর তা শুনে বাংলায় লিখিত তর্জমা করতে হত রবীন্দ্রনাথকে। তর্জমা সম্পূর্ণ হলে তার গুনমান বিচার করতে রামসর্বস্ব ছাত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। কেমন ছিল সেই প্রথম সাক্ষাৎ পর্ব! রবীন্দ্রনাথ তার আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ তে সে কথা লিখেছেন বিস্তারিত। ‘জীবন স্মৃতি’র ‘ঘরের...