সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রিয় রাখি!

আকাশ থেকে পেড়ে আনা তুলোর মত নরম মেঘের টুকরোগুলোর গায়ে যেন আলতা পরিয়ে তাদের তুলট সুতোর মাথায় ঝুটি করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এ হেন অলৌকিক সৌন্দর্যের অধিকারী কব্জি-ডোর গুলি যে কী আনন্দে গুচ্ছে গুচ্ছে প্রায় পিঠোপিঠি হয়ে পড়ে থাকতো ছোট্ট একখানা মলিন নায়লনের ব্যাগের মধ্য, ভাবলে সত্যিই পুলক লাগে। শীর্ণ হাতে ধরা সেই ব্যাগ নিয়ে যিনি শ্রাবণ পূর্ণিমার ভোরে সকলের বাড়ি বাড়ি এসে হাজির হতেন তিনি অরুন্ধতী দেবী, শ্যাম বর্ণা, কপালে বয়সোজনিত বলিরেখার ঢল, নাকের নীচে একটা মস্ত বড় কালো তিল, সরু ঠোঁটের কোণে সর্বদা বিদূষী গাম্ভীর্য লেগে থাকাটা বেশ শ্রদ্ধা জাগাতো। পৃথুলা চেহারায় তাঁর আলুথালু অরক্ষিত বুক, গায়ে জড়ানো সরু কালো পাড়ের সাদা থান, তবু সম্ভ্রম তাঁর অমূল্য ভূষণ। ধীর পায়ে তিনি দুয়ারে এসে উপস্থিত হতেন, আনন্দের তখন আর সীমা পরিসীমা থাকতো না।


ছবিটি দারুয়ার (কাঁথি) উত্তর বিলের, সকালের রঙে রাঙা।

অন্য দিনে তাঁর হাতে কঞ্চির ছড়ি থাকে, আজ সে জায়গায় রাখির ব্যাগ। আজকে আর অ আ ক খ ডেকে ডেকে খামোখা স্লেটে খড়ি ঘষে মস্কো দেওয়ার কোনো চাপ নেই, শিশুরা তাই আহ্লাদে গদগদ হয়ে প্রায় বৃষ্টি পড়া কলা পাতার মতো লাফাতে লাফাতে ছুটে চলে আসে। অন্যদিন হলে ঠেলেঠুলে নিয়ে আসতে হয়, দাসেদের ঘরের টানা বারান্দায় তাঁর পাঠশালা বসতো। গ্রামে এমন কোনো শিশু নেই যার হাতে-খড়ি উনার হাত ধরে হয়নি। তিনি সকলের কাছে বামুন দিদা, তাঁকে ঘিরে এদিন বাড়ির বাচ্চারা বুনোফুলের গাছের মতো জঙ্গল করে দাঁড়িয়ে পড়ে। খালি পা, আদুল গা; হাঁসি কলরবে মাত হয়ে যায় সারা উঠোন, অন্যদিন হলে চোপ্ বলে ঝাপটে উঠতেন। আজ তিনি শ্রাবণের বাতাসের মতো নরম এবং আর্দ্র ।

মৃদু হেঁসে বামুন দিদা তাঁর ব্যাগের মধ্যে হাত ঢোকালেই যেন মন চঞ্চল হয়ে ওঠতো, কী এক বিরাট বহুমূল্য খাজানার অধীকারী হব এই ভেবে প্রায় দমবন্ধ করে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সে উৎকন্ঠার মাধুর্য আজ চির নিরুদ্দেশ।

দিদা গুনগুন করে মন্ত্র পড়তে পড়তে সেই আলতা চোবানো সুতোর রাখি গুলো পরিয়ে দিতেন কচি কচি হাতে।

যেন বদ্ধো বলীরাজা দানবেন্দ্র মহাবল:

তেন ত্বাম প্রতি বধ্নামি রক্ষে মা চল মা চল!

আমরা শুধু প্রথম দিকের কয়েকটি শব্দই মোটামুটি শুনতাম, তাও দানবদ্য বলীরাজা... এইভাবে। বাকিটা ঐ শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সযয় যেমন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলতে হয় তেমনি এক্ষেত্রেও শুনলে অবোধ প্রতিপন্ন হতে হবে তাই কিছু শুনতে পাইনি এই ভেবে নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করতাম।

পরে স্কুলে সংস্কৃত স্যারের কাছে শুনেছিলাম, রাখি বাঁধার সময় পড়া এই মন্ত্র নাকি ঋষি ব্যাসদেবের লেখা, আঠারো খানা পুরানের মধ্যে অন্যতম - ভবিষ্য পুরানের মধ্যে রয়েছে এই শ্লোক। প্রহ্লাদ পৌত্র দানবীর দানব রাজা বলীকে, দেবী লক্ষী এই রাখি পরিয়েই নাকি বিষ্ণুর পাতাল রাজ্য থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সম্মতি আদায় করেছিলেন। বাকি, রাজা বলীর পাতাল রাজ্যের অধিপতি হওয়া বা বিষ্ণুর ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা ইত্যাদির কাহিনী সকলেরই জানা।

বামুন দিদা যদিও আমাদের শিশুসুলভ জিঘাংসার উত্তর অন্যভাবে দিতেন।

আমরা জানতে চাইলে, দিদা - দান বদ্ধো বলীরাজা , কিন্তু তারপরে কী বললেন?

দিদা হেঁসে হেঁসে ছড়ার মতন করে বলতেন, দান বদ্ধো বলীরাজা, তোর মা'র কোতনু পইসা লেইজা।

এই প্রসঙ্গে বলি, আমার বাড়ি যেখানে সেই কাঁথি অঞ্চলের (ওড়িশার নিকটস্থ হওয়ায়) কথ্য ভাষায় ওড়িয়া শব্দ বা বাগধারার ভীষণ প্রভাব রয়েছে।। বামুন দিদা স্বাভাবিক ভাবে সেই চলতি রীতি মেনে যে লাইনটি বলতেন, সেটার অর্থ - যেন বদ্ধো বলীরাজা, তোর মা'র কাছ থেকে পয়সা নিয়ে আয় যা।

অন্তমিলের অদ্ভুত আনন্দ আর সত্যি সত্যিই মা'র কাছে গিয়ে পয়সা নিয়ে আসার দৌরাত্ম দেখানোর দায়িত্ব পাওয়া, সে যে কী আহ্লাদ হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বামুন দিদা অনেকদিন হল চলে গেছেন ইহলোক ছেড়ে, এখন আর সেই চল নেই।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...