আকাশ থেকে পেড়ে আনা তুলোর মত নরম মেঘের টুকরোগুলোর গায়ে যেন আলতা পরিয়ে
তাদের তুলট সুতোর মাথায় ঝুটি করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এ হেন অলৌকিক সৌন্দর্যের অধিকারী
কব্জি-ডোর গুলি যে কী আনন্দে গুচ্ছে গুচ্ছে প্রায় পিঠোপিঠি হয়ে পড়ে থাকতো
ছোট্ট একখানা মলিন নায়লনের ব্যাগের মধ্য, ভাবলে সত্যিই পুলক লাগে। শীর্ণ হাতে ধরা সেই
ব্যাগ নিয়ে যিনি শ্রাবণ পূর্ণিমার ভোরে সকলের বাড়ি বাড়ি এসে হাজির হতেন তিনি
অরুন্ধতী দেবী,
শ্যাম
বর্ণা,
কপালে
বয়সোজনিত বলিরেখার ঢল,
নাকের নীচে
একটা মস্ত বড় কালো তিল,
সরু ঠোঁটের
কোণে সর্বদা বিদূষী গাম্ভীর্য লেগে থাকাটা বেশ শ্রদ্ধা জাগাতো। পৃথুলা চেহারায়
তাঁর আলুথালু অরক্ষিত বুক,
গায়ে
জড়ানো সরু কালো পাড়ের সাদা থান, তবু সম্ভ্রম তাঁর অমূল্য ভূষণ। ধীর পায়ে
তিনি দুয়ারে এসে উপস্থিত হতেন, আনন্দের তখন আর সীমা পরিসীমা থাকতো না।
অন্য দিনে তাঁর হাতে কঞ্চির ছড়ি থাকে, আজ সে জায়গায় রাখির ব্যাগ। আজকে আর অ আ ক খ
ডেকে ডেকে খামোখা স্লেটে খড়ি ঘষে মস্কো দেওয়ার কোনো চাপ নেই, শিশুরা তাই আহ্লাদে গদগদ হয়ে
প্রায় বৃষ্টি পড়া কলা পাতার মতো লাফাতে লাফাতে ছুটে চলে আসে। অন্যদিন হলে
ঠেলেঠুলে নিয়ে আসতে হয়,
দাসেদের
ঘরের টানা বারান্দায় তাঁর পাঠশালা বসতো। গ্রামে এমন কোনো শিশু নেই যার হাতে-খড়ি উনার
হাত ধরে হয়নি। তিনি সকলের কাছে বামুন দিদা, তাঁকে ঘিরে এদিন বাড়ির বাচ্চারা বুনোফুলের
গাছের মতো জঙ্গল করে দাঁড়িয়ে পড়ে। খালি পা, আদুল গা; হাঁসি কলরবে মাত হয়ে যায় সারা উঠোন, অন্যদিন হলে চোপ্ বলে ঝাপটে উঠতেন। আজ তিনি শ্রাবণের
বাতাসের মতো নরম এবং আর্দ্র ।
মৃদু হেঁসে বামুন দিদা তাঁর ব্যাগের মধ্যে হাত ঢোকালেই যেন মন চঞ্চল হয়ে ওঠতো, কী এক বিরাট বহুমূল্য খাজানার
অধীকারী হব এই ভেবে প্রায় দমবন্ধ করে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সে উৎকন্ঠার
মাধুর্য আজ চির নিরুদ্দেশ।
দিদা গুনগুন করে মন্ত্র পড়তে পড়তে সেই আলতা চোবানো সুতোর রাখি গুলো পরিয়ে
দিতেন কচি কচি হাতে।
যেন বদ্ধো বলীরাজা দানবেন্দ্র মহাবল:
তেন ত্বাম প্রতি বধ্নামি রক্ষে মা চল মা চল!
আমরা শুধু প্রথম দিকের কয়েকটি শব্দই মোটামুটি শুনতাম, তাও দানবদ্য বলীরাজা... এইভাবে।
বাকিটা ঐ শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সযয় যেমন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলতে হয় তেমনি
এক্ষেত্রেও শুনলে অবোধ প্রতিপন্ন হতে হবে তাই কিছু শুনতে পাইনি এই ভেবে নিস্তার
পাওয়ার চেষ্টা করতাম।
পরে স্কুলে সংস্কৃত স্যারের কাছে শুনেছিলাম, রাখি বাঁধার সময় পড়া এই মন্ত্র নাকি ঋষি ব্যাসদেবের লেখা,
আঠারো খানা
পুরানের মধ্যে অন্যতম
- ভবিষ্য
পুরানের মধ্যে রয়েছে এই শ্লোক। প্রহ্লাদ পৌত্র দানবীর দানব রাজা বলীকে, দেবী লক্ষী এই রাখি পরিয়েই নাকি
বিষ্ণুর পাতাল রাজ্য থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সম্মতি আদায় করেছিলেন। বাকি, রাজা বলীর
পাতাল রাজ্যের অধিপতি হওয়া বা বিষ্ণুর ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা ইত্যাদির কাহিনী
সকলেরই জানা।
বামুন দিদা যদিও আমাদের শিশুসুলভ জিঘাংসার উত্তর অন্যভাবে দিতেন।
আমরা জানতে চাইলে,
দিদা - দান
বদ্ধো বলীরাজা ,
কিন্তু
তারপরে কী বললেন?
দিদা হেঁসে হেঁসে ছড়ার মতন করে বলতেন, দান বদ্ধো বলীরাজা, তোর মা'র কোতনু পইসা লেইজা।
এই প্রসঙ্গে বলি,
আমার বাড়ি
যেখানে সেই কাঁথি অঞ্চলের (ওড়িশার নিকটস্থ হওয়ায়) কথ্য ভাষায় ওড়িয়া শব্দ বা
বাগধারার ভীষণ প্রভাব রয়েছে।। বামুন দিদা স্বাভাবিক ভাবে সেই চলতি রীতি মেনে যে
লাইনটি বলতেন,
সেটার অর্থ
- যেন বদ্ধো বলীরাজা,
তোর মা'র কাছ থেকে পয়সা নিয়ে আয় যা।
অন্তমিলের অদ্ভুত আনন্দ আর সত্যি সত্যিই মা'র কাছে গিয়ে পয়সা নিয়ে আসার দৌরাত্ম
দেখানোর দায়িত্ব পাওয়া,
সে যে কী আহ্লাদ হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে
না।
বামুন দিদা অনেকদিন হল চলে গেছেন ইহলোক ছেড়ে, এখন আর সেই চল নেই।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন