সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বেজোড় আন্দাজ!

ঠিকানা - ১০৩ A & C বালিগঞ্জ প্লেস, কোলকাতা ১৯, দক্ষিণ কোলকাতার অন্যতম অভিজাত স্কুল পাঠ ভবনে সেদিন এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটলো, যা স্কুলের ছাত্র ছাত্রী থেকে শিক্ষক শিক্ষিকা সকলেরই কল্পনার বাইরে। স্বপ্নেও কেউ তারা ভাবেনি এমনটা হতে পারে। একেবারে হুলস্থূল পড়ে গিয়েছিল স্কুলে, ছাত্রদের তুমুল হুড়োহুড়ি আর চিল চিৎকারে কানে প্রায় তালা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ঘটনার এপি সেন্টার হেডমাস্টার মহাশয়ের অফিস ঘর। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তখন হুটোপাটা করে বিভিন্ন ক্লাশের ছাত্র ছাত্রীরা ছুটে নেমে আসছে নীচে প্রধান শিক্ষকের অফিসের দিকে। তাদের আবেগের জোশ এতটাই প্রবল যে এক মুহূর্তের অপেক্ষাও যেন কারোর কাছে বরদাস্ত নয়।


কিংবদন্তি কণ্ঠ শিল্পী কিশোর কুমার।

নিশ্চিত এই অব্দি পড়ার পরে মনে কিশোর কুমারের গানের ঢঙে কি হল, কেন হল বলে প্রশ্ন জাগা শুরু হয়েছে। কিন্তু সে নিয়ে কৌতুহল মেটানোর আগে বরং 'কবে হল' এই প্রশ্নের নিরসন করার চেষ্টা করি। ঘটনাটি ঘটে গত ছয়ের দশকের শেষের দিকে, স্কুল প্রতিষ্ঠার (১৯৬৫) অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই। প্রসঙ্গত এটি নিয়ে আমি একটি সাক্ষাৎকারে প্রথম শুনেছিলাম, তারপরে সম্প্রতি আরও খোঁজখবর নিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম খোদ স্কুলেই।

কথায় আছে, কাউকে দান দিতে গেলে রাজা কর্ণের মত দিতে হয় আর সারপ্রাইজ দিতে গেলে কিশোর কুমারের মত। প্রসঙ্গত পাঠ ভবনের সেদিনকার সেই ভয়ানক তুলকালামের পেছনেও কিশোর কুমারের সেই সদাবাহার সারপ্রাইজ দেওয়ার মনোবাঞ্ছাই কাজ করেছিল। যদিও কিশোর কুমারের কাছে সারপ্রাইজ দেওয়াটা কোনো উপলক্ষ-বিশেষ ছিল না, বরং সেটা ছিল তার একান্ত সহজাত, তাঁর পুরো জীবনটাকেই যদি আতস কাঁচের তলায় এনে দেখা যায় তবে তাতে শুধু চমকের ঝলকই দেখা যাবে। যেভাবে শৈশবে কর্কশ গলার অধিকারী হয়েও ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বজনপ্রিয় নেপথ্য গায়ক হয়ে উঠলেন কিংবা স্বভাবে লাজুক এবং অন্তর্মুখী হয়েও হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি কৌতুকাভিনেতা; বা তথাকথিত নন-সিরিয়াস বলে পরিচিত হয়েও লিখে ফেললেন " চলকে তুঝে, ম্যায় লে কে চলু'' মতো সুলিখিত কালজয়ী গান বা পরিচালনা করলেন 'দূর কি রাহি' মত পর্যালোচক প্রশংসিত সিনেমা, তাতে তাঁর সারপ্রাইজ দেওয়ার মহিমাই বারেবারে ফুটে ওঠে।

সেবার অবশ্য উদ্দেশ্য ছিল পুত্র অমিতকে হকচকিয়ে দেওয়া; সেই ঘটনার কথা অমিত কুমার নিজেই তাঁর এক সাক্ষাৎকারে সবিস্তারে শুনিয়েছেন।


১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয় পাঠ ভবন। 

প্রসঙ্গত অমিত কুমার (জন্ম ১৯৫২, ৩রা জুলাই) তখন পাঠ ভবনের ছাত্র, ১৯৫৮ 'য় স্ত্রী রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে, পুত্র অমিত তাঁর মায়ের কাছেই থাকতেন কোলকাতায়। কিশোর কুমার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে প্রায়শই মুম্বাই থেকে উড়ে আসতেন কোলকাতায়। উইকেন্ডের বিকেলে ছেলেকে নিয়ে চক্কর কাটতেন কোলকাতার এখানে ওখানে, নানা জায়গাতে, বেলুড় মঠ থেকে ভিক্টোরিয়া, গঙ্গার তীর থেকে তারামন্ডল বাদ যেত না কোনকিছুই, সঙ্গে চলতো ফুচকা দই মিঠাই সহযোগে পেট পুজোর পরিপাটিও।

সবশেষে ছেলেকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে ফিরে যেতেন হোটেলে। সেবারেও অন্যথা হয়নি তার, পরের দিন সকালের ফ্লাইটে বোম্বে চলে যাবেন বলে ছেলেকে কাছে টেনে আদরও করেছেন যথারীতি।

কিন্তু তিনি কিশোর কুমার, সারপ্রাইজ না দিয়ে কতদিনই বা তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেতে পারেন। তাই বোম্বাই যাত্রা ফেলে আচম্বিতে তাঁর পাঠ ভবনে আগমন।

বলাই বাহুল্য সেই হুড়োহুড়ির মাঝে অমিত কে কেউ বলে দেয়, তোর বাবা এসেছেন, সবার মতো অমিতও হেডমাস্টারের ঘরে পৌঁছতেই চোখাচোখি হয়ে যায় কিশোর কুমারের সঙ্গে, মাথায় জোকারদের মতো টুপি পরা কিশোর কুমার তখন গগলসের নীচ দিয়ে ক্রমাগত দুষ্টু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলেছেন ছেলের দিকে, স্নেহার্দ্র হাসির ঝিলিক মাখা ঠোঁটে তিনি বলছেন - কী কেমন সারপ্রাইজ দিলাম, অ্যা!


প্রবেশ দ্বারের একপাশে পাঠ ভবনের নাম ফলক। 

কিশোর কুমারের সম্পর্কে আরও লেখা পড়তে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে - 
মুডি কিশোর! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...