১৯৬৭ তে সুকান্ত-সমগ্র প্রকাশিত হওয়ার সময়, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন সুকান্ত (জন্ম - ১৯২৬,
১৫ই আগস্ট
) বেঁচে থাকলে এখন তার বয়স হতো ৪১, কিন্তু সুকান্ত আজও একুশেই আছেন; সুকান্তের বয়স বাড়েনি,
প্রবহমান সময়ের স্রোতে কবি সুকান্ত এক স্থায়ী দিকচিহ্ন হয়েই চিরকাল তাঁর বিদ্রোহী কবিসত্তার ধ্বজা উড়িয়ে চলেছেন। প্রাণপ্রিয় বন্ধু কবি অরুণাচল বসুকে একটা চিঠিতে সুকান্ত লিখছেন, প্রেমে পড়ে প্রেমের কবিতা লেখা তার কাছে বড়ই ন্যক্কারজনক ব্যাপার, ঠিক যেমনটি তিনি নিজেকে 'দুর্ভিক্ষের কবি' (রবীন্দ্রনাথের প্রতি, ছাড়পত্র) বলে আখ্যায়িত করেও ব্যক্তি হিসেবে কখনো বুভুক্ষু মানুষের দলে নিজেকে
অন্তর্ভুক্ত ক’রে অযথা সহানুভূতি কুড়ানোর প্রচেষ্টা করেননি।
ছোটবেলায় যে সচ্ছলতা এবং স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বড় হয়েছেন,
বাবা (নিবারণ ভট্টাচার্য) এবং জ্যাঠা'র (কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য) যৌথ প্রকাশনা ব্যবসা ছিল কোলকাতার
(২০৬ নং) বিধান সরণিতে। সারস্বত প্রকাশনী নামে, তাতে বাড়িতে পরিচারক পরিচারিকা থেকে ঠাকুর পাচকদের অভাব ছিল না। কালীঘাটের ৪৩ নং মহিম হালদার লেনে মা সুনীতি দেবীর পিত্রালয়। সেখানেই দ্বিতীয় সন্তান সুকান্তের জন্ম হয়, বাংলা ১৩৩৩ সনের ৩০ শে শ্রাবণ তারিখে। শ্রাবণের ৩০ তারিখ কোনো কোনো বছর ইংরেজি হিসেবে ১৫ই আগস্টের জায়গায় ১৬ আগস্টে পড়ে, যেমন এবছরে (১০১তম
বছর, ২০২৬
সাল) হয়েছে।
সুকান্তের বাড়িতে এমনকি এও চল ছিল কেউ অসুস্থ হলে তখনকার অন্য বাঙালি সম্ভ্রান্তদের মতন তাঁরাও হাওয়া বদল করতে যেতেন বিহারের মধুপুরে। ১৯৩৮ সালে, সুনীতি দেবী ক্যান্সার আক্রান্ত হলে তাঁকেও মধুপুরে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সুকান্ত ১২ বছর বয়সে মাতৃহারা হন।
সুকান্তের ছোট ভাই অমিয় ভট্টাচার্য তখন মাত্র দুই বছরের, ৯১ বছর বয়সী অমিয় বাবু এখন সুকান্তের ভাইদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, ছেলে বিবেক ভট্টাচার্যের ফোনে আমার সঙ্গে শেয়ার করলেন সুকান্তের সম্পর্কে কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা।
প্রসঙ্গত 'কবি সুকান্ত' নামে একটি বই ও লিখেছেন তিনি।
সুকান্তের বাবা নিবারণ বাবু প্রয়াত হন সুকান্তের মৃত্যুর (১৯৪৭, ১৩ইমে) অনেক পরে, ১৯৫৬ সালে। আমি ফোনে অমিয় বাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সুকান্তের সম্পর্কে তাঁর বাবার নিজের কী মূল্যায়ন ছিল, কারণ ততদিনে সুকান্তের দু দুটি কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে 'ছাড়পত্র' (১৯৪৭) এবং 'পূর্বাভাস' (১৯৫০)
প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। অমিয় বাবু বললেন, তাঁদের পারিবারিক প্রকাশনা সংস্থা সারস্বত লাইব্রেরি থেকেই এই বই দুটি প্রথম বেরোয়। এতে তাঁর বাবার পূর্ণ সমর্থণ ছিল।
অমিয় বাবুর মতে তাঁর বাবা ছিলেন ভীষণ স্নেহশীল এবং দৃঢ় প্রত্যয়ী। মেজদাদা সুকান্ত, তাঁর কথায় হুবহু তাঁর বাবার মতো ছিলেন। তার সঙ্গে মায়ের ধৈর্য এবং সহনশীলতাও পেয়েছিলেন সুকান্ত।
গ্রন্থাদি প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বাড়িতে একটা উদার ও
সংস্কার মুক্ত পরিবেশ ছিল বলে তিনি মনে করেন, মর্যাদায় তৎকালীন অত্যন্ত উচ্চ ব্রাহ্মণ বংশীয় হওয়া সত্ত্বেও ছেলেমেয়েদের মনে গোঁড়ামির বিশেষ স্থান ছিল না। মুক্ত বিহঙ্গের মতো সর্বত্র সামাজিক বিচরণ ছিল তাদের।
সেই কারণেই সুকান্ত মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ১৯৪৪ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। আসলে ঘরের দিক থেকে এসবের কোনো বাধা তিনি কোনদিন পাননি।
অমিয় বাবুর কথায় সুকান্ত ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।
যদিও এর হাতেখড়ি হয়েছিল আরোও আগে। কমলা বিদ্যামন্দিরে (প্রাইমারি স্কুল) পড়ার সময়েই
'সঞ্চয়' নামে হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায় একটি সরস গল্প লিখে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ তাঁর, প্রসঙ্গত সুকান্তের জন্মের আট নয় বছর পর্যন্ত সুকান্তের বাবা জ্যাঠারা বাগবাজার নিবেদিতা লেনের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তারপরে তাঁরা জায়গা কিনে উঠে আসেন বেলেঘাটায়, বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনে মাটির আটচালা, দোতলা বাড়ি বানান নিবারণ বাবুরা। এখানে অবশ্য নিবারণ বাবুর দাদা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের লোকজন থাকতো,
উল্টো দিকে ৩৮ নং এ
থাকতেন নিবারণ বাবু এবং তাঁর স্ত্রী ও ছেলেরা। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে সবজায়গায় ৩৪ নং হরমোহন ঘোষ লেনের কথাই বলা হয়, সুকান্তের লেখা বিভিন্ন পত্রেও পত্র দাতা হিসেবে তার ঠিকানা এই ৩৪ নং হরমোহন ঘোষ লেনের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই বাড়িই শেষ পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হল, এমনকি বাড়িটিকে যাকে বিক্রি করা হলো সেই ললিতমোহন বসু এবং পারুল বালা বসুদেব বলে দেওয়া হলো খবরদার এ অপয়া বাড়িতে নিজেরা বসবাস করবেন না, দরকারে কাউকে ভাড়া দিয়ে দেবেন কিন্তু নিজেরা নৈব নৈব চ। সেটা ১৯৪২ সাল।
উল্লেখ্য এখনোও সেই বাড়িতে ভাড়াটেরাই থাকেন, মালিক থাকেননা।
কিন্তু কেন? এর পেছনে রয়েছে আচমকা একটা মৃত্যু, রানী নামের সুকান্তের এক জেঠতুতো দিদি অকালে মারা যায় এখানে এবং তারপরেই নাকি শুরু হয় কথিত পারিবারিক বিপর্যয়। প্রসঙ্গত এই রানীদির কাছেই ছোটবেলায় সুকান্তের বেশীরভাগ সময় কাটতো,
তার কয়েকবছর পরে সুকান্তের মা ও
প্রয়াত হন, কিন্তু সুকান্ত এই হরমোহন ঘোষ লেনেই জীবনের সবথেকে বেশী সময় কাটিয়েছেন, সেখানে থেকেই তিনি ধীরে ধীরে বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠার পথে অগ্রসর হন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ও নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষের স্বার্থে নিজের কলমকে ক্রমাগত ধারালো করে তোলেন।
সেবার বাংলাদেশের নাট্যদল, প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের লেখা নাটক
'চে'র সাইকেল'
মঞ্চস্থ করতে
কোলকাতায় এল আমন্ত্রিত হয়ে; যুব
নাট্যোৎসব উপলক্ষে, বেলেঘাটার সুকান্ত মঞ্চে নাটকটি অভিনীত হল ২০১০ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর। নাটক শেষে পাঁচ প্রধান কুশীলব হাজির হলেন,
এককালে ৩৪ হরমোনের ঘোষ লেনে থাকা কবি সুকান্তের বাড়ি দেখতে। সুকান্তের সৃষ্টি ও স্মৃতির প্রতি এমন আকর্ষণ এই নতুন নয়, গত ষাটের দশকে যখন আজকের বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীন, তখনও সেখানকার ঘরে ঘরে, মহা
সমাদরে সুকান্তের কাব্যগ্রন্থ শোভা পেত। এযনকি সুকান্তের ছাপা বই থেকে হাতে লিখে লিখে সেগুলিকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ঘরে রেখে দিতেন সেখানকার শত শত সুকান্ত অনুরাগী মানুষজন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত 'সুকান্ত সমগ্র'র ভূমিকাতে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই
ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
শিশুকালেই স্ফুরিত সুকান্তের কবি প্রতিভা যখন শোষণ এবং শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে বৈষম্য মুক্ত সমাজতান্ত্রিক চেতনার পথ ধরে সোচ্চার হওয়ার অভিমুখ খুঁজছিল, সেই সময়ে সুকান্তের ভবিষ্যৎ কাব্যচর্যার আদর্শ লালন ক্ষেত্র হিসেবে এই ৩৪ হরমোনের ঘোষ লেনের ভূমিকা অবশ্যই এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।
মাটকোঠার দোতলা বাড়ি,
বাড়ির সামনে সরু গলি, গন্ধরাজ লেবু ও
জবার জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা, রোদ বৃষ্টি, জেঠতুতো ভাই দাদাদের সাহচর্য, বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলের ছাত্র হওয়া,
সেখানে বন্ধু হিসেবে ভাবী
কবি অরুণাচল বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া থেকে শুরু করে স্কুলে যৌথভাবে 'সপ্তমিকা' নামের দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনা করা এবং অবশ্যই কম্যুনিস্ট ভাবধারার প্রতি অত্যন্ত দ্রুত এবং অপ্রতিরোধ্য গতিতে আকৃষ্ট হওয়া চলে একসাথে।
১৯৪২ এ হরমোহন ঘোষ লেন ছেড়ে নতুন ঠিকানা ২০ নং নারকেলডাঙা মেন রোডের বাড়িতে উঠে যাওয়ার আগেই, সুকান্ত তাঁর (মৃত্যুর পরে, ১৯৫০ সালে প্রকাশিত)
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'পূর্বাভাস'এর কবিতাগুলি লিখে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে 'স্মারক', 'ঘুমভাঙার গান', 'প্রথম বার্ষিকী' ইত্যাদি অন্যতম।
'পূর্বাভাস' এর কবিতাগুলি নিয়েই সুকান্তের কবিতার সঙ্গে প্রথম পরিচিতি ঘটে কবি বুদ্ধদেব বসু'র। যে বুদ্ধদেব বসু পরবর্তী কালে সুকান্তের 'একদেশদর্শী' রাজনৈতিক আবেগের কারণে কীভাবে তার কবিতা রসোত্তীর্ণ হওয়া থেকে দূরে থাকছে তাই নিয়ে সরব হয়েছিলেন, সেই বুদ্ধদেব বসুও
সুকান্তের এমন সময়-পূর্ব কবিত্ব শক্তির বিকাশ দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ সুকান্তের বয়স তখন মাত্র ১৪। যদিও বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের লেখা এই কবিতা গুলি পড়েছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে।
সুকান্তের জেঠতুতো দাদা মনোজ ভট্টাচার্য ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সহপাঠী, স্কটিশ চার্চ কলেজে পাঠরত সুভাষকে একদিন চায়ের আড্ডায় বন্ধু মনোজ জোর করে একটা কবিতার খাতা গুঁজে দিয়ে যান।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় তখন 'পদাতিক' লিখে ফেলেছেন এবং বেশ পরিচিত মুখ, তিনিও সুকান্তের কবি প্রতিভা দেখে চমৎকৃত না হয়ে পারেননি।
দু এক বছর আগে,
'চাঁদের পাহাড়' খ্যাত চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কিছু সহযোগী এসেছিলেন এই হরমোহন ঘোষ লেনে।
জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে সুকান্তের ওপরে তথ্যচিত্র নির্মাণ করাই ছিল লক্ষ্য। স্মৃতির সরণি বেয়ে সুকান্ত কে পুনরাবিষ্কার করতে এখনোও হরমোহন ঘোষ লেনের যে স্মৃতিচিহ্নটি অটুট রয়েছে সেটি মূলত ৩৪ নং বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে থাকা ৩৯ নং বাড়িটির মধ্যে।
এটি প্রখ্যাত কম্যুনিস্ট নেতা কৃষ্ণগোপাল বোস বা কে জি বোস এর বাড়ি। নীচের সরু বারান্দা পেরিয়ে যে চুন সুড়কির দেওয়াল ও কড়ি কাঠের ছাদ দেওয়া ঘরটি পড়ে, ঢোকার মুখে সেটিই কেবল সেই সময়কার ইতিহাসকে কিছুটা হলেও এখনো ধরে রেখেছে। বাকি ৩৪ নং বা ৩৮ নং বাড়ি দুটি বেশিরভাগই নবরূপে নির্মিত বা কালের ক্ষয় থেকে নিজেদের বাঁচাতে অপারগ।
প্রসঙ্গত সুকান্তের সৎ দাদা মনমোহন ভট্টাচার্য এবং তাঁর স্ত্রী সরযু দেবী ভাড়ায় থাকতেন এই ঘরে।
ছোটবেলায় রানীদি এবং তারপরে মা কে হারিয়ে সুকান্তের বেশিরভাগ সময় এই সরযু দেবীর স্নেহাশ্রয়েই কেটেছে।
কে জি বোসের ছেলে দীপঙ্কর বোস ওরফে বাবু বোস আমাকে এই ঘরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সুকান্তের একটি সুন্দর স্মৃতিকথা শোনালেন। যেটি তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে শুনেছিলেন,
তাঁর বাবা কে জি বোস ছিলেন সুকান্তের বড়দা সুশীল ভট্টাচার্যের নিকট দোসর।
সুকান্তের কাছে বড় দাদার মতন।
একদিন সেই ঘরে
ঢুকে
কৃষ্ণগোপাল বেশ খানিকটা বিস্মিত
হলেন, কিঞ্চিৎ বিরক্তও। এমন করে ঘরের মধ্যে কে কী লিখে রেখেছে দেয়ালের গায়ে! চুনকাম করা দেয়ালের ওপরে লেখার কালো আঁচড় গুলো সহজেই যে কারোর চোখে পড়ে
যাবে। সম্ভবত কাঠ কয়লা দিয়ে লেখা। কাছে গিয়ে দেখলেন –
একটা ছড়া লেখা রয়েছে চার লাইনের। দেয়ালে
দেয়ালে, মনের খেয়ালে/ লিখি কথা।/ আমি যে বেকার, হয়েছে লেখার/ স্বাধীনতা।। কে লিখল,
এমন! ঘরে থাকার মধ্যে মনমোহন ভট্টাচার্য ও তার স্ত্রী, তবে প্রায়শই সুকান্তকে
দেখা যায় বৌদি সরযু দেবীর কাছে যত্নআত্তি পেতে ছুটে আসে। সুকান্তকে নিয়ে কানাঘুষোয়
শুনেছেন বটে বন্ধু সুশীলের কাছে। কিন্তু ঘোড়ার মুখ থেকে না শোনা অব্দি শান্তি
হচ্ছিল না কৃষ্ণগোপালের। তাই ডাক পড়ল সুকান্তের।
সদ্য কিশোর, মাথায় এক ঝাঁক চুল নিয়ে লজ্জাবনত চোখে হাজির হল সুকান্ত। প্রসঙ্গান্তরে,
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় কিন্তু তার প্রথম সাক্ষাতেই সুকান্তের কবিত্বশক্তি নিয়ে নিঃসংশয়
হয়েছিলেন, বিডন স্ট্রীটের চায়ের দোকানে তাঁদের প্রথম দেখা। ভারত সভা হলে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ পর্বেরও আগে। আসলে বন্ধু
মনোজ ভট্টাচার্য খানিকটা সন্দেহভঞ্জনের কারণেই, খুড়তুতো ভাই সুকান্তকে সেদিন
সুভাষের সামনে এনে হাজির করিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে
সুকান্তের কবিতার খাতা পড়ে যারপরনাই অবাক হয়েছেন তাঁরা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে এমন পরিণত লেখা সম্ভব কিনা তাই নিয়ে বিস্ময়ের
রেশ যেন কাটছিল না কিছুতে। অবশেষে সে সংশয় দূর হল, চায়ের আড্ডায় উপস্থিত সুকান্তের চোখের দিকে তাকিয়েই
সেদিন সুভাষ বুঝলেন সুকান্তের কবিত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। তবে ঠিক কোন
কারণে এমনটা তাঁর মনে হয়েছিল সেটা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারবেন
না, এমনটাই লিখেছিলেন সুভাষ তাঁর সুকান্ত সমগ্র’র ভূমিকাতে।
এক্ষেত্রে যদিও সুভাষ মুখোপাধ্যায় নয়, সুকান্তের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষ্ণগোপাল বোস;
যিনি আবার সুকান্তের মুখ থেকে হ্যাঁ বা না কিছু শোনা অবধি ছাড়বেন না। তাই গম্ভীর হয়ে
জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী তুই লিখেছিস দেয়ালে, সুকান্ত? সুকান্ত মাথা নীচু করে চুপ
করে দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো উত্তর দেয় না।
এই প্রসঙ্গে বলে নিই এত বছর বাদে ঘরটিতে ছোট বড় একাধিক কুলুঙ্গি সহ মূল গঠন শৈলীতে
কোনরূপ বদল না হলেও, কালের গতিতে দেয়াল গুলোতে কিন্তু বহুবার রঙের পোঁচ পড়েছে, তাই
সুকান্তের হাতের লেখার সাক্ষর আর দেয়ালটির গায়ে দেখা যায় না। প্রসঙ্গত সুকান্তের
হাতের লেখা সম্বলিত যে সব চিঠি পত্র (বেশীরভাগই বন্ধু অরুণাচল বসুর উদ্দেশ্যে
লেখা) বা পাণ্ডুলিপি গুলো দেখা গেছে তাতে
কিন্তু তাঁর লেখার ধরনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখার সাদৃশ্য বেশ খুঁজে পাওয়া
যায়। সুকান্তের সমসাময়িক বামপন্থী সাংবাদিক ও বিশিষ্ট কবি সিদ্ধেশ্বর সেন, যিনি
সুকান্তের (ভবানী দত্ত লেন স্থিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন এর অন্যতম শাখা
সংগঠন কিশোর বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কবি হন সুকান্ত, ১৯৪৫ সালে) বি পি এস এফ সংযোগ সময়
থেকে শুরু করে ডেকার্স লেন থেকে প্রকাশিত দলীয়
মুখপত্র স্বাধীনতা য় কিশোর সভার সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার সময়কাল অবধি এমনকি তার
পরেও আমৃত্যু সহচর ছিলেন, সেই তাঁর স্মৃতিচারণাতেও এই মিল থাকার কথা উঠে এসেছে।
একান্ত রবীন্দ্র ভক্ত সুকান্ত যিনি কবি প্রয়াণের (১৯৪১ এর ৭ই আগস্ট) এক বছর বাদে প্রিয়
কবির প্রতি স্মৃতি তর্পণ করে ‘প্রথম বার্ষিকী’(পূর্বাভাস) নামে একটি কবিতা লিখছেন বেলেঘাটার
৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে বসে, তোমার চরণ স্পর্শে রোমাঞ্চিত পৃথিবীর ধুলি/ উঠিছে
আকুলি,/ আজিও স্মৃতির গন্ধে ব্যথিত জনতা/ কহিছে নিঃশব্দ স্বরে একমাত্র কথা/ “তুমি
হেথা নাই”; আবার ‘পঁচিশে বৈশাখের উদেশে” তে (‘ঘুম নেই’ কাব্যগ্রন্থ) ব্যক্ত করছেন
তাঁর রবি অনুরাগের অধীর আকুতির কথা, “আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ,/ আর একবার
তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের।“, সেই সুকান্ত তাঁর আপন লিখনশৈলী বা কাব্য বিষয়ভাবনাতে
যদিওবা রবীন্দ্র ছাপ থেকে মুক্তির জন্যে যথাসাধ্য করলেন কিন্তু হাতের লেখার
ক্ষেত্রে যেন তাকেই আত্মকৃত করে ফেললেন নিজের অজান্তে। সিদ্ধেশ্বর সেন, সুকান্তের নারকেলডাঙা মেন রোডের বাড়িতে
গিয়ে প্রায়শই সুকান্তের ফরমায়েসে রবীন্দ্রসংগীত শুনিয়ে আসতেন, সুকান্ত তখন প্রায়ই
জ্বরে ভুগছেন, হাঁটাহাঁটি বাইরে বেরনো বন্ধ, বিছানায় শুয়ে শুয়েই সিদ্ধেশ্বরের গলায়
রবীন্দ্রগান শোনেন। এমনকি সুকান্ত তাঁর প্রিয় রবীন্দ্রগানের লাইনগুলি কখনো কখনো
নিজের হাতে লিখে দিতেন সিদ্ধেশ্বরকে। সেই কপি স্মৃতি হিসেবে সিদ্ধেশ্বর রেখে
দিয়েছিলেন তাঁর কাছে। যেটা দেখে সিদ্ধেশ্বরের মনে হয়েছে সুকান্ত যেন রবীন্দ্রনাথেরই
লিপি মকসো করেছেন প্রায়। রবীন্দ্রনাথ যেমন গোটাগোটা, সুন্দর লিখতেন তেমনি।
এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ও সুকান্তের মধ্যে জন্ম মৃত্যু গত তারিখের দিক থেকেও একটি অদ্ভুত
সংযোগ রয়েছে বলে জানালেন ৩৯ নং হর মোহন ঘোষ লেনের বর্তমান বাসিন্দা তথা ফুলবাগান
সুকান্ত জন্মোৎসব সমিতির দীর্ঘদিনের সম্পাদক দীপঙ্কর বাবু ওরফে বাবু বোস। কারণ কাকতালীয়
হলেও রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এবং সুকান্তের মৃত্যুদিন পড়ে একই মাসে যথাক্রমে ২৫শে
বৈশাখ এবং ২৯ শে বৈশাখ তারিখে; আবার একই
ভাবে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন এবং সুকান্তের জন্মদিনের দিকে তাকালেও দেখা যায় সেই
তারিখ গুলি যথাক্রমে ২২শে শ্রাবণ এবং ৩০ শে শ্রাবণ।
বেলেঘাটার হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়ি থেকে সুকান্ত তাঁর বন্ধু
অরুণাচল বসুকে একটি চিঠিতে লিখছেন, কোলকাতা যেন তাঁর কাছে এক রহস্যময়ী নারী, যাকে তিনি
তাঁর প্রিয়ার মতন ভালোবাসেন । চিঠি প্রেরণের তারিখ (২১ শে পৌষ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) অনুসারে, ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাস তখন; কোলকাতার আকাশে জাপানী বোমারু বিমানের হানা
দেওয়ার আশঙ্কা, ষোড়শ বর্ষীয় কিশোর
সুকান্তকে তাঁর প্রিয় শহরের আয়ু নিয়ে ক্রমশ সন্দিহান করে তুলেছে। তিনি রবীন্দ্র
কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “মৃত্যু
ঘনিয়ে আসছে, কখন কোলকাতার অদূরে জাপানী বিমান দেখে আর্তনাদ করে উঠবে সাইরেন – সম্মুখে মৃত্যুকে দেখে, ধ্বংসকে দেখে,
প্রতিটি মুহূর্ত এগিয়ে চলেছে বিপুল সম্ভাবনার দিকে”।
একই চিঠিতেই সুকান্ত আবার উপক্রমনিকা নামে এক মেয়ের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথাও
লিখে জানাচ্ছেন বন্ধুকে। “তার তীব্র শারীরিকতায় – তার বিদ্যুৎময় ক্ষণিক দেহ-
ব্যঞ্জনায়, আমি যেন যেতে-যেতে থমকে দাঁড়ালাম, স্তব্ধতায় স্পন্দিত হতে লাগলাম
প্রতিদিন”। এ যেন ধ্বংসের আতঙ্ক আর পূর্বরাগের আবেশ একযোগে দুই বৈপরীত্যের টানাপড়েন
সুকান্তের কিশোর মনকে ক্রমাগত অনুভবের সংঘাতে বিশ্লিষ্ট করে চলেছে, যার নিরন্তর সাক্ষী থেকেছে ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেন। যেখানে
তিনি একান্ত নিবিড় অনুধ্যানে ডুবে থেকেছেন তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’র মধ্যে। কখনো
তুলে নিয়েছেন অগ্রজ কবি বুদ্ধদেব বসুর লেখা কাব্যগ্রন্থ বা মনীন্দ্রলাল বসুর লেখা ‘রক্তকমল’
এর মত বইগুলি। এরই পাশাপাশি কখনো কখনো নিজের কবিসত্তার বিচ্ছুরণ ঘটাতে বেছে
নিয়েছেন বাড়ির পরিচ্ছন্ন সাদা দেয়াল গুলোকেই। অনু কবিতার ফরম্যাটে, ন্যুনতম দুই
লাইন থেকে শুরু করে অধিকতম পাঁচ লাইনের মধ্যে লেখা এই ছড়া গুলি তাঁর পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থে
অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘দেয়ালিকা’ শিরোনামে। যেখানে মোট আটখানা ছড়া রয়েছে, যার মধ্যে
প্রথম ছড়াটি তিনি লিখেছিলেন ৩৯ নং হরমোহন ঘোষ লেনের কে জি বোসের বাড়ির দেয়ালে। বর্তমানে
যার স্মৃতিকে ধরে রাখাতে কৃষ্ণগোপাল বোসের ছেলে দীপঙ্কর বোস সেই চার লাইনের কবিতাটিকে
কম্পিউটারে ছেপে দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছেন, সেই পূর্ব দিকের দেয়ালেই – যেখানে সুকান্ত প্রকৃত লিখেছিলেন।
সুকান্তের এ হেন দেয়াল কাব্য কীর্তিতে কিন্তু কৃষ্ণগোপাল ওরফে কে জি বোস একেবারে আপ্লুত না হয়ে পারেননি। তাই পরের দিনই ট্রাম কোম্পানি থেকে এক গুচ্ছ এক দিক ছাপা কাগজের তাড়া কিনে এনে সুকান্তের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, এবার থেকে যা লেখার কাগজেই লিখিস।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন