মেঘের মুখে পারদ আভা, কোথাও তা তাল গাত্রের মত কৃষ্ণকায়, কোথাও আবার স্তিমিত রোদের ক্লান্তি মাখা। বৃষ্টিবতী ঋতু শ্রাবণের মেঘাক্ত আকাশ, উপুড় করা উপবৃত্তাকার
ফুল সাজির মত পুষ্প সম বারিবিন্দু ঝরায়, কখনো মন্দ্র কখনো তুঙ্গ নাচনে। রবিহীনতার রৌদ্রহীন দশা করুণ অভিমানে তাকে মৃত্তিকার কাছে সুগচ্ছিত রাখে; পথ থেকে পথান্তরে ঝরে পড়া সে অভিসার চিহ্ন চিতার লীনতাপ নিয়ে উবে যেতে ছুটে যায় অন্তিম দহনের পথে।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, চিৎপুর রোড, কলুটোলা স্ট্রিট হয়ে কলেজ স্ট্রিট, তারপরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট এবং সবশেষে নিমতলা মহাশ্মশানের অগ্নিপথে মহা উড়ান।
শায়িত রবি, কুসুমাবৃত; জরিদার বেনারসির পরিধান, তার পরে বেল জুঁই কাঁড়ি কাঁড়ি। সঙ্গে পূর্ণ বিকশিত সিতপদ্ম এবং নৈশগন্ধার নিবিড় সমাবেশ। পায়ের কাছে কাঁঠালচাঁপা ফুলের শ্রদ্ধা নিষ্ঠ সমর্পণ, পুত্র রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবী সেই নিবেদনের নেপথ্যে। কণ্ঠ থেকে আপাদলম্বিত রজনীগন্ধার মাল্য ভূষণ। বৃষ্টিপাতের মধুর রসায়নে সে পুষ্পশতদল সিঞ্চন স্নিগ্ধ, মিষ্টি সুরেলা সুগন্ধে সুবাসিত।
দুপুর ১২ টা ১০, তাঁর চির অস্তাচলে যাওয়ার সংবাদ ঘোষিত হতেই, নন্দলাল বসু রাজ পালঙ্ক নির্মাণের চুড়ান্ত রূপ দিতে ব্রতী হলেন। সাহিত্যের আকাশে সদা শাশ্বত রবির পার্থিব অন্তর্ধান যেন দরবার থেকে রাজার বিদায় নেওয়া, রাজ প্রস্থানের বিদায় যাত্রা তাই রাজকীয় হওয়াই বাঞ্জনীয়; নন্দলাল উচ্চ কণ্ঠে হেঁকে উঠলেন, রাজার রাজা আজ তাঁর শেষ নগর পরিক্রমায় যাবেন, সমারোহে কোনো কমতি কাম্য নয়; উচ্চারণে আবেগের বাষ্পভার তাঁর কণ্ঠকে নিবিড় দলনে কম্পিত করে গেল।
দোতলার ঘরে শেষ বারের মত রবি-স্নান সম্পন্ন হতে তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হল সোনালী পাড়ের ঘৃত বর্ণ বেনারসির কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবী, হাঁটু পর্যন্ত বিস্তৃত বেনারসির উত্তরীয়। বুকের ওপর জড়ো করা দুটি হাতের মাঝে গুঁজে দেওয়া হল হরিৎ মৃণাল নির্গত শ্বেত কমল কোরক।
কিন্তু ভরা বাদল দিনে এমন তো কথা ছিল না, নিঝুম শয়নে শায়িত থেকে লক্ষ কণ্ঠে নিরলস গর্জিত হওয়া 'জয় বিশ্বকবি জয়' কিংবা 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি এমন করে তাঁর নির্গত প্রানের দ্বারে নিরন্তর ব্যর্থ কুঠারাঘাত করে যাবে! তিনি তো চেয়েছিলেন কোলকাতার উন্মত্ত কোলাহল থেকে বেঁচে শান্তিনিকেতনের
খোলা নিভৃতে শুকনো পাতা কিংবা পাকা সুপারির মতন মাটির সাথে মিশে যেতে। তাঁর এই শেষ ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছিলেন শিক্ষাবিদ হেরম্ব চন্দ্র মৈত্রের কন্যা তথা বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের সহধর্মিণী নির্মলকুমারী মহলানবিশ (রানী) কে, যিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে কবির পাশে সবসময় উপস্থিত থেকেছেন এবং তাঁর সেবা করেছেন। মজা করে কবি যাকে 'হেডনার্স' বলে ডাকতেন।
কবি তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখছেন, বর্ষা ঋতু আসলে বাল্যকালের ঋতু। “শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘনবৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মনের ভিতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে। একটু যেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন এই বৃষ্টির বিরাম না হয়।"
শৈশবের সেই বিরামহীন বৃষ্টির স্মৃতি যা কবির কাছে নিবিড় নিদ্রার চেয়েও প্রিয়, তবে কী এই অবিরাম শ্রাবণ ধারায় পুনরায় তিনি তাঁর কাঙ্খিত পুলক যেচে ফিরে আসতে চান চির নিদ্রার দেশ ছেড়ে?
বেলা তিনটার কিছু পরে তাঁর জাগতিক শেষ যাত্রার শুরু, লক্ষ মানুষের ভিড়; নন্দলালের নকশা কাটা পালঙ্কে সোনালী বুটির সিল্কের চাদর ঢাকা, তাতে ঈশ্বরীয় ভঙ্গিমায় শায়িত কবি প্রায় ভেসে ভেসে চলেছেন, কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া, পুঁটীরামের মিষ্টান্ন, প্যারাডাইসের শরবত বিপণি ছাড়িয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ, বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজ এবং অবশেষে সেই গঙ্গা তীরের ঐতিহাসিক অন্তিমকৃত্য স্থল।
বিকেল ৫ টা ৪০ তখন, শুরু হল আবার বারি বর্ষণ, হয়তো কবি এই ক্ষণটির জন্যেই লিখে গিয়েছিলেন গানের এই কথাগুলি, “আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে/ গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে।" (গীতবিতান, বর্ষা পর্ব)
প্রসঙ্গত মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ নিমতলা শ্মশান অবধি আসতে পারেননি, তাই মুখাগ্নি করার গুরু দায়িত্ব পালন করেন ভ্রাতুষ্পুত্র সুবিরেন্দ্রনাথ।
কিন্তু ততক্ষণে কবির ললাটে অঙ্কিত শ্বেত চন্দন ফোঁটা সম্পূর্ণ বিস্রস্ত এবং দ্রবীভূত; কারণ অনবরত বাড়ির ছাদ থেকে পুষ্প চূর্ণ এবং আকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বারি বিন্দু নিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে।
একই ভাবে ফুটপাতে ঝরা কদম্ব ফুলও যে কখন লক্ষ মানুষের পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, তার হিসেব কেই বা রেখেছে। জানা নেই প্রিয় নীপ শাখা থেকে কোনো সুনন্দ টোপর পুষ্প,
'বরবেশী' কবি বক্ষে ঝরেছিল কিনা সেদিন!
শেষ যাত্রায় সেই অগণিত শুভ্র ফুলশয্যাতেও কী তবে অধরা থেকে গেল "স্মিতবিকশিত বয়নে/ কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে"র কবি কল্পনা!
তথ্যসূত্র -
বাইশে শ্রাবণ, নির্মলকুমারী মহলানবিশ।
বাইশে শ্রাবণ এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনা নিয়ে আকর্ষণীয় লেখা পড়তে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে -
নিরন্তর শ্রাবণ ধারায় জায়মান ২২শে'র শোক!
"ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে ...!"
২২শে শ্রাবণ ও এক ক্রেজি ভিড়ের নেপথ্য কথা!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন