সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

"গেল রে দিন বয়ে!"

মেঘের মুখে পারদ আভা, কোথাও তা তাল গাত্রের মত কৃষ্ণকায়, কোথাও আবার স্তিমিত রোদের ক্লান্তি মাখা। বৃষ্টিবতী ঋতু শ্রাবণের মেঘাক্ত আকাশ, উপুড় করা উপবৃত্তাকার ফুল সাজির মত পুষ্প সম বারিবিন্দু ঝরায়, কখনো মন্দ্র কখনো তুঙ্গ নাচনে। রবিহীনতার রৌদ্রহীন দশা করুণ অভিমানে তাকে মৃত্তিকার কাছে সুগচ্ছিত রাখে; পথ থেকে পথান্তরে ঝরে পড়া সে অভিসার চিহ্ন চিতার লীনতাপ নিয়ে উবে যেতে ছুটে যায় অন্তিম দহনের পথে।


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, চিৎপুর রোড, কলুটোলা স্ট্রিট হয়ে কলেজ স্ট্রিট, তারপরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট এবং সবশেষে নিমতলা মহাশ্মশানের অগ্নিপথে মহা উড়ান।

শায়িত রবি, কুসুমাবৃত; জরিদার বেনারসির পরিধান, তার পরে বেল জুঁই কাঁড়ি কাঁড়ি। সঙ্গে পূর্ণ বিকশিত সিতপদ্ম এবং নৈশগন্ধার নিবিড় সমাবেশ। পায়ের কাছে কাঁঠালচাঁপা ফুলের শ্রদ্ধা নিষ্ঠ সমর্পণ, পুত্র রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবী সেই নিবেদনের নেপথ্যে। কণ্ঠ থেকে আপাদলম্বিত রজনীগন্ধার মাল্য ভূষণ। বৃষ্টিপাতের মধুর রসায়নে সে পুষ্পশতদল সিঞ্চন স্নিগ্ধ, মিষ্টি সুরেলা সুগন্ধে সুবাসিত।

দুপুর ১২ টা ১০, তাঁর চির অস্তাচলে যাওয়ার সংবাদ ঘোষিত হতেই, নন্দলাল বসু রাজ পালঙ্ক নির্মাণের চুড়ান্ত রূপ দিতে ব্রতী হলেন। সাহিত্যের আকাশে সদা শাশ্বত রবির পার্থিব অন্তর্ধান যেন দরবার থেকে রাজার বিদায় নেওয়া, রাজ প্রস্থানের বিদায় যাত্রা তাই রাজকীয় হওয়াই বাঞ্জনীয়; নন্দলাল উচ্চ কণ্ঠে হেঁকে উঠলেন, রাজার রাজা আজ তাঁর শেষ নগর পরিক্রমায় যাবেন, সমারোহে কোনো কমতি কাম্য নয়; উচ্চারণে আবেগের বাষ্পভার তাঁর কণ্ঠকে নিবিড় দলনে কম্পিত করে গেল।

দোতলার ঘরে শেষ বারের মত রবি-স্নান সম্পন্ন হতে তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হল সোনালী পাড়ের ঘৃত বর্ণ বেনারসির কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবী, হাঁটু পর্যন্ত বিস্তৃত বেনারসির উত্তরীয়। বুকের ওপর জড়ো করা দুটি হাতের মাঝে গুঁজে দেওয়া হল হরিৎ মৃণাল নির্গত শ্বেত কমল কোরক।

কিন্তু ভরা বাদল দিনে এমন তো কথা ছিল না, নিঝুম শয়নে শায়িত থেকে লক্ষ কণ্ঠে নিরলস গর্জিত হওয়া 'জয় বিশ্বকবি জয়' কিংবা 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি এমন করে তাঁর নির্গত প্রানের দ্বারে নিরন্তর ব্যর্থ কুঠারাঘাত করে যাবে! তিনি তো চেয়েছিলেন কোলকাতার উন্মত্ত কোলাহল থেকে বেঁচে শান্তিনিকেতনের খোলা নিভৃতে শুকনো পাতা কিংবা পাকা সুপারির মতন মাটির সাথে মিশে যেতে। তাঁর এই শেষ ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছিলেন শিক্ষাবিদ হেরম্ব চন্দ্র মৈত্রের কন্যা তথা বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের সহধর্মিণী নির্মলকুমারী মহলানবিশ (রানী) কে, যিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে কবির পাশে সবসময় উপস্থিত থেকেছেন এবং তাঁর সেবা করেছেন। মজা করে কবি যাকে 'হেডনার্স' বলে ডাকতেন।

কবি তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখছেন, বর্ষা ঋতু আসলে বাল্যকালের ঋতু। “শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘনবৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মনের ভিতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে। একটু যেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন এই বৃষ্টির বিরাম না হয়।"

শৈশবের সেই বিরামহীন বৃষ্টির স্মৃতি যা কবির কাছে নিবিড় নিদ্রার চেয়েও প্রিয়, তবে কী এই অবিরাম শ্রাবণ ধারায় পুনরায় তিনি তাঁর কাঙ্খিত পুলক যেচে ফিরে আসতে চান চির নিদ্রার দেশ ছেড়ে?

বেলা তিনটার কিছু পরে তাঁর জাগতিক শেষ যাত্রার শুরু, লক্ষ মানুষের ভিড়; নন্দলালের নকশা কাটা পালঙ্কে সোনালী বুটির সিল্কের চাদর ঢাকা, তাতে ঈশ্বরীয় ভঙ্গিমায় শায়িত কবি প্রায় ভেসে ভেসে চলেছেন, কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া, পুঁটীরামের মিষ্টান্ন, প্যারাডাইসের শরবত বিপণি ছাড়িয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ, বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজ এবং অবশেষে সেই গঙ্গা তীরের ঐতিহাসিক অন্তিমকৃত্য স্থল।

বিকেল ৫ টা ৪০ তখন, শুরু হল আবার বারি বর্ষণ, হয়তো কবি এই ক্ষণটির জন্যেই লিখে গিয়েছিলেন গানের এই কথাগুলি, “আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে/ গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে।" (গীতবিতান, বর্ষা পর্ব)

প্রসঙ্গত মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ নিমতলা শ্মশান অবধি আসতে পারেননি, তাই মুখাগ্নি করার গুরু দায়িত্ব পালন করেন ভ্রাতুষ্পুত্র সুবিরেন্দ্রনাথ।

কিন্তু ততক্ষণে কবির ললাটে অঙ্কিত শ্বেত চন্দন ফোঁটা সম্পূর্ণ বিস্রস্ত এবং দ্রবীভূত; কারণ অনবরত বাড়ির ছাদ থেকে পুষ্প চূর্ণ এবং আকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বারি বিন্দু নিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে।

একই ভাবে ফুটপাতে ঝরা কদম্ব ফুলও যে কখন লক্ষ মানুষের পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, তার হিসেব কেই বা রেখেছে। জানা নেই প্রিয় নীপ শাখা থেকে কোনো সুনন্দ টোপর পুষ্প, 'বরবেশী' কবি বক্ষে ঝরেছিল কিনা সেদিন! 
শেষ যাত্রায় তাই অগণিত শুভ্র ফুলশয্যাতেও কী তবে অধরা থেকে গেল "স্মিতবিকশিত বয়নে/ কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে"র কবি কল্পনা! 


তথ্যসূত্র -
বাইশে শ্রাবণ, নির্মলকুমারী মহলানবিশ।


বাইশে শ্রাবণ  এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনা নিয়ে আকর্ষণীয় লেখা পড়তে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে -
নিরন্তর শ্রাবণ ধারায় জায়মান ২২শে'র শোক! 
"ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে ...!"
২২শে শ্রাবণ ও এক ক্রেজি ভিড়ের নেপথ্য কথা! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট, কোথায় ছিলেন গান্ধীজী?

১৫০/বি বেলেঘাটা মেন রোড; শিয়ালদহ স্টেশন ও ই-এম বাইপাস এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম মূল রাস্তা - বেলেঘাটা মেন রোড তথা সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রোডের ওপর পড়া এই বিশেষ ঠিকানাটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে । বিশেষ করে, প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় আসন্ন হলে, এই ঠিকানার কথা স্মরণ না করে থাকা যা য় না। কারণ ১৯৪৭ এ গোটা দেশ যখন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, বিশেষ করে রাজধানী দিল্লিতে স্বাধীনতা লাভের (১৫ ই আগস্ট) দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে আয়োজিত হয়েছে অভূতপূর্ব রাজকীয় সমারোহের - যার শুভ সূচনা হয়েছে ১৪ ই আগস্টের মধ্যরাতে, রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে - ১৫ তারিখ পদার্পণের শুভক্ষণ কে স্মরনীয় করে রাখতে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে শুভারম্ভ হয়েছে স্বাধীনতা দিবস পালনের মহা নির্ঘণ্ট। এই উচ্ছ্বাস যদিও কাঙ্ক্ষিতই ছিল। কারণ দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরেই দেশবাসীর কাছে এসে পৌঁছেছিল সে বিরল মাহেন্দ্রক্ষণ। সমাগত হয়েছিল সেই মহা মুহূর্ত যখন প্রায় শতবর্ষ ধরে চলা স্বাধীনতাকামী মহাযজ্ঞে মু...