কোলকাতার বৃষ্টির একটা আলাদা চার্ম রয়েছে, বাতাসে ভাসমান ধোঁয়া ধুলো সব বৃষ্টির ফোঁটায় অধঃক্ষিপ্ত হয়ে মাটিতে নেমে আসে, তাতে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স এর(AQI) মান যেমন শুদ্ধ হয় তেমনি আকাশের ধোঁয়াশা ভাব কেটে চারিদিকের নজারা একেবারে সাফসুতরো আয়নার মতো হয়ে যায়। চারপাশের ঘরবাড়ি সৌধ ফুটপাত গাছপালা ইত্যাদিকে তখন মনে হয় যেন সদ্য স্নান সেরে আসা তীর্থযাত্রী; লাইন বেঁধে একে একে সব দাঁড়িয়ে পড়েছে তাদের ক্লান্তিহীন ঝরঝরে মুখগুলিকে দেখাতে; শহুরে ধুলোকালির প্রসাধন মুক্ত, পুরোদস্তুর সতেজ এবং সজীব হয়ে।
কিন্তু ঐ পর্যন্তই, কংক্রিটের আস্তরণে মোড়া কোলকাতার মাটির সঙ্গে এই বৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। হুগলি নদীর পূর্ব পাড়ে পত্তন হওয়া এই শহর শেষ কবে বৃষ্টির উন্মুক্ত পতনকে আপন বুকে জায়গা করে দিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কোলকাতার মাটি ঠিক কোন্ প্রকৃতির এই ভেবে তাঁর গভীর বিস্ময়ের কথা ব্যক্ত করে গেছেন তাঁর কবিতায়। সকলেই তো আর ব্রিগেডের মাঠ কিংবা সাইন্স সিটি সংলগ্ন ধাপার মাঠে গিয়ে কোলকাতার মাটি কেমন তা পরখ করে দেখবেন এমনটা নয়। তাই কোলকাতার বৃষ্টি মৃত্তিকা স্পর্শী নয়, তা কংক্রিট স্পর্শী এবং নালাগামী। গভীর, অগভীর নানা নালা পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত তার গঙ্গা প্রাপ্তি হয়; মাটির সঙ্গে মিশে সোঁদা গন্ধে মদির করে তুলবে চারিদিক এমন সৌভাগ্য কোলকাতা শহরে পড়া বৃষ্টি বিন্দুদের কোথায়!
কিন্তু বৃষ্টিরও তো নরমপন্থী চরমপন্থী আছে, সেখানে কেউ হয়তো বোঁটা খসা শিউলির মতো নরম আর নীরব, কেউ আবার মেঘ ভাঙা সশব্দ বাণধারা। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি হলে কিন্তু খোলা জানালায় বসে মিষ্টি মিষ্টি বৃষ্টি মিছিল দেখে সময় গুজরান করার আবেশ বেশীক্ষন টিকবে না; যে কোনো সময়ে তা কেটে ক' হয়ে যেতে পারে। কারণ দিনের শেষে শহর আসলে রাস্তাজীবীই, সেখানে দোকান বাজার অফিস যাওয়াটা বাধ্যতামূলক, বিপদের দিনে ঘরে বসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম চললেও, অনলাইনে অর্ডার করা খাবার পৌঁছে দিতে কোন ডেলিভারি বয়ই বা আসবে নৌকা বেয়ে। আসলে রাস্তায় যদি প্রবল জল সমাগম ক্রমে ক্রমে জল প্লাবনে পর্যবসিত হয় তো বুঝুন কোলকাতায় কেন বৃষ্টিপাতের
লিমিট টানা জরুরি। প্রতি ভারী বৃষ্টির পরে যদি রাজপথ রাজ নালায় পরিনত হয়ে যায়, তো সে জল ছপছপ হন্টন হোক কী স্রোত ভাঙা যান চলাচল, ফুটপাতে তো তার ঢেউ উঠবেই।
ছোটবেলায় দাদার সঙ্গে একবার আলিপুর চিড়িয়াখানায় গিয়ে ফেরার পথে ভারী বৃষ্টি শুরু হলো, ইয়া বড় বড় ফোটা, একটা দোকানের চালার নীচে দাঁড়িয়ে দেখছি বৃষ্টি ফোঁটাগুলো সামনের পিচ রাস্তার উপরে সশব্দে আছড়ে আছড়ে পড়ছে আর ফেটে ছিতরে যাচ্ছে। কোলকাতার রাজপথ বলে কথা, সেখানে বৃষ্টি পড়ছে, খুব তারিয়ে তারিয়ে দেখছিলাম যেন এর আগে বৃষ্টি পড়া কখনো দেখিনি। ভাগ্য ভালো সেদিন বৃষ্টি বেশীক্ষন স্থায়ী হয়নি, প্রাথমিক আলাপ সেরেই ফিরে গিয়েছিল।
তারপরে কতবছর পেরিয়ে গেছে, এরমধ্যে কোলকাতাকে বহুবার বৃষ্টিভাসি হতে দেখেছি। জল ভেঙে ভেঙে কোলকাতার জলবন্দি রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার রোমাঞ্চ ইংলিশ চ্যানেল পার করার থেকে কম ভয়ঙ্কর নয়।
পরিশেষে এই বছরের কোলকাতায় বৃষ্টি কথা দিয়ে লেখা শেষ করবো। বেশ বিচিত্র রকমের বৃষ্টির প্যাটার্ন এবার কোলকাতায়, ধরুন বালিগঞ্জে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি হচ্ছে, গড়িয়াহাটে
ফুটপাতের হকারদের চালা বেয়ে গলগল করে বৃষ্টির জল নেমে আসছে। মাথা বাঁচানোর জন্যে ছাতাহীন মানুষদের মধ্যে চলছে চরম দৌড়াদৌড়ি, বাসন্তী দেবী কলেজের গেটের মুখে থাকা বুড়ো কৃষ্ণচূড়া গাছটির গুঁড়ি বেয়ে স্রোতের মতো জলের ধারা নামছে, কদম গাছের পাতা গুলো ভিজে লতপত করছে, পথচলতি বাসের খিড়কি সবকটিই জম্ করে বন্ধ, অটোর যাত্রীরা জোর করে পর্দা টেনে রাখার চেষ্টা করেও বৃষ্টির ছাঁট থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছে না, একই চিত্র শিয়ালদহ স্টেশনেও, কোর্ট সম্মুখে প্রায় গোড়ালি ডোবা জল, সেটা ভেঙ্গেই লোকজন চলেছে স্টেশন অভিমুখে, সবজি লেবু মুসম্বি ইত্যাদি নিয়ে বসা হকাররা ঝুঁড়ি ফেলেই পাশে মেট্রো রেল বিল্ডিং এর ছাদের তলায় উঠে গেছেন, লিট্টি বিক্রির ঠেলা, তার চাকা ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে বাড়তে থাকা জলে।
ট্রেনেও তাই বৃষ্টির জন্যে কেউ গেটের বাইরে ঝুলছে না, কিন্তু যাদবপুরে নেমে দেখি প্লাটফর্ম শুকিয়ে ঠা ঠা, বৃষ্টিই হয়নি। এই ঘটনা কিন্তু বেশ কয়েকটি বর্ষার দিনেই পরিলক্ষিত হলো, তাহলে কী মধ্য কোলকাতা পেরোনোর আগেই জল ভরা মেঘ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না, গড়গড়িয়ে ভেঙে পড়ছে আকাশ থেকে?



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন