সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

'জয়া আর শারমিন', লকডাউনের ছবি জিতে নিল সেরার স্বীকৃতি!

‘জয়া আর শারমিন’ বিপর্যয়ের দিনে নৈকট্যে আসা দুই মহিলার সম্পর্ককে ঘিরে বিরহমধুর যাপনপ্রবাহের ছবি; কোভিড সময়ের ঘরবন্দী দুই সমবয়সী মহিলার একজন গৃহকর্ত্রী, আর অন্যজন তার পরিচারিকা, জয়া আর শারমিন সামাজিক অবস্থানের বিচারে দুই মেরুতে থাকলেও লকডাউন চলাকালীন তাদের পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠার গল্প, তাতে নানা ওঠাপড়া থাকে, কিন্তু শুধু উপয়ান্তরহীনতার বাধ্যবাধকতায় তা বাঁধা থাকে না; বরং এক মায়াময় আকর্ষণের সুতো বাঁধা থাকে শেষ পর্যন্ত, যে কারণে শুধুমাত্র ক্লিনিক্যাল দূরত্ব রক্ষার কারণে যখন বিচ্ছেদের আকস্মিক অবতারণা ঘটে তখন তা অনুভবের স্রোতকে প্রখর বেদনাতুর করে তোলে।
বাংলাদেশের পিপলু আর খান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘জয়া আর শারমিন’এ এমনই হৃদয়স্পর্শী প্রাঞ্জল চিত্র রুপায়ণ দেখে মুগ্ধ হলেন কোলকাতার সাধারন দর্শক থেকে সমালোচক এবং বিচারকেরা।  ৮ থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর অব্দি চলা পঞ্চম কোলকাতা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে সম্প্রতি এই ছবিটি দেখানো হয় কোলকাতার নন্দন ৩ প্রেক্ষাগৃহে। এটি ছাড়াও ইরান, শ্রীলঙ্কা, ভারত সহ মোট ছয়টি দেশ থেকে আরও ৯ টি বাছাই করা ছবি প্রদর্শিত হয় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি বিভাগে, যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ‘জয়া আর শারমিন’কেই বেছে নিয়েছেন ফেস্টিভ্যালের তিন সদস্য বিশিষ্ট বিচারক মণ্ডলী। 

পুরষ্কার হাতে জয়া আহসান। 
উল্লেখ্য ফেস্টিভ্যালের বিচারকেরা ছিলেন যথাক্রমে অধ্যাপক উজ্জ্বল চক্রবর্তী, রীতা দত্ত ও প্রদীপ কেনচানুরু।  ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব ইন্ডিয়া'র (এফ এফ এস আই ) পূর্বাঞ্চল শাখা এই চলচ্চিত্র উৎসবটির আয়োজন করে, ২০২২ সালে এর শুভ সূচনা হয়, এবার (২০২৬) ছিল পঞ্চম বর্ষ।  সংবাদে প্রকাশ, এবারে ১০ টি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি ছাড়াও তথ্যচিত্র সহ মোট ৩৮ টি ছবি প্রদর্শিত হয়ছে এই ছয় দিনে। বাংলাদেশ থেকে আসা অন্য আর একটি ছবি, ‘মামুনঃ ইন প্রেইজ অফ শ্যাডোজ’ পেয়েছে তথ্যচিত্র বিভাগে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সম্মান ‘জুরি মেনশন’। এটি পরিচালনা করেছেন মকবুল চৌধুরী। তথ্যচিত্র বিভাগে সেরা হিসেবে ‘হরিসাধন দাশগুপ্ত গোল্ডেন এ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে রণজিৎ রায় পরিচালিত, ‘ডলস ডোন্ট ডাইঃ পুতুলনামা’ নামক তথ্যচিত্রটি, দ্বিতীয় পুরষ্কার হিসেবে ‘হরিসাধন দাশগুপ্ত সিলভার এ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে দীপ ভুঁইয়া পরিচালিত তথ্যচিত্র, ‘রিভার ষ্টিল ফ্লোজ’।
তানজিন সাইয়ারার (লিলিয়ার ভূমিকায়) একটি ছোট্ট দৃশ্য ব্যতিত, ‘জয়া আর শারমিন’ এ মাত্র দুটি চরিত্রকেই দেখা যায় সারা ছবিতে; যেখানে জয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন স্বয়ং অভিনেত্রী জয়া আহসান এবং শারমিনের ভূমিকায় মঞ্চাভিনেত্রী মহসিনা আখতার, যার এটি প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় বলে খবরে প্রকাশ। ৮৬ মিনিটের এই ছবিতে জয়া এবং শারমিনের মধ্যে পারস্পরিক মুগ্ধতার রসায়ন যেমন দর্শককে আপ্লুত করে তেমনি কিছু রূঢ় মুহূর্তে তৈরি হওয়া আহত অভিমান পর্বও ভারাক্রান্ত করে তোলে হৃদয়কে। অভিনেত্রী জয়া আহসান এটিকে তাঁর হৃদয়ের খুব কাছে থাকা ছবি বলে অভিহিত করেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া'র সাংবাদিক প্রিয়ঙ্কা দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জয়া বলেছেন, 'জয়া আর শারমিন' একটি সৎ এবং শুদ্ধ অনুভবের ছবি। 
উৎসবের শেষ দিনে, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ভারতের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক বিমল রায়ের নামাঙ্কিত ‘বিমল রায় গোল্ডেন 
এ্যাওয়ার্ড’  তুলে দেওয়া হয় ছবির সহ প্রযোজক তথা অভিনেত্রী জয়া আহসানের হাতে। মঞ্চে জয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ছবিটির চিত্রনাট্যকার জোহার মুসাভির জ্যোতিও। উল্লেখ্য জয়া আহসানের এটি প্রথম চিত্র প্রযোজনা, অভিনেত্রীর প্রযোজনা সংস্থা সি তে সিনেমা ছাড়াও ছবিটিকে সহ প্রযোজনা করেছেন গল্প রাজ্য ফিল্মসের পক্ষ থেকে আবু শাহেদ ইমন এবং অ্যাপলবক্স ফিল্মসের পিপলু আর খান। 
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বিভাগে দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব ‘বিমল রায় সিলভার এ্যাওয়ার্ড’ জিতে নিয়েছে অসমিয়া ভাষার ছবি ‘রিভার টেলস’,  এটি পরিচালনা করেছেন পঙ্কজ  বরা। শ্রীলঙ্কার ছবি ‘প্যানট্রাম’ পেয়েছে এই বিভাগের জুরি মেনশন এ্যাওয়ার্ড।
স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বিভাগে সেরা হয়েছে ধৃতিশ্রী সরকার পরিচালিত ছবি, ‘দ্যা টেল অব কথা’। স্বীকৃতি স্বরূপ ‘চিদানন্দ দাশগুপ্ত গোল্ডেন এ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেওয়া হয়েছে ছবিটির পরিচালকের হাতে। দ্বিতীয় সেরার স্বীকৃতি স্বরূপ ‘চিদানন্দ দাশগুপ্ত সিলভার এ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছে ইরানের ছায়াছবি ‘সাডেনলি রেইজ’।   

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...