ফুটবল, ব্যাট বল, বেসবল,
বাস্কেটবল ইত্যাদি যতরকমের খেলার বল রয়েছে সবেরই তো উৎপত্তি হয় ইংল্যান্ডে নয়
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে একেবারে এই বাংলার জল
হাওয়া ও মাটির গন্ধে জন্ম হওয়া এবং বেড়ে ওঠা ধাপাস বলের ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার
কাহিনী কিন্তু বেশ চমকপ্রদ।
ছোটবেলায় বাতাবী লেবুর গায়ে ধাপাস ধাপাস করে লাথি মেরে
উঠোনের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে পাঠানোর ছবি গ্রাম বাংলার জীবনে একটি অতি
পরিচিত আনন্দঘন মুহূর্তের অবতারণা করে আসছে আজন্মকাল। পরবর্তীতে কিশোর তরুণদের কাছে শিশুবেলার সেই সবুজ
এবং আপাত নরম স্বভাবের গোলাকরূপী বাতাবী লেবু পেটানোর উন্মাদনাই যে তাদের ফুটবল
খেলার প্রতি আগ্রহকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয় তাতে কোনো অতিশয়োক্তি নেই। মাঠে ঘাটে, বৃষ্টির জল কাদা ভেঙেই
চলে ফুটবল নিয়ে মাতামাতি, সঙ্গে পায়ের এবং শরীরের নানা কারুকাজ ও কারসাজি। কিন্তু সবই করতে হয় নিয়ম আর অনুশাসন মেনে; খেলোয়াড়দের তার বাইরে গেলে রেফারির হুইসল বেজে ওঠার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু নিয়মের নিগড়ে পড়ে যদি পায়ের সেই অবাধ ধাপাস-সুখ প্রাপ্তির আনন্দটাই নিরঙ্কুশ
না থাকে তবে আর রইলটা কী!
যদিও বাংলা তথা বাঙালির ফুটবল প্রীতি নিয়ে কোনো তর্ক নেই, "সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল" এই সুর বাঙালি মাত্রর হৃদয়ে চরম উন্মাদনার ঝড় তোলে। শুধু নিয়মের বাড়াবাড়ি থেকে খানিক মুক্ত হতে পারলেই যেন সে চির পিরিতির সম্পর্ক সম্পূর্ণ কণ্টকমুক্ত হয়। অত অফ সাইড - টাইড নিয়ে কাজ নেই, তাতে খেলার
ছন্দটাই যেন ছিন্ন হয়ে যায়। গোলকিপারের বল ধরার ব্যাপারেও বেশী নিয়মকানুনের
প্রয়োজন কী। ধাপ্ ধাপ্ লাথি মেরে শুধু গোল
পোস্টের মধ্যে বল কে ঢোকাতে পারলেই হল, খেলেও আনন্দ আবার খেলা দেখেও আনন্দ। গ্রামীন
সরলতা পূর্ণ আনন্দ প্রাপ্তির দাবীই যেন মুখ্য আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে এমন শেকল খোলা ফুটবল
খেলার মধ্যে, প্রাথমিক ভাবে কাপড়, নারকেলের ছিবড়া ইত্যাদি দিয়ে বানানো হত বল,
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার উপকূলবর্তী মহকুমা ডায়মন্ডহারবারের সরিষায় প্রথম শুরু হয় এই
ফুটবল, যাকে স্থানীয়ভাবে ধাপাস বল নামে অভিহিত করা হয়। এই খেলা বর্তমানে ডায়মন্ডহারবার
ও তার সংলগ্ন মথুরাপুর, নামখানা, কাকদ্বীপ ছাড়াও গঙ্গাসাগর এমনকি জয়নগর প্রভৃতি
জেলার শহর ঘেঁষা বিভিন্ন জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়েছে; এলাকায় জনপ্রিয়তার নিরিখে ফুটবলকেও ছাড়িয়ে
গিয়েছে এই ধাপাস বল। জেলার বিভিন্ন
প্রান্তে বিশেষ করে দক্ষিণবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় ধাপাস
বল টুর্নামেন্ট, যেখানে মেদিনীপুর হাওড়া থেকেও দল গুলো অংশগ্রহণ করতে আসে। কারণ কোন
কোন টুর্নামেন্টে বিজয়ী দলের পুরষ্কার মুল্য লক্ষা টাকারও গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। সম্প্রতি
জয়নগরের বহুরুতে এমন একটি ধাপাস বল টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়েছিল বলে সংবাদে প্রকাশ।
পার্শ্ববর্তী ছয়টি জেলার থেকে বাছা বাছা ১৬ খানা দল অংশগ্রহণ করেছিল তাতে, প্রথম
পুরষ্কার ছিল এক লক্ষ এক হাজার টাকা, দ্বিতীয় পুরষ্কার ছিল ৬১ হাজার।
বর্তমানে দিন বদলেছে, কাপড় ছিবড়া থেকে এখন ধাপাস বল প্লাস্টিক, ক্যাম্বিস কিংবা
রাবার এমনকি চামড়ারও হচ্ছে, তবে ফুটবলের চেয়ে সাধারণত ছোট এবং হালকা হয় এই ধাপাস বল।
জনৈক সাবির সর্দার, যিনি একজন খ্যাতিমান ধাপাসবল প্লেয়ার, সম্প্রতি লোকাল ট্রেনে তার পিঠে লেখা ধাপাসবলের কথা পড়ে উৎসাহী হয়ে খোঁজখবর নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, এছাড়া এই সংক্রান্ত আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল সংস্করণে প্রকাশিত খবরও এই লেখার প্রয়োজনীয় তথ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন