নব শাপলা পত্রে সুসজ্জিত উনিশ ব্যঞ্জন, মাঝে গুচ্ছ কামিনী ফুলের মতো সুডৌল পান্তা ভাতের সুভদ্র স্তুপ, আঙুলের আদরে সুশোভন ও সুমার্জিত। আলু, ঢেঁড়শ, কাঁকরোল, বেগুন, পটলের পাঁচ ফ্রাই, কচু শাক, লাউ চিংড়ি, চালতার টক, ডাটি কচু ইলিশের ঝাল সহ তেলে পিঠে, নারকেলের পুর দেওয়া সাতপুলি, পায়েস - পর পর এমন নয় খানা সুগোল, সুমসৃণ শাপলা পাতার থালায় একে একে সেজে ওঠা ভোগ ব্যঞ্জনের সুনন্দ বাহার; স্পাইসি আর সুমিষ্ট সুরভির মধুর ককটেলে মদির বাতাস যেন ভোজন-উত্তর তৃপ্ত সর্পের মতো হেঁশেলের অন্দর হতে কিছুতেই নির্গত হতে চায় না।
ভাদ্র সংক্রান্তির ভোর, যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার আরাধনার দিন, কিন্তু সূর্য উঠতেই সেদিন বাংলার গ্রামে গঞ্জে সর্প দেবী মনসা সহ অষ্টনাগের উদ্দেশ্য ভোগদানের মহা পর্ব শুরু হয়ে যায়। সাধারণ লোকবিশ্বাস অনুসারে, শিব ঠাকুরের মানসকন্যার নাকি গরম আহারে চরম অসূয়া, তাই ঠান্ডা পান্তা ভোগ দেওয়াই তাঁকে রীতি। এর জন্যে আগের দিন সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় রন্ধন প্রক্রিয়া, চলে রাত ভর। গোবর জলে লেপা পোছা উনানে, ধুপ ঘুরিয়ে, মনসা স্তুতি গেয়ে শুরু হয় রান্না চড়ানোর পর্ব, অধুনা গ্যাস ওভেনের ওপর গঙ্গা জল ছিটিয়েই শুদ্ধ করা হয় রন্ধন ক্ষেত্র। কারণ পদ্মাসনা মনসা এদিন উনানের আসনে উপবিষ্টা হন। যদিও শাস্ত্রমতে এই তত্ত্বের কোনো ভিত্তি নেই, একান্তই সেটি বৃষ্টি মগ্ন বাংলার সর্প সংকুল গ্রাম গঞ্জের ভয়জনিত ভক্তি মাখা মনসা সন্তুষ্টির একটি দীর্ঘ লালিত লোকাচার ছাড়া কিছু নয়। বৃষ্টি উত্তর ভাদ্রের অন্তিম লগ্নে, জলমগ্ন মাঠ ঘাট থেকে নির্বাসিত অহি কূল অনেক সময় উনানের গর্তের মধ্যে এসে আশ্রয় নেয়, কথিত সেই বিপদ থেকে বাঁচতেই নাকি এই রান্না উৎসবের আয়োজন এবং বিষহরি মনসার প্রতি রন্ধন কৃত নানা পদ সহযোগে বিশেষ ভোগ অর্পণের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়।
"জয় জয় মা মনসা জয় বিষহরি গো, বন্দনা করি মাগো মা মনসার চরণে", বাড়ির মহিলারা রান্না শেষে উনানের উপরে আতপ চাল বাটা দিয়ে সুন্দর আলপনা এঁকে দেন, তার ওপরে মনসার মূর্তি গড়া মাটির ঘট বা পট বসিয়ে শাপলা ফুলের স্তবক দিয়ে সাজিয়ে দেন উনান চত্ত্বর, অর্পিত হয় একাধিক ব্যঞ্জন সহ সুশীতল পান্তা ভোগ।
মনসার প্রণামী মন্ত্র নাই বা জানা থাকলো, সরল ভক্তির বশে জয় মা মনসা বলে শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে সে ভোগ নিবেদন পর্ব সত্যিই আর্দ্র করে তোলে মন কে।
সোনারপুরের প্রতিমা দেবী কোলকাতায় বাবুর বাড়িতে রান্নার কাজ করেন, বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, রান্না পুজার জন্যে সেদিন যদিও ছুটি নেননি তিনি, সন্ধ্যায় ফিরে রাত ন'টা থেকে শুরু করেছিলেন রান্না। একা হাতে প্রায় রাত্তির আড়াইটা পর্যন্ত সব শেষ করে তবে নিস্তার; যদিও তৎক্ষণাৎ ভোগ সাজানোর কাজে হাত দেওয়া যায় না, তার জন্যে কম করে আরোও দু ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়, কারণ গরম ভাতে সঙ্গে সঙ্গে জল ঢালা অনুচিত, প্রথমে তাকে ঠান্ডা হতে দিতে হয়, তারপরে।
এর মধ্যে কখন যে আকাশ ফরসা হয়ে ওঠে, পঞ্জিকা মতে ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে, আর সূর্যের এই বিশেষ লগ্নকে সাক্ষী রেখেই ঘরে ঘরে দেবী মনসার উদ্দেশ্য অর্পিত হয় শুভ্র শাপলা দল সিঞ্চিত পান্তা-পদ -প্রাশন।
আকাশে সেদিন ঘুড়ির মেলা, বিশ্বকর্মার আগমন হচ্ছে মন্ডপে মন্ডপে। একই সঙ্গে সেদিন অরন্ধন, বাসুকি ভগ্নী মনসাকে ভোগদানের পরে সেই পান্তা প্রসাদই খাওয়া হয় আমন্ত্রিত অতিথি বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে।
প্রতিমা দেবী এবারে প্রায় ৪০জন প্রতিবেশীকে ডেকেছিলেন, তবে তাঁর ঘরের মনসা অর্চনায় কোনো খুঁত নেই, একেবারে শুদ্ধ নিয়মেই তা হয়, কীভাবে জিগ্যেস করতে বললেন, "আমার বুড়োই পূজা করে তো; এককালে মনসা মঙ্গল দলে ছিল, তাই মনসা মন্ত্র তার সব জানা"।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন