দিল্লিতে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশতম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আগত জোটের অন্যতম সদস্য দেশ রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে উপহার হিসেবে তামিল ধ্রুপদী কাব্যগ্রন্থ 'তিরুক্কুরাল' তুলে দিলেন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুদিন (১২ এবং ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬) ধরে চলা এই আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনের এবারে আয়োজক দেশ ভারত, এই নিয়ে চতুর্থ বার ভারত এই দায়িত্ব পেল; ২০১২, ২০১৬ এবং ২০২১ এর পরে এবারে ২০২৬। রীতি অনুসারে ভারতই এবারে সম্মেলনের সভাপতিত্ব করবে।
১১ই সেপ্টেম্বর, সম্মেলনের প্রাক সন্ধায় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর কথিত প্রিয় এই বইটির একটি রুশ অনুবাদ পুতিনের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে সংবাদে প্রকাশ।
আনুমানিক ৪৫০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তি কোনো এক সময়ে এই গ্রন্থটি রচনা করেন, মহান তামিল দার্শনিক এবং মহাকবি তিরুভাল্লাভার; এটিকে তামিল ভাষার বেদ বলেও অভিহিত করা হয়। ধর্ম (আরম), কর্ম (পরুল) এবং কাম (ইরবাম) এই তিনটি পর্বে বিভক্ত এই গ্রন্থে মোট ১৩৩ টি অধ্যায় রয়েছে। ধর্ম পর্বে ৩৮ টি, কর্মে ৭০ এবং কাম পর্বে রয়েছে ২৫ টি অধ্যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে ১০ টি করে পয়ার ছন্দে লেখা দ্বিপদী চরণ রয়েছে, অর্থাৎ মোট চরণ সংখ্যা ১৩৩০ টি।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এটি অত্যন্ত প্রিয় একটি বই। মোদী তাঁর ভাষণে প্রায়শই এই গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ৭০ অধ্যায় বিশিষ্ট পরুল বা কর্ম পর্বে যেখানে আর্থসামাজিক নানা পরিস্থিতি সহ প্রশাসনিক বা রাজনীতিতে কৃতকর্তব্য নিয়ে দিকদিশার সন্ধান রয়েছে, নরেন্দ্র মোদীর আকর্ষণের মূল কেন্দ্র মুখ্যত সেই অংশটিই।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া'র খবরে প্রকাশ, তামিলনাড়ুর আপামর মানুষের কাছে এই পুস্তকের মান্যতা কোনো দৈব ভাষ্যের চেয়ে কম কিছু নয়। তামিল রাজনীতিকদের মধ্যে 'তিরুক্কুরাল' থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার অভ্যাস বহু প্রচলিত। এই তালিকায় বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন কংগ্রেস সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমও।
প্রসঙ্গত ২০২৬ এর এই ব্রিকস সম্মেলনে আসছেন চায়না রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংও। ২০১৯ এর পরে দীর্ঘ সাত বছর বাদে জিনপিং আবার ভারতে পা রাখছেন, যেটা নিয়ে দুই দেশের রাজনীতিক ও কূটনীতিক মহলে চরম আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
ইরান, সাউথ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ব্রাজিল সহ মোট ১১ টি দেশ বর্তমানে ব্রিকস রাষ্ট্র গোষ্ঠীর সদস্য। যদিও ২০০৬ এ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে যে চারটি দেশ প্রথমে একত্রিত ভাবে একটি রাষ্ট্র গোষ্ঠী গঠনের কথা ভেবেছিলেন তারা ছিল যথাক্রমে ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া এবং চীন, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জিম ও' নীল এই চার দেশের আদ্যক্ষর যথাক্রমে B, R, I, C কে নিয়ে এই নতুন আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রজোটের নামকরণ করেন ব্রিক। ২০০৯ সালে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন বসে রাশিয়ায়। ২০১১ তে এর সঙ্গে সাউথ আফ্রিকা যুক্ত হলে এর নাম ব্রিক থেকে ব্রিকস হয়ে যায়। ২০২৩ এর শীর্ষ অধিবেশনে বাকি পাঁচটি দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়। সর্বশেষ অন্তর্ভুক্তি হয় ২০২৫ এ ইন্দোনেশিয়ার।
প্রসঙ্গত কূটনীতিগত কারণে এবারে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা যেখানে দু দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু সমস্যা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা নিরসন হওয়ার আশা করছেন দু দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী কূটনীতিক মহল।
দিল্লিতে ভারত মণ্ডপম - এ হওয়া এই শীর্ষস্তরীয় রাষ্ট্র গোষ্ঠীর সম্মেলনে, বিশেষ করে বিশ্ব উষ্ণায়ন জনিত কারণে সম্প্রতি নেপালে হওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে, সদস্য দেশগুলির পক্ষ থেকে সম্ভবত দূষণ বিরোধী কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা সম্মিলিত ভাবে ঘোষণা করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন