সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শিশু বট ও মা শালিকের কথা!

এইতো কয়েকদিন আগের কথা, ঢাকুরিয়া মধুসূদন মঞ্চের সামনে - সিঁড়ি ভেঙে, ফুট ব্রিজে উঠছি, দেখি মুখের কাছে এক কোনায়, সুন্দর একটা বটের চারা; সাকুল্যে গোটা ছয়েক পাতা হবে, নরম, সবুজ; মৃদু হাওয়ায় আলতো আলতো আন্দোলিত হচ্ছে, কেমন যেন আদুরে আদুরে ভাব। খানিক দূরে দুটো ভাত শালিক, ব্রিজের রেলিং এর ওপর ঝিম মেরে বসে আছে। তা বসুক গে, তখন তো বুঝিনি। কারণ শিশু বটগাছে এখনো ফল ধরতে অনেক বাকি। একবার ফল ধরলে না হয় টিয়া, বসন্তবৌরি বা কোকিল ইত্যাদি পাখির সঙ্গে সঙ্গে এই ভাত শালিকেরাও নানা জায়গা হতে উড়ে এসে জুড়ে বসতো। আসলে লাল, লাল বটফল গুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয় হয়, তেমনি - পাখিদের কাছে সুস্বাদু এবং পুষ্টিকরও বেশ। তাই সারাবছরই এই ফাইকাস বেঙ্গালেনসিস (৫০ টির বেশী এখনো টিকে থাকা বট প্রজাতির মধ্যে একটির বিজ্ঞানসম্মত নাম এটি, যার মধ্যে বেঙ্গল কথাটি রয়েছে) মানে বটগাছের ডালা পালায় এদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। মহাকলরবে একেবারে ভরে ওঠে বটতলা!

যাক গে, স্বভাব মতো, মোবাইল বের করে যথারীতি ছবি নেবো বলে ক্যামেরা অন করেছি, কিন্তু যেই না মোবাইলটাকে বটগাছের মাথার কাছে নিয়ে গিয়ে খানিক ঝুঁকে দাঁড়িয়েছি, ব্যাস্। অমনি সেই শালিক গুলো একেবারে কিচিরমিচির শব্দে উত্তাল করে ফেললো আমার কান!
বুঝলাম শালিক গুলো ভীত হয়ে পড়েছে। কি জানি, এরাই হয়তো ঠোঁটে ধরে, না জানি কোন মুলুক থেকে বটফল নিয়ে এসে এখানে ফেলেছিল কোনোদিন। নিঃসন্দেহে এই চারা গাছটি - বটের ডালায় ধরা কোনো গোলাকৃতি, লাল বটফল থেকেই সৃষ্টি; কিন্তু তাকে ঠোঁটে করে নিয়ে এখানে বপন তো করেছে সেই শালিকই। তাহলে, শালিকেরও তো এটি ঠোঁটে ধরা সন্তান! আর শুধু ঠোঁটে ধরাই বা কেন বলবো, পেটে ধরাও তো হতে পারে! বেশির ভাগ পাখিই তো বট ফল খেয়ে তার পাকস্থলীর নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও নানা উৎসেচকের শুশ্রূষা দিয়ে তাকে দ্রুত অঙ্কুরোদগম উপযোগী করে তোলে। বিষ্ঠা ত্যাগের সঙ্গে ভূমিষ্ঠ হওয়া এই ফলই তো আগামী দিনের বট বৃক্ষের উৎস। অবশ্য এর পেছনে থাকে, বীজ বহন করে নিয়ে চলা সেই পাখিরাই। তাই অমলিন সেই অপত্য স্নেহের অংশিদার হিসেবে এই শালিক দম্পতির কথা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু ফুট ব্রিজে জন্মানো এই অবাঞ্ছিত বটগাছটির ভবিষ্যৎ পরিনতির কথা চিন্তা করে শালিক গুলোর মতোই আমার হৃদয়ও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো।

এই প্রসঙ্গে, বট বৃক্ষ রোপণে যিনি প্রায় বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠেছেন, সেই মাস্টার মশাই শ্যামল জানার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রায় ১০ হাজার বট রোপণ করার মিশন নিয়ে তিনি, যাকে বলে সাড়া ফেলে দিয়েছেন সর্বত্র। তাঁর নজরে পড়লে হয়তো এই বট চারাটির একটি সদগতি হতে পারে। শালিক গুলোও সঙ্গে সঙ্গে থাকবে না হয়। বড় হলে তার ছড়িয়ে পড়া ডালাপালায় না হয় একটু আশ্রয় খুঁজে পাবে। .

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...