সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রাজার ঘরে বাঘের বাসা!

রাজারা যে শুধু গান বাজনা বা শিল্প কলার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তা কিন্তু নয়, বাঘের প্রজনন বৃদ্ধির জন্যেও তাঁদের অবদান ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত। একটা কথা প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে মৃগয়ায় বেরিয়ে নাকি রাজারা মৃগ শিকারের থেকে বাঘ শিকারের দিকেই বেশী নজর দিতেন। তাতে তাদের বীরত্ব এবং শৌর্যের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হত। রাজ গৃহে সেই কারণে ব্যাঘ্র চর্মের প্রদর্শন রাজ গৌরবের বিশেষ সাক্ষর হিসেবে বিবেচিত হত। । সভাসদ তথা প্রজাদের থেকে রাজ সমীহ আদায়ের একটি উজ্জ্বল উপকরণ হিসেবেই এটি রাজ দরবারের দেওয়ালে শোভিত হওয়া ছিল দস্তুর।

আলিপুর চিড়িয়াখানায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

কিন্তু সেই রাজা যখন বাঘকে নাগালের মধ্যে পেয়েও তাকে ছেড়ে দেন শুধু তাই নয় উল্টে প্রাসাদে বয়ে নিয়ে আসেন রাজ পোষ্য হিসেবে তখন তো ব্যাপারটার মধ্যে একটু চমক থাকেই।

বর্তমানে বাঘ সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যখন সারা বিশ্ব ২৯ জুলাই তারিখটিকে বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস হিসেবে পালন করছে, তখন এই রাজার ভূমিকার কথা আরোও বেশী বেশী করে আলোচনায় উঠে আসার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি।

উল্লেখ্য এই রাজা ছিলেন মধ্যপ্রদেশের রেওয়া অঞ্চলের, ১৯৫১ সালে পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে তিনি একটি ন' মাসের সাদা বাঘের বাচ্চাকে উদ্ধার করেন। এটি ছিল একটি পুরুষ বাঘ। প্রসঙ্গত এই সাদা বাঘ কোনো নতুন প্রজাতির বাঘ নয়; পৃথিবীতে যে ছয়টি প্রজাতির বাঘ পাওয়া মায় তার মধ্যে অন্যতম রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা প্যান্থেরা টাইগ্রিস টাইগ্রিস প্রজাতিরই এটি একটি বিষম বর্ণের বাঘ। মানবদেহে যেমন গাত্র রঞ্জক মেলানিনের অভাবে বর্ণহীনতা বা অ্যালবিনিজম দেখা দেয়, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ক্ষেত্রেও তেমনি জিনগত ত্রুটির কারণে যদি গায়ের হলুদ এবং লাল রঞ্জক অনুপস্থিত থাকে তবে এই ধরনের সাদা বাঘের জন্ম হয়। এদের গায়ের কালো ডোরা বা স্ট্রাইপ গুলো বজায় থাকলেও মূল হলুদ রঙটি থাকে না। এই অবস্থাটিকে পরিভাষায় লিউসিজম বলা হয়।

তো রাজামশাই তাঁর গোবিন্দগড়ের রাজপ্রাসাদে ব্যাঘ্র শাবকটিকে এনে তার নামকরণ করলেন মোহন। একটু বড় হতে, বাঘটিকে তিনি বেগম নামে একটি স্বাভাবিক রঙের মাদি বাঘের সঙ্গে মিলিত হওয়ারও ব্যবস্থা করে দিলেন। 

আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রদর্শিত বোর্ডে সাদা বাঘ সংক্রান্ত ইতিকথা। 

উল্লেখ্য গোবিন্দগড়ের রাজা বেগমকে রেওয়ার জঙ্গল থেকে ধরে প্রাসাদে নিয়ে এসেছিলেন যাতে মোহনের সঙ্গে সে মিলিত হতে পারে। তা সেবার বেগম যে কটি শাবক প্রসব করে তাদের মধ্যে কোনটাই সাদা রঙের ছিল না। সবকটিই ছিল নীল চোখের, হলুদ ডোরা কাটা স্বাভাবিক রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

প্রসঙ্গত বংশগতির কারণে পিতা মাতা দুজনের ক্ষেত্রেই গাত্র বর্ণ জনিত জিনগত ত্রুটি থাকতে হবে, তবেই এই সাদা বাঘের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পরীক্ষামূলক ভাবে পরবর্তী কালে মোহন এবং তার কন্যা-বাঘ রাধা'র মধ্যে প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়। তাতে দেখা গেল চার চারটে সাদা বাঘের জন্ম হলো। সেটি ছিল ১৯৫৮ সালের ৩০শে অক্টোবর। কোলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রদর্শিত এই সংক্রান্ত তথ্য সম্বলিত বোর্ডে এই তারিখটির কথা বেশ ফলাও করে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ভারতবর্ষে এটাই ছিল সর্বপ্রথম অরণ্যের বাইরে, খাঁচা বন্দী অবস্থায় কোনো সাদা বাঘের জন্ম হওয়ার তারিখ। ১৯৬০ সালে এই নবজাতক ব্যাঘ্র শাবকদের মধ্যে মোহিনী নামে একটি স্ত্রী সাদা বাঘকে আমেরিকার ওয়াশিংটন স্থিত ন্যাশনাল জুলজিক্যাল পার্ক কিনে নিয়ে মায়। সারা পৃথিবীতে এখন যে ২০০টির মতো সাদা বাঘ রয়েছে বিভিন্ন চিড়িয়াখানা বা অভয়ারণ্যে তারা প্রত্যেকেই এদের বংশধর। উল্লেখ্য সাদা বাঘের জন্মভূমি হিসেবে কথিত ভারতে এই বাঘের সংখ্যা সারা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ১০০। কিন্তু আলিপুর চিড়িয়াখানায় যে চারটি সাদা বাঘ রয়েছে বর্তমানে তাদের সঙ্গে রাধা বা মোহনদের মতো বাঘেদের সঙ্গে সম্পর্ক সূত্র স্থাপিত হলো আরোও কিছু দিন বাদে; যখন রাধা দ্বিতীয় বারের জন্যে গর্ভবতী হলো এবং তিনটি বাচ্চার জন্ম দিল। এদের মধ্যে দুটি পুরুষ বাঘ এবং একটি স্ত্রী। প্রসঙ্গত পুরুষ বাঘ দুটি সাদা রঙের হয় আর মেয়ে বাঘটি স্বাভাবিক রঙের। এই তিনটি ব্যাঘ্র শাবকের নামকরণ হয় যথাক্রমে হিমাদ্রী, নীলাদ্রি ও মালিনী। সেই সময়ে এদেরকে আলিপুর কিনে নিয়ে আসে এবং চিড়িয়াখানায় আজকের দিনে যে সাদা বাঘ গুলিকে দেখা যায় তারা এদেরই বংশধর।


পরিশেষেঃ আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস (২৯ শে জুলাই) উপলক্ষে সাদা বাঘের এই উৎপত্তি কাহিনী, কোলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে সংগৃহীত। 
ছবি গুলো মোবাইল বন্দী করেছিল আমার (প্রতিবেদক) ছেলে, দেবার্পণ। সেগুলোও শেয়ার করে নিলাম এই পরিসরে।


২০২৩, বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস উদযাপনের নানা দিক নিয়ে এক আকর্ষণীয় লেখা পড়তে ক্লিক করুণ নীচের লিঙ্কে - 
বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস, ২০২৩ঃ কোলকাতার পথে ডোরা কাটা ট্যাক্সি! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

নিয়তিতাড়িত মানিক!

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর অন্যতম - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে ১৯২৮ সালে। ২০ বছর বয়সী মানিকের সাহিত্য ক্ষেত্রে যখন এই পদার্পণ সূচিত হচ্ছে তখন এই ত্রয়ীর প্রথম জন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে গেছে তারও সাত বছর পূর্বে। ১৯২১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘উপেক্ষিতা’ গল্পের মাধ্যমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে  প্রথম পরিচয় হয় বাংলা র পাঠক সমাজের। এর চার বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে ভাগলপুরে থাকাকালীন বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ করতে লেগে যায় তিন বছর। উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯২৮ এ যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটছে, একই বছরে বিভূতিভূষণের লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হচ্ছে ‘বিচিত্রা’র পাতায়। বিভূতিভূষণ এবং মানিকের পরে তৃতীয় বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশঙ্করের আবির্ভাব হচ্ছে আরও চার বছর পরে । ১৯৩২ সালে ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ নামক উপন্যাস দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রথম পা রাখেন তারাশঙ্কর । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তারকা খচিত বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল আক...