সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

"আমার জীবনই আমার বাণী"!

গান্ধীজী এখানে উপবেশন মুদ্রায়, নিমীলিত চোখ, উন্নত সুষুম্না; আস্কন্দবাহুতল বেষ্টিত সুভদ্র শ্বেত উত্তরীয় - অনাবৃত বক্ষদেশ কে উল্লম্ব ভাবে উন্মুক্ত ক'রে দুই প্রান্তে বিভক্ত। পুঞ্জিত করতল, ভদ্রাসনে আলম্বিত পাদপদ্ম সন্ধিস্থলে প্রিয় সম্ভাষণে সমর্পিত। ১৫৭ তম জন্মদিন (১৮৬৯, ২রা অক্টোবর) উপলক্ষে আজ সুশোভন পুষ্প পুঞ্জ নিবদ্ধ তাঁর যুগল হস্ত বন্ধে। গলায় সুগন্ধ স্ফীত মাল্য ভূষণ। নানা বর্ণীল পুষ্প পত্র সম্ভারে সুসজ্জিত তাঁর কৃষ্ণ বেদী পৃষ্ঠ। সম্মুখ বেদী গাত্রে, হস্তাক্ষর মুদ্রায় খোদাই করা সেই চির অকপট, চির সত্য গান্ধী বার্তা - আমার জীবনই আমার বাণী।


গান্ধী ভবন সম্মুখে, বেদী পৃষ্ঠে উপবিষ্ট গান্ধী মূর্তি!

মূর্তির পশ্চাৎ পটে দৃশ্যমান একতল যে বাড়ি - যাকে এককালে হায়দরি মঞ্জিল বলা হত, এখন তা গান্ধী ভবন নামে পরিচিত; ১৯৪৭ এর ১৩ ই আগস্টের সন্ধ্যায়, এক বিশেষ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে গান্ধীজী এই বাড়িতেই এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন, ছিলেন টানা ২৫ দিন। ৭ই সেপ্টেম্বর তিনি এখান থেকে দিল্লি ফিরে যান। প্রসঙ্গত এটাই ছিল তাঁর শেষ বাংলায় আসা, এর আগে ৬৩ বার তিনি বাংলা সফরে এসেছেন। বেলেঘাটার মিঞা বাগান অঞ্চলে অবস্থিত এই বাড়িটি তখন নিতান্তই পোড়ো, তবু স্বাধীনতার মহোৎসবের সেই পরম দিনটিতেও (১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭) তিনি এই বাড়িতেই ছিলেন একান্তে উপবাসরত, অতিবাহিত করেছেন নিবিড় ভগবৎ প্রার্থনায়। এই বাড়িতেই থাকাকালীন, কোলকাতা শহরে পুনরায় শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধ করতে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে টানা ৭৩ ঘন্টার অনশন পালন করেন, এবং সফলতা পান অভূতপূর্ব, উভয় সম্প্রদায়ের দাঙ্গাকারীরা অস্ত্রশস্ত্র সহ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন শুধু তাই নয় সংঘর্ষ বন্ধ করার লিখিত মুচলেকা দেন।
গান্ধীজীর স্মৃতি বিজড়িত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের যত স্থান রয়েছে, নিঃসন্দেহে এটি তাদের মধ্যে অন্যতম।
সংবাদ সূত্রে প্রকাশ, গান্ধী স্মৃতি দর্শন সমিতি নামক একটি সর্বভারতীয় সংস্থা যেটির চেয়ারম্যান ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী, এবারে গান্ধীর ১৫৭ তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি জাতীয় স্তরে গান্ধী স্মৃতি স্থলের ডাইরেক্টরি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেখানে বেলেঘাটার এই গান্ধী ভবনের নামটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান, প্রাক্তন মন্ত্রী শ্রী বিজয় গোয়েল এই মর্মে আরোও বিশদে তথ্য সরবরাহের জন্যে বেলেঘাটার বিধায়ক শ্রী কুণাল ঘোষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভবনটিকে ঘিরে, গান্ধী স্মৃতি রক্ষার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। তারপরে নানা পট বদলের মাধ্যমে, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের তত্ত্বাবধানে বাড়িটিতে একটি গান্ধী স্মৃতি সম্বলিত মিউজিয়ামের উদ্বোধন হয়েছে, পূর্ব সংরক্ষিত গান্ধীজীর ব্যবহার করা নানা উপকরণ ছাড়াও, 'মোহনদাস থেকে মহাত্ম' শীর্ষক নব-রূপায়িত প্রদর্শশালাটিতে সংযুক্ত হয়েছে নানা ঐতিহাসিক তথ্য, ঘটনা ও ছবি সম্বলিত আলেখ্য চিত্র, রয়েছে ঐতিহাসিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ চিঠি এবং তৎসহ সে সময়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ পেপার কাটিং।
এবারেও গান্ধী ভবনে, প্রতিবছরের মতো গান্ধী জয়ন্তী পালনের মূল উদ্যোগটি নিয়েছিল পূর্ব কলিকাতা গান্ধী স্মারক সমিতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়, সকাল থেকে শুরু হয়েছিল নানা অনুষ্ঠান, প্রথমে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, উত্তোলন করেন সমিতির সভাপতি শঙ্কর স্যানাল। জাতীয় স্তোত্র বন্দেমাতরম পরিবেশিত হয় স্মারক সমিতির মহিলা সদস্যদের সম্মিলিত কন্ঠে। গান্ধী মূর্তিতে মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য সংস্কৃতি ও জন কারিগরি বিভাগের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা।
১৫০/বি বেলেঘাটা মেন রোড অর্থাৎ গান্ধী ভবনের প্রবেশ দ্বার থেকে বেরিয়ে বেলেঘাটার রাজপথ পরিক্রমা করে সুশৃঙ্খল পদযাত্রা, "ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসার সাথে, গান্ধীজীর পথে" লেখা ব্যানার পথযাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আয়োজিত হয়েছিল একটি আলোচনা সভার, যেখানে "শান্তি, মানবতা এবং সৌভ্রাতৃত্ব ছাড়া স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়না" এই বিষয়ে বক্তব্য রাখেন তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের তিনজন বিশিষ্ট বক্তা, তাঁরা যথাক্রমে সি পি আই এম -এর প্রাক্তন সাংসদ অধ্যাপক সুজন চক্রবর্তী, জাতীয় কংগ্রেসের দেবপ্রসাদ রায় এবং বিজেপি দলের বর্তমান বিধায়ক রীতেশ তেওয়ারি। স্মারক সমিতির বর্তমান সম্পাদিকা পাঁপড়ি সরকার বললেন, বক্তাদের মত ও পথ ভিন্ন ভিন্ন হলেও উপসংহারে সকলেই গান্ধীবাদের ভালোবাসা ও সৌভ্রাতৃত্ব বোধের গুরুত্ব অনস্বীকার্য বলে মেনে নিয়েছেন। তিনি বললেন, এটাই গান্ধীবাদের বিউটি, তাঁকে কেউ ভগবান বলতে পারেন কিংবা কেউ তাঁর সমালোচনাও করতে পারেন কিন্তু তাঁকে কেউ হিপোক্রেট বলতে পারেন না।
পরিশেষে ছোটদের তিনটি বিভাগে বিন্যস্ত অঙ্কন প্রতিযোগিতা দিয়ে এবারের গান্ধী জয়ন্তী পালনের সমাপনী ঘোষিত হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জনগণমনঃ জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার ইতিহাস ও কিছু প্রশ্নের উত্তর!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ব্রহ্ম সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক’ কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মান্যতা দেওয়ার সর্ব সম্মীলিত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি । কিন্তু কেন এত দেরী? দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন তিন বছর সময় লেগেছিল জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করতে? ‘ভারত বিধাতা’ শিরোনামে লেখা, স্বদেশ পর্যায় ভুক্ত (গীতবিতান অনুসারে) এই রবীন্দ্রগীতিটি কিভাবে -  দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে গেল! ‘জনগনমন’র জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীই আজ আমরা ফিরে দেখবো এই প্রবন্ধে।  ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট - দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরে অবশেষে দেশবাসীর ভাগ্যাকাশে এসে উপস্থিত হোল বহু আকাঙ্খিত সেই দিনটি। উদিত হোল স্বাধীনতার নতুন সূর্যের।   স্বাধীন হোল দেশ। কিন্তু সদ্য ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান তখনও পায় নি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা। ১৯৪৭ এর ১৮ই জুলাই তারিখে লাগু হওয়া ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুসারে নিজ নিজ সংবিধান প্রণয়নের আগে পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্থান এই দুটি ভূখণ্ড কমনওয়েলথ দেশের অধীনস্থ দুটি অধিরাজ্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা...

'জল পড়ে, পাতা নড়ে' ঃ রবীন্দ্রনাথ না বিদ্যাসাগরের লেখা?

জল পড়ে, পাতা নড়ে - সহজ অথচ অমোঘ এমন দুটি লাইন মনে হয় কোনো উপনিষদীয় ঋষির স্বর্গীয় কাব্য সিদ্ধির অনুপম ফসল ছাড়া কিছু হতে পারে না।  বৃষ্টিপাতের সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উচ্চারিত হওয়া এই শ্লোক কেবল সৃষ্টির আপন খেয়ালেই রচিত হতে পারে। সেই কবে থেকে এর অনন্য স্বাদ মস্তিস্কের কোষে কোষে এক অদ্ভুত ভালোলাগার মোহ তৈরি করা শুরু করেছিল তা আজও অটুট এবং সমানভাবে সক্রিয় , মোহ ভঙ্গের নামই নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর জাদুময় মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। যদিও রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই দুটি লাইন লেখেন ‘জীবন স্মৃতি’ র পাতায়। মনে হয় স্রষ্টা যেন নিজেই তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই দুটি লাইন লিখলেও লেখার শ্রেয় কিন্তু তিনি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে। এখন প্রশ্ন, কেন! উত্তর - ভ্রান্তি সুখে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ‘জীবন স্মৃতি’ তে তাই দেখা গেল যতবার তিনি ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লিখেছেন ততবারই তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছেন। অন্য কারোর লেখা লিখলে তাকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখাই দস্তুর। কিন্তু তাতে কি! শিশুবেলার মুগ্ধতা যেন কিছুতেই প্রশমিত হতে পারে...

১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট, কোথায় ছিলেন গান্ধীজী?

১৫০/বি বেলেঘাটা মেন রোড। শিয়ালদহ স্টেশন ও ই-এম বাইপাস এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম মূল রাস্তা - বেলেঘাটা মেন রোড তথা সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রোডের ওপর পড়া এই বিশেষ ঠিকানাটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করছে । বিশেষ করে, প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় আসন্ন হলে, এই ঠিকানার কথা স্মরণ না করে থাকা যা য় না। কারণ ১৯৪৭ এ গোটা দেশ যখন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, বিশেষ করে রাজধানী দিল্লিতে স্বাধীনতা লাভের (১৫ ই আগস্ট) দিনটিকে স্মরনীয় করে রাখতে আয়োজিত হয়েছে অভূতপূর্ব রাজকীয় সমারোহের - যার শুভ সূচনা হয়েছে, ১৪ ই আগস্টের মধ্যরাতে অর্থাৎ রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে  ১৫ তারিখ পদার্পণ করতেই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে শুভারম্ভ হয়েছে স্বাধীনতা দিবস পালনের মহা নির্ঘণ্ট। এই উচ্ছ্বাস যদিও কাঙ্ক্ষিতই ছিল। কারণ দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতার কৃষ্ণ কাল অতিক্রম করার পরেই দেশবাসীর কাছে এসে পৌঁছেছিল সে বিরল মাহেন্দ্রক্ষণ। সমাগত হয়েছিল সেই মহা মুহূর্ত যখন প্রায় শতবর্ষ ধরে চলা স্বাধীনতাকামী মহাযজ্ঞে মুক্তিলাভের সিদ্ধি স্প...